ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৩:১১:১৬ AM

বিচারের অপেক্ষায় আট ভিআইপি আসামি

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
21-10-2026 11:22:08 AM
বিচারের অপেক্ষায় আট ভিআইপি আসামি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে রয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের আট হেভিওয়েট নেতা। তাঁদের মধ্যে সাতজন সাবেক মন্ত্রী এবং একজন সাবেক উপদেষ্টা। কারও কারও কারাবাসের মেয়াদ দেড় বছর পেরিয়েছে। অথচ ছয়জনের বিরুদ্ধে এখনো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হয়নি। অন্য দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল হলেও বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়নি। দীর্ঘ কারাবাসের পরও বিচার শুরু না হওয়ায় প্রশ্ন তুলেছে আসামিপক্ষ। তবে প্রসিকিউশনের দাবি, আইন অনুযায়ীই এগোচ্ছে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া।

আট আসামির মামলার বর্তমান অবস্থা
কারাগারে থাকা আট নেতা হলেন আমির হোসেন আমু, শাহজাহান খান, ড. আবদুর রাজ্জাক, কর্নেল (অব.) ফারুক খান, গোলাম দস্তগীর গাজী, তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী, ডা. দীপু মনি ও কামাল আহমেদ মজুমদার।

এঁদের মধ্যে আমির হোসেন আমু, শাহজাহান খান, ড. আবদুর রাজ্জাক, ফারুক খান, গোলাম দস্তগীর গাজী ও তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের অপেক্ষা চলছে। অন্যদিকে ডা. দীপু মনি ও কামাল আহমেদ মজুমদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল হলেও বিচার শুরু হয়নি।

আমির হোসেন আমুকে ২০২৪ সালের ৬ নভেম্বর পশ্চিম ধানমন্ডি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ড. আবদুর রাজ্জাক ও ফারুক খান একই বছরের ১৪ অক্টোবর, শাহজাহান খান ৫ সেপ্টেম্বর, তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী ১০ সেপ্টেম্বর, ডা. দীপু মনি ১৯ আগস্ট এবং গোলাম দস্তগীর গাজী ২৫ আগস্ট গ্রেপ্তার হন। তাঁদের বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন ঘটনায় একাধিক মামলা রয়েছে।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ, আমু, রাজ্জাক, দীপু মনি, ফারুক খান, তৌফিক-ই-এলাহী ও শাহজাহান খান নিজ নিজ অবস্থান থেকে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের দমন-পীড়নমূলক কর্মকাণ্ডে পরামর্শ, সহযোগিতা, সমর্থন ও উসকানি দিয়েছেন। তাঁরা ১৪ দলীয় জোটের দুটি বৈঠকেও উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রসিকিউশনের ভাষ্য, এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’র পর্যায়ে পড়ে। তদন্তে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলেও দাবি করেছে প্রসিকিউশন। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

দীর্ঘ কারাবাস নিয়ে প্রশ্ন
আসামিপক্ষের আইনজীবী শেখ আলী আহমেদ খোকনের মতে, দীর্ঘ সময় বিচার শুরু না করে কাউকে আটক রাখা গুরুতর মানবাধিকার প্রশ্ন তৈরি করে। তাঁর দাবি, জামিনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা দেওয়া হচ্ছে না। দ্রুত বিচার শুরু করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেন, কাউকে অনির্দিষ্টকাল বিনা বিচারে আটক রাখা যায় না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে মামলা দায়েরের পরও বিচার শুরু হতে এত সময় লাগছে কেন, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করা জরুরি এবং আইন অনুযায়ী জামিনের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

শিগগিরই অভিযোগ দাখিলের আশ্বাস
প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছিল এবং তা শেষ হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক বিচারিক কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। শিগগিরই অভিযোগ দাখিল করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসাইন তামিম জানান, আমির হোসেন আমু, শাহজাহান খান, ড. আবদুর রাজ্জাক, ফারুক খান, গোলাম দস্তগীর গাজী ও তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীর বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত হয়েছে। প্রধান প্রসিকিউটর ফিরে এলে প্রতিবেদন দাখিল করা হতে পারে। এরপর বিচার শুরু ও সাক্ষ্য গ্রহণের প্রক্রিয়া এগোবে।

তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী, ডা. দীপু মনি ও কামাল আহমেদ মজুমদার জামিন চেয়ে আবেদন করেছেন। তাঁদের আইনজীবীদের দাবি, দীর্ঘদিন কারাগারে থাকলেও তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হয়নি। কামাল আহমেদ মজুমদারের আইনজীবী জানিয়েছেন, তাঁর মক্কেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং শয্যাশায়ী। ফারুক খানও জামিন চেয়েছেন। তবে তাঁর আবেদন নিষ্পত্তি হয়নি। আমু, রাজ্জাক ও শাহজাহান খান এখনো জামিনের আবেদন করেননি।

ট্রাইব্যুনাল তিন আসামির জামিন আবেদনের বিষয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রতিবেদন পাওয়ার পর জামিনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

আইনে কী বলা আছে
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ১৭(ডি) ধারায় অযথা বিলম্ব ছাড়াই বিচার পাওয়ার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রুলস অব প্রসিডিউরের ৩৪(৩) বিধি অনুযায়ী, যেকোনো পর্যায়ে শর্তসাপেক্ষে জামিন দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে ৯(৫) বিধিতে এক বছরের মধ্যে তদন্ত শেষ না হলে শর্তসাপেক্ষে জামিনের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে লিখিত কারণ দেখিয়ে তদন্তের মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানো এবং ওই সময় পর্যন্ত আসামিকে আটক রাখার বিধান রয়েছে।

প্রসিকিউশনের দাবি, তদন্ত ও বিচার শেষ করতে প্রয়োজনীয় সময় নেওয়া হচ্ছে। প্রসিকিউটর তামিমের ভাষ্য, একটি মামলা শেষ করতে সাধারণত সাত থেকে আট মাস লাগতে পারে। তবে তদন্তের সময় মামলার ধরন ও জটিলতার ওপর নির্ভর করে কমবেশি হয়।

ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম ও মামলার অগ্রগতি
২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে। এরপর জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ড, গুম এবং অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। ট্রাইব্যুনাল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ৭০টি মামলায় ৫৫৮ জন আসামি রয়েছেন। এর মধ্যে ৪৪টি মামলা তদন্তাধীন এবং ২৬টির বিচার চলছে। সাতটি মামলার রায় হয়েছে। এসব মামলায় ৬৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং শেখ হাসিনাসহ মোট ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৮ জন পলাতক।

এ ছাড়া মাহবুবুল আলম হানিফের মামলাটি রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সালমান এফ রহমান ও জিয়াউল হাসানের সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোও বিচারপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। কয়েকটি মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক চলছে।

দীর্ঘ কারাবাসের পরও বিচার শুরু না হওয়া নিয়ে আসামিপক্ষের উদ্বেগ এবং দ্রুত বিচার চেয়ে ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশার মধ্যে ট্রাইব্যুনালের সামনে এখন তদন্ত শেষ করা, অভিযোগ দাখিল ও বিচার এগিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একই সঙ্গে আইন অনুযায়ী আসামিদের অধিকার নিশ্চিত করাও বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।