ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৮:৫৩:২৭ PM

বিতর্কের কেন্দ্রে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
25-10-2026 07:36:19 PM
বিতর্কের কেন্দ্রে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ, সংস্কার ও মানসম্মত উন্নয়নকাজে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি)। তবে দেশের শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির নানা অভিযোগ উঠে আসছে। সরকার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে প্রশাসনিক সংস্কার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ দেখা গেলেও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে তার প্রত্যাশিত প্রতিফলন ঘটেনি বলে অভিযোগ করেছেন অধিদপ্তরের একাংশের কর্মকর্তা-কর্মচারী।

তাঁদের অভিযোগ, বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য, সরকারি দরপত্রে প্রভাব বিস্তার, নিয়োগে অনিয়ম এবং নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের মতো ঘটনায় প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও সাবেক ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন নেতা এবং অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ঘিরে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে পদোন্নতি ও পছন্দের পদায়ন নিশ্চিত করা, ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দিতে প্রভাব বিস্তার এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বহাল বিতর্কিত কর্মকর্তারা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হয়। তবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি বলে অভিযোগ করেছেন বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ।

তাঁদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে সুবিধা নেওয়া কয়েকজন কর্মকর্তা এখনো অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে পদোন্নতি, পছন্দের পদায়ন, ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিভাগীয় তদন্ত, লিখিত অভিযোগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদনের পরও কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে অধিদপ্তরের ভেতরে অসন্তোষ রয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেন।

এ পরিস্থিতিতে মোজাহিদুল ইসলাম আলিফ, জাহেদুল করীম, মো. শহিদুল ইসলাম, মো. আবুল হাসেম সরদার ও সরোয়ার হোসেনসহ কয়েকজন কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট নথি এবং তাঁদের বক্তব্য পৃথকভাবে যাচাই করা জরুরি।

তদন্তে অনিয়মের তথ্য, পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন মোজাহিদুল আলিফকে ঘিরে

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো জোনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন মোজাহিদুল ইসলাম আলিফ। তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে নির্মাণকাজের অর্থ পরিশোধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্তের সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী সময়ে তাঁর পদায়ন ও দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে রাজধানীর কাফরুল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ছয়তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ঠিকাদারকে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৪১ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। পরে ২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সরেজমিন পরিদর্শনে তদন্ত কমিটি দেখতে পায়, ভবনের দ্বিতীয় তলার কাজও তখনো শেষ হয়নি। চতুর্থ তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছিল।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ টাকার কাজ অসম্পন্ন ছিল। এ অবস্থায় বিল পরিশোধের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিভাগীয় তদন্ত কমিটি মোজাহিদুল ইসলাম আলিফসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল বলে জানা গেছে। তবে সেই সুপারিশের পর কী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া সাভার জোনে দায়িত্ব পালনের সময় কেরানীগঞ্জে আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৮০ কোটি টাকার প্রকল্পে কাজের অগ্রগতির তুলনায় একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২০ কোটি টাকা অগ্রিম পরিশোধের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে। এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বিল, কাজের অগ্রগতি প্রতিবেদন এবং নিরীক্ষা নথি পর্যালোচনা করা জরুরি।

বর্তমানে আগারগাঁওয়ে প্রধান কার্যালয়ের প্রায় ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁকে ঢাকা মেট্রো জোনে পদায়ন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে।

প্রধান প্রকৌশলীর পদ ঘিরে তৎপরতার অভিযোগ জাহেদুল করীমের বিরুদ্ধে

বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সূত্র ধরে প্রভাব বিস্তার এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকার অভিযোগ উঠেছে জাহেদুল করীমের বিরুদ্ধে। ২০২২ সালের ২৭ জুলাই ঘোষিত বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটিতে তিনি কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সে সময় তিনি ঢাকা জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবাদে সুযোগ-সুবিধা পাওয়া এই কর্মকর্তা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি প্রধান প্রকৌশলীর পদে আসীন হওয়ার জন্য তিনি তৎপরতা চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে প্রধান প্রকৌশলীর পদে তাঁর নিয়োগ বা পদায়নসংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট যোগ্যতা কিংবা নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এ অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।

প্রধান প্রকৌশলীকে ঘিরেও প্রশ্ন, জবাবদিহি কোথায়?

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের চলমান অনিয়ম, বদলি-বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অধিদপ্তরের একাংশের কর্মকর্তা-কর্মচারী।

তাঁদের অভিযোগ, অধীনস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তি, আর্থিক অনিয়মের তদন্ত এবং দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

তবে প্রধান প্রকৌশলী ব্যক্তিগতভাবে অনিয়মে জড়িত, কোনো কর্মকর্তাকে সুরক্ষা দিয়েছেন কিংবা দরপত্র মূল্যায়নে প্রভাব বিস্তার করেছেন—এমন অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নির্দিষ্ট নথি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রয়োজন। এসব বিষয়ে তাঁর বক্তব্যও প্রতিবেদনের ভারসাম্য রক্ষার জন্য গুরুত্বহতে পারে।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের দাবি, অতীতের আর্থিক অনিয়ম, বদলি ও পদায়নসংক্রান্ত অভিযোগ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনাগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর বিল পরিশোধ, দরপত্র মূল্যায়ন, বিভাগীয় তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং কর্মকর্তাদের পদায়নপ্রক্রিয়া পর্যালোচনা করার দাবি উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এখন দেখার বিষয়, এসব অভিযোগের বিষয়ে অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয় এবং তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায় নির্ধারণে কতটা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।পূর্ণ।

নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার, নির্মাণকাজের গুণগত মান এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এ প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম হলে তার প্রভাব শুধু সরকারি অর্থের অপচয়েই সীমাবদ্ধ থাকে না; শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত