ঢাকা, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৪:১৭:৫২ PM

উপন্যাস:“লুচ্চা”

মান্নান মারুফ
13-04-2026 01:44:53 PM
উপন্যাস:“লুচ্চা”

পর্ব:-৪

“লুচ্চা”—শব্দটা যেন কুদ্দুছের হৃদয়ে বিধে আছে।

এটা শুধু একটি শব্দ নয়, একটি আঘাত—যেটা বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে রক্তক্ষরণ ঘটায়। সেই আঘাতের ব্যথা এমন, যেটা সে কাউকে দেখাতে পারে না, কাউকে বোঝাতেও পারে না। 

আর সবচেয়ে বড় কথা—সে কাউকে বলতেও পারে না।

কারণ, সে মেহরিনকে খুব ভালোবাসে।
অনেক ভালোবাসে।

রাত গভীর। চারপাশে নিস্তব্ধতা। শুধু দূরে কোথাও কুকুরের ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে।

কুদ্দুছ তার বিছানায় শুয়ে আছে, কিন্তু ঘুম নেই তার চোখে । তার দৃষ্টি ছাদের দিকে স্থির, অথচ তার মন অনেক দূরে—সেই একটি শব্দের মধ্যে আটকে আছে।

“লুচ্চা…”

শব্দটা যেন তার বুকের ভেতর প্রতিধ্বনি তুলছে।

সে চোখ বন্ধ করে, কিন্তু তাতেও মুক্তি নেই। বরং তখন মেহরিনের কণ্ঠটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
“একদম লুচ্চা টাইপ…”

কুদ্দুছ হঠাৎ উঠে বসে।

তার শ্বাস ভারী হয়ে গেছে।

“আমি কি সত্যিই এমন?”—নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে সে।

কোনো উত্তর আসে না।

এই যন্ত্রণা তাকে ভেতর থেকে ছটফট করাচ্ছে।

সে চায়—কারও কাছে গিয়ে সব বলে দিতে। বলতে চায়, “আমি খারাপ না… আমি শুধু ভালোবাসি…”

কিন্তু তার মুখ খুলে না। সাহস হয়েও আবার চুপ কুদ্দুছ।

কারণ, সে জানে—যার জন্য এই কষ্ট, তাকে সে কখনও ছোট করতে পারবে না।

মেহরিনের নাম তার কাছে পবিত্র।

সে চাইলে আজই তার বন্ধুদের কাছে সব বলতে পারত—মেহরিন তাকে কী বলেছে, কীভাবে অপমান করেছে। কিন্তু সে তা করেনি। কখনও করতেও চায় নি।

কারণ, ভালোবাসা তার কাছে প্রতিশোধ নয়, সম্মান।

সকালে মা তাকে ডাকলেন—
“কুদ্দুছ, উঠবি না?”

সে ধীরে ধীরে উঠে বসে।

চোখের নিচে কালি, মুখে ক্লান্তি।

মা তাকিয়ে বললেন,
“তোর কী হয়েছে রে? শরীর খারাপ নাকি?”

কুদ্দুছ হালকা হাসল—
“না মা, কিছু না।”

এই “কিছু না” কথাটার ভেতরে কত কিছু লুকিয়ে আছে, সেটা মা বুঝতে পারেন না।

কলেজে গিয়ে সে আগের মতোই চুপচাপ থাকে।

ক্লাসে বসে, খাতা খুলে, কিন্তু মনোযোগ থাকে না। শিক্ষক কী বলছেন, সে কিছুই ঠিকমতো শুনতে পায় না।

তার মাথার ভেতর শুধু একটা শব্দ ঘুরে বেড়ায়।

“লুচ্চা…”

কখনও কখনও সে নিজের কান দুটো চেপে ধরে, যেন শব্দটা বন্ধ করতে পারে।

কিন্তু শব্দটা তো বাইরে না—ভেতরে।

একদিন রাশেদ আবার তাকে জিজ্ঞেস করল—
“তুই ঠিক আছিস তো?”

কুদ্দুছ একটু থেমে বলল—
“মানুষ কি সবসময় ঠিক থাকে?”

রাশেদ কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
“না, কিন্তু তুই খুব বদলে গেছিস।”

কুদ্দুছ চুপ করে থাকে।

তার মনে হয়—যদি সে সব বলে দেয়, তাহলে হয়তো একটু হালকা লাগবে।

কিন্তু সাথে সাথে আরেকটা ভাবনা আসে—
“না, এটা আমার একার কষ্ট।”

বিকেলে সে ছাদে উঠে ।

আকাশটা আজ মেঘলা। হালকা বাতাস বইছে।

সে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষন।

তার মনে হয়—এই বাতাস যদি তার কষ্টগুলো উড়িয়ে নিয়ে যেত!

সে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে।

তার মনে পড়ে—মেহরিনের হাসি, তার কণ্ঠ, তার সেই নির্লিপ্ত দৃষ্টি।

তার বুকটা আবার কেঁপে ওঠে।

“আমি তো শুধু ভালোবেসেছিলাম…”

তার ঠোঁট কাঁপে।

কুদ্দুছ এখন একটা অদ্ভুত অবস্থার মধ্যে আছে।

সে কষ্ট পাচ্ছে—ভীষণ কষ্ট।
কিন্তু সে এই কষ্টটাকে দূর করতে চায় না।

কারণ, এই কষ্টের ভেতরেই মেহরিন আছে।

যে তাকে আঘাত দিয়েছে, সেই মানুষটাই আবার তার ভালোবাসার কেন্দ্র।

এই দ্বন্দ্বটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ছটফট করায়।

রাতে ডায়েরি খুলে সে লিখতে বসে।

আজ তার লেখাগুলো আগের চেয়ে বেশি এলোমেলো।

“আজ খুব কষ্ট হচ্ছে।
মনে হচ্ছে, বুকের ভেতর কেউ তীর মেরে রেখেছে।
আমি সেটা বের করতে পারছি না…
আর বের করতেও চাই না।”

তার চোখে পানি জমে ।

সে আবার লিখে—

“আমি যদি এই কষ্ট ভুলে যাই,
তাহলে কি তোমাকেও ভুলে যাব?”

এই প্রশ্নটা তাকে থামিয়ে দেয়।

সে অনেকক্ষণ কলমটা হাতে নিয়ে বসে থাকে।

কুদ্দুছের মনে হয়—সে যেন একটা ঠান্ডা যুদ্ধের মধ্যে আছে।

একদিকে তার আত্মসম্মান, অন্যদিকে তার ভালোবাসা।

আত্মসম্মান বলে—
“তুই অপমানিত হয়েছিস, দূরে সরে যা।”

আর ভালোবাসা বলে—
“সে বুঝতে পারেনি, তাকে ছেড়ে যাস না।”

এই দুই কণ্ঠের মাঝে দাঁড়িয়ে কুদ্দুছ দিশেহারা।

একদিন রাতে সে আয়নার সামনে দাঁড়ায়।

নিজের দিকে তাকিয়ে থাকে।

“তুই কি লুচ্চা?”—সে নিজেকেই প্রশ্ন করে।

তার চোখে ক্লান্তি, কষ্ট, আর এক ধরনের অসহায়তা।

সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে—
“না… আমি না…”

কিন্তু তার কণ্ঠে দৃঢ়তা নেই।

কারণ, যখন প্রিয় মানুষটা একটা নামে ডাকে, তখন নিজের বিশ্বাসও কেঁপে ওঠে।

তবুও, সবকিছুর পরেও একটা জিনিস বদলায়নি।

তার ভালোবাসা।

সে এখনও মেহরিনকে ভালোবাসে—একই গভীরতায়, একই নিঃস্বার্থতায়।

এই ভালোবাসাটাই তাকে বাঁচিয়ে রাখছে, আবার কষ্টও দিচ্ছে।

রাতের শেষ প্রহরে সে ছাদে গিয়ে দাঁড়ায়।

আকাশে মেঘ সরে গিয়ে চাঁদ উঠেছে।

চাঁদের আলো তার মুখে পড়ে—ফ্যাকাশে, ক্লান্ত, কিন্তু শান্ত।

সে আস্তে করে বলে—

“তুমি যদি জানতে, আমি কেমন করে তোমাকে ভালোবাসি…
তাহলে হয়তো আমাকে লুচ্চা বলতে না…”

তার কণ্ঠ ভেঙে যায়।

কিন্তু সে কাঁদে না।

কারণ, তার কান্নাও এখন নীরব হয়ে গেছে।

এইভাবে কুদ্দুছ তার যন্ত্রণাকে নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখে বেঁচে আছে।

সে কাউকে কিছু বলে না, কাউকে দোষ দেয় না।

শুধু নিজের ভেতরে একটা আগুন জ্বালিয়ে রাখে—যেটা তাকে প্রতিদিন পোড়ায়, আবার বাঁচিয়েও রাখে।

আর সেই আগুনের নাম—
ভালোবাসা।

(চলবে…)