ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৮:১৬:৪৬ PM

উপন্যাস:“শেষ দেখা”

মান্নান মারুফ
16-04-2026 02:46:26 PM
উপন্যাস:“শেষ দেখা”

পর্ব – ৭

কারাগারের সেই সেলটা আগের মতোই।

একই দেয়াল।
একই গন্ধ।
একই ভারী নীরবতা।

কিন্তু আজ কিছু বদলে গেছে।

সামির আর আগের মতো না।

তার চোখে এখন ভয় নেই।

আছে শূন্যতা।

অপেক্ষার শেষ প্রান্তে,

সে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে।

যেখানে সে দাগ কেটেছিল।

এক… দুই… তিন…

এখন সেই দাগ গুনে শেষ করা যায় না।

সময় এত লম্বা হয়ে গেছে—যেন এর কোনো শেষ নেই।

ইয়াসিন পাশে বসে।

সে আজ অনেকক্ষণ ধরে কিছু লিখছে না।

তার কাগজ ফাঁকা।

“কেন লিখতেছিস না?”—সামির জিজ্ঞেস করল।

ইয়াসিন তাকাল।

তার চোখে ক্লান্তি।

“সব লিখা শেষ হয়ে গেছে…”

সকালে সেলের দরজা খুলল।

একজন কর্মকর্তা ঢুকল।

“নতুন তালিকা।”

সবাই চুপ হয়ে গেল।

কারণ “তালিকা” মানেই—কিছু বদলাবে।

কেউ যাবে।

কেউ থাকবে।

নাম পড়া শুরু হলো।

“ইয়াসিন…”

সে মাথা তুলল।

সামির তার দিকে তাকাল।

“তোর নাম…”

ইয়াসিন উঠে দাঁড়াল।

তার মুখে কোনো হাসি নেই।

শুধু একটা প্রশ্ন—

“আমি কি ফিরতেছি… না যাচ্ছি?”

কেউ উত্তর দিল না।

বিদায়—আরেকটা,

ইয়াসিন সামিরের কাছে এসে দাঁড়াল।

“যদি আমি বাইরে যাই…”

সে থামল।

“তোর আম্মারে খুঁজমু…”

সামিরের বুক কেঁপে উঠল।

সে কিছু বলতে পারল না।

শুধু বলল—

“যদি থাকেন…”

এই “যদি”—
সবচেয়ে ভারী শব্দ।

বাইরের পৃথিবী—ধ্বংসস্তূপ

একটা শহর।

যেখানে আগে মানুষ থাকত।

এখন—

ভাঙা দেয়াল।
পোড়া ঘর।
নীরব রাস্তা।

কেউ হাঁটছে।

তারা খুঁজছে—
কিছু বেঁচে আছে কিনা।

একজন বৃদ্ধ বলল—
“এখানে একটা স্কুল ছিল…”

এখন সেখানে শুধু ধুলা।

একটা অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্র।

আহত মানুষে ভরা।

একজন ডাক্তার বলল—
“আমাদের ওষুধ শেষ…”

একজন মা তার ছেলেকে ধরে—

“ওরে বাঁচান…”

ডাক্তার তাকিয়ে থাকে।

তার চোখে অসহায়তা।

কারণ সে জানে—
সবাইকে বাঁচানো যাবে না।

ধ্বংসস্তূপের পাশে বসে আছে এক মহিলা।

তার কোলে একটা কাপড়।

সে কাপড়টা শক্ত করে ধরে আছে।

কেউ জিজ্ঞেস করল—

“আপনি এখানে কেন বসে আছেন?”

তিনি তাকালেন।

তার চোখ ফাঁকা।

“আমার ছেলে এখানে ছিল…”

কেউ কিছু বলল না।

কারণ তারা জানে—
এই গল্পটা নতুন না।

কারাগারের ভেতর—একাকীত্ব

ইয়াসিন চলে গেছে।

সামির একা।

সে দেয়ালে হাত রাখে।

“তুই থাকলি না…”

তার কণ্ঠ ভেঙে যায়।

এখন কথা বলার কেউ নেই।

শোনারও কেউ নেই।

নতুন বন্দী,

একদিন নতুন একজন এলো।

তার বয়স কম।

চোখে ভয়।

“ভাই… এখানে কী হয়?”—সে জিজ্ঞেস করল।

সামির তাকাল।

একটু চুপ করে বলল—

“সময় থামে…”

ছেলেটা বুঝল না।

কিন্তু একদিন বুঝবে।

মনের ভেতরের যুদ্ধ সামিরের

রাতে এখন সে ঘুমায় না।

সে চোখ বন্ধ করলে দেখে—

তার বাড়ি।

তার মা।

তার বোন।

তারপর—

 সব ভেঙে যায়।

সে উঠে বসে।

তার বুক ধড়ফড় করছে।

“আমি ভুলতে পারতেছি না…”

একটা খবর—শেষ আশাও ভেঙে যায়

কয়েকদিন পর—

একজন বন্দী আস্তে বলল—

“এই এলাকার একজন মহিলা…”

সামির তাকাল।

“তিনি আর নাই…”

তার মাথা ঘুরে গেল।

“নাম কী?”

ছেলেটা নাম বলল।

নাজওয়া।

সামিরের বুকের ভিতর  নিঃশব্দ চিৎকার

সামির কিছু বলল না।

সে চুপ করে বসে রইল।

তার চোখে পানি নেই।

কারণ কিছু কান্না—চোখ দিয়ে বের হয় না।

সে দেয়ালে মাথা ঠেকাল।

“আম্মা…”

এই শব্দটা তার ভেতরে আটকে গেল।

রাতে সে প্রথমবার কাগজ চাইল।

সে লিখতে শুরু করল।

“আমি সামির…”

তার হাত কাঁপছে।

“আমি এখনও বেঁচে আছি…”

সে থামল।

তার চোখ ভিজে উঠল।

“আমার মা নাই…”

কিন্তু সে লিখতে থাকে।

কারণ সে বুঝেছে—

যদি সে না লেখে,
তাহলে সবকিছু হারিয়ে যাবে।

সকালে আলো ঢুকছে সেলের ভেতরে।

সামির দেয়ালের পাশে বসে।

তার হাতে কাগজ।

সে আস্তে বলল—

“আমি থাকমু…”

এই “থাকা”—
একটা প্রতিরোধ।

বাইরে,

ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে একটা ছোট গাছ গজিয়েছে।

ধুলার ভেতর সবুজ।

ছোট।

কিন্তু বেঁচে আছে।

এই পৃথিবীতে সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেলেও—
কিছু জিনিস থাকে।

স্মৃতি।
লেখা।
মানুষের ভেতরের আলো।

কেউ যদি বেঁচে থাকে—
গল্পটাও বেঁচে থাকে।

চলবে............