ঢাকা, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৭:২৫:০৮ PM

আবু সাঈদকে ঘিরে ওয়াসায় দুর্নীতির বিতর্ক

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
18-10-2026 12:02:50 PM
আবু সাঈদকে ঘিরে ওয়াসায় দুর্নীতির বিতর্ক

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে ঢাকা ওয়াসায় অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবু সাঈদের বিরুদ্ধে। তাঁর বিরুদ্ধে অধীনস্থ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়, পদায়ন ও পদবাণিজ্য, সম্পদের তথ্য গোপন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবু সাঈদের পরিবারের একাধিক সদস্য আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর বড় বোন নুরজাহান মজুমদার কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী মহিলা লীগের সভাপতি ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ছোট বোন ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী মহিলা লীগের সহসভাপতি, বড় ভাই কুমিল্লা উত্তর শ্রমিক লীগের সহসভাপতি এবং বাবা নিজ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বাহাউদ্দিন নাছিম তাঁর মামাশ্বশুর—এমন দাবিও রয়েছে। এসব রাজনৈতিক সম্পর্ক ব্যবহার করে তিনি প্রভাব বিস্তার করতেন বলে অভিযোগকারীদের বক্তব্য।

রাজস্ব বিভাগে সিন্ডিকেট ও মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেওয়া অভিযোগের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব বিভাগে প্রভাব খাটিয়ে একটি অনিয়মতান্ত্রিক চক্র গড়ে তুলেছিলেন আবু সাঈদ। অধীনস্থ রাজস্ব পরিদর্শকদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় এবং সেই অর্থের একটি অংশ তৎকালীন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম মোস্তফা কামাল মজুমদারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওয়াসার বিভিন্ন জোন থেকে সংগৃহীত অর্থ ভাগাভাগির মাধ্যমে এই চক্র পরিচালিত হতো। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পরও যথাযথ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। দুদকের অনুসন্ধান দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং তদন্তের বর্তমান অবস্থা জানা জরুরি।

বিপুল সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
আবু সাঈদের নামে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে রাজধানীর আফতাবনগরের এল-ব্লকের ২ নম্বর রোডের ৩৯ নম্বর বাড়িতে সাততলা ভবন, দুটি গাড়ি এবং কুমিল্লায় জমি ও বাংলোবাড়ির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবে কোটি কোটি টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব সম্পদের পরিমাণ তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সম্পদের একটি অংশ স্ত্রী ও সন্তানদের নামে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে সম্পদগুলোর প্রকৃত মালিকানা, অর্জনের সময়, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের তথ্য যাচাই ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

দুদকের নথিতে শতকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
দুদকের প্রধান কার্যালয়ে প্রক্রিয়াধীন বলে উল্লেখ করা একটি নথির সূত্র ধরে অভিযোগ করা হয়েছে, ঢাকা ওয়াসার উন্নয়ন ও রাজস্ব কার্যক্রমে স্মারক নম্বর জালিয়াতি এবং পদায়নসংক্রান্ত অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। নথি নম্বর ০০.০১.০০০০.৫০১.০১.০১৪.২২ এবং ই/আর নম্বর ৬২/২০২২ উল্লেখ করে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হিসেবে সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নূর আলম সিদ্দিকীর নামও দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া বিদেশে অর্থ পাচার এবং দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব দাবির পক্ষে যাচাইযোগ্য আর্থিক নথি, আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া না গেলে সেগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

নতুন পদায়ন ঘিরে অসন্তোষ
অভিযোগের মধ্যে গত ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আবু সাঈদকে ঢাকা ওয়াসার প্রশাসন বিভাগ-১-এ উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পদায়ন ঘিরে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সম্পদের বৈধ উৎস যাচাই এবং পদায়নপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, দুদকের অনুসন্ধানের অগ্রগতি এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করা হলে বিষয়টির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সুনাম সুরক্ষিত রাখা—দুটিই ন্যায়বিচারের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ।