ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৯:১৬:৫৩ PM

সিসিকে দুর্নীতির মহোৎসব, জড়িত ১৪

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
28-10-2026 07:48:16 PM
সিসিকে দুর্নীতির মহোৎসব, জড়িত ১৪

সিলেট সিটি করপোরেশনে (সিসিক) দুর্নীতি, অনিয়ম, সরকারি রাজস্ব ক্ষতি, নথি জালিয়াতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে ১৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকেরা। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার কথা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন শাখায় একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। এই চক্রের কারণে নাগরিক সেবা ও উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিপুল অঙ্কের সরকারি রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

সিসিকের বর্তমান প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী নগরীর উন্নয়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শন করে নাগরিক সমস্যা সমাধানের উদ্যোগও নিচ্ছেন তিনি। অভিযোগকারীদের মতে, প্রশাসকের এসব উদ্যোগের সুফল নিশ্চিত করতে হলে সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।

এর আগে সিসিকের ১৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র উল্লেখ করে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে তদন্তের আবেদন করেন নগরীর ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাদিকুর রহমানসহ কয়েকজন। সম্প্রতি দুদকের ঢাকা কার্যালয়েও এ-সংক্রান্ত অভিযোগ জমা পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, সিসিকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুল রহমান এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবরকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক কাজ করছে। বদলি হওয়ার পরও তাঁরা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি। পুরোনো তারিখে নথি প্রস্তুত, ফাইল জালিয়াতি, ঠিকাদারি কাজ বণ্টন ও অবৈধ নকশা অনুমোদনের অভিযোগও উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

অভিযোগ অনুযায়ী, সিসিকের প্রশাসনিক ও প্রকৌশলসংক্রান্ত নথিতে বিভিন্ন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সিল ও স্বাক্ষর জাল করে অনুমোদন তৈরির ঘটনাও ঘটেছে। সুরমা মার্কেট এলাকা থেকে কর্মকর্তাদের সিলের অনুরূপ সিল তৈরি এবং বিশেষ স্থানে বসে অবৈধ ভবনের নকশা ও পুরোনো তারিখের ফাইল অনুমোদনের অভিযোগ করা হয়েছে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও ফরেনসিক পরীক্ষা ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

এ ছাড়া সিসিকের প্রায় ২৫৮ জন অস্থায়ী ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীকে চাকরি স্থায়ী করার আশ্বাস দিয়ে হাইকোর্টের প্রক্রিয়াকরণ ফি বাবদ জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এভাবে মোট ২৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। টাকা ফেরত চাইলে চাকরিচ্যুতির হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সাবেক প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুল রহমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার, নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, কমিশন গ্রহণ এবং বিধিবহির্ভূত নকশা অনুমোদনের অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে অতীতের গ্রেপ্তার ও একাধিক মামলার প্রসঙ্গও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবরের বিরুদ্ধে টেন্ডার-সংক্রান্ত অনিয়ম এবং নির্মাণকাজের তদন্তে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ উঠেছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী (পূর্ত) মো. রাজিউদ্দিন খান, উপসহকারী প্রকৌশলী এটিএম সাইদুর রহমান এবং অতিরিক্ত সহকারী প্রকৌশলী বেলাল আহমেদের বিরুদ্ধেও অবৈধ ভবনের নকশা অনুমোদন, ঘুষ গ্রহণ ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন নথি থাকার দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।

সিসিকের রাজস্ব ও সেবাসংশ্লিষ্ট শাখাগুলো নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। প্রধান অ্যাসেসর মো. আব্দুল বাতিতের বিরুদ্ধে ঘুষের বিনিময়ে বিভিন্ন ভবনের গৃহকর কম নির্ধারণ করে রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে। প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীনের বিরুদ্ধে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ঠিকাদারি কার্যক্রমে অনিয়ম এবং লাইসেন্স শাখার প্রধান রুবেল আহমেদের বিরুদ্ধে লাইসেন্স প্রদানকে কেন্দ্র করে অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে।

সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিনের বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক তদারকিতে অবহেলা এবং কথিত সিন্ডিকেটকে পরোক্ষভাবে সহযোগিতার অভিযোগ তুলেছেন অভিযোগকারীরা। এ ছাড়া, প্রকল্প বাতিলের পরও বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ, সরকারি গাড়ির জ্বালানি কেনার ভাউচারে অনিয়ম এবং জ্বালানি বাইরে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গেলে সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

নগরবাসীর দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ ও সম্পদের অপব্যবহার প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে দুদকের স্বাধীন অনুসন্ধান, আর্থিক লেনদেন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকেরা।