পর্ব ২
কুদ্দুছের জীবনে ভাঙনটা একদিনে আসেনি।
ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে, অদৃশ্যভাবে সবকিছু ভেঙে পড়েছে—যেমন করে শুকনো মাটিতে চির ধরতে থাকে, কিন্তু বাইরে থেকে বোঝা যায় না।
সকালের আলোটা আজও তার ঘরে ঢুকেছে, কিন্তু সেই আলোয় কোনো উষ্ণতা ছিল না।
কুদ্দুছ ঘুম থেকে ওঠে খুব ভোরে। ঘুম ভাঙার পরও সে কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকে। কারণ জেগে উঠলেই তাকে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।
আজও তার একটা ইন্টারভিউ আছে।
গত ছয় মাসে এটা তার ১৭তম ইন্টারভিউ।
সে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। নিজের মুখটা দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। একসময় যে মুখে আত্মবিশ্বাস ছিল, আজ সেখানে ক্লান্তি আর হতাশার ছাপ।
তবুও সে নিজেকে বলে—
“আজ হয়তো কিছু একটা হবে…”
ইন্টারভিউয়ের জায়গাটা শহরের মাঝামাঝি একটা অফিস বিল্ডিং। বড় গেট, সুন্দর সাজানো রিসেপশন—সবকিছুই কুদ্দুছকে মনে করিয়ে দেয়, সে এখানে ঠিক মানানসই নয়।
তবুও সে ভেতরে ঢোকে।
রিসেপশনে বসে থাকা মেয়েটা তার দিকে তাকায়, তারপর একটা ফরম দেয়। কুদ্দুছ ফরমটা পূরণ করতে থাকে।
তার পাশে বসে আছে আরও কয়েকজন। তাদের পোশাক ঝকঝকে, কথা বলার ভঙ্গিতে আত্মবিশ্বাস।
একজন অন্যজনকে বলছে—
“ভাই, আমি তো আগেও এই টাইপের জব করেছি…”
কুদ্দুছ চুপ করে থাকে।
তার বলার মতো কিছু নেই।
ডাক আসে।
সে ভেতরে ঢোকে।
দুইজন ইন্টারভিউয়ার বসে আছে। তারা কুদ্দুছের সিভি দেখে।
একজন ভ্রু কুঁচকে বলে—
“আপনার কোনো এক্সপেরিয়েন্স নেই?”
কুদ্দুছ ধীরে বলে—
“স্যার, আমি ফ্রেশ… কিন্তু আমি দ্রুত শিখতে পারি।”
আরেকজন হালকা হাসে—
“সবাইই তো এটা বলে।”
কিছু প্রশ্ন হয়। কুদ্দুছ যতটা পারে উত্তর দেয়। কিন্তু সে বুঝতে পারে—এই উত্তরগুলো যথেষ্ট না।
শেষে তারা বলে—
“ঠিক আছে, আমরা আপনাকে জানাবো।”
এই কথাটা কুদ্দুছ বহুবার শুনেছে।
এটার মানে কি তা সে খুব ভালো করেই জানে—
“আপনাকে আর দরকার নেই।”
বাইরে বেরিয়ে সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। শহরের ভিড় তাকে গিলে খাচ্ছে।
চারপাশে সবাই ব্যস্ত, সবাই কোথাও যাচ্ছে।
শুধু সে-ই যেন কোথাও যাওয়ার নেই।
ফোনটা বের করে সে।
একসময় সে প্রতিটা ইন্টারভিউ শেষে বন্ধুদের কল করত।
“দোয়া করিস ভাই, যেন হয়ে যায়।”
আজ সে কাউকে ফোন করে না।
কারণ সে জানে—
কেউ আর সেই আগ্রহ নিয়ে তার কথা শুনবে না।
বিকেলে সে বাসায় ফেরে।
তার মা ফোন করেছে কয়েকবার।
কুদ্দুছ কলব্যাক করে।
ওপাশ থেকে মায়ের কণ্ঠ—
“কিরে, কিছু হলো?”
কুদ্দুছ একটু থেমে বলে—
“না… এখনও না।”
মা কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
তারপর ধীরে বলে—
“বাবা, তুই কিছু একটা কর। এভাবে তো আর জীবন চলবে না…”
এই কথাগুলো কুদ্দুছকে ভেতর থেকে কেটে দেয়।
সে জানে, মা ভুল কিছু বলছে না।
কিন্তু তার কষ্টটা কেউ বুঝছে না।
রাতে সে পুরনো বন্ধুদের একটা গ্রুপে ঢুকে।
সেখানে অনেক মেসেজ।
কারও বিয়ের ছবি, কারও নতুন চাকরির খবর, কারও বিদেশ যাওয়ার আপডেট।
কুদ্দুছ স্ক্রল করে।
কিন্তু কিছু লেখে না।
কারণ তার বলার মতো কিছু নেই।
হঠাৎ করে একটা ছবি তার চোখে পড়ে।
ছবিটা ঐশি”র।
হাসছে।
তার পাশে সেই একই ভদ্রলোক।
ক্যাপশনে লেখা—
“New beginnings
”
কুদ্দুছের বুকটা ধক করে ওঠে।
তার মনে হয়, কেউ যেন তার ভিতরটা চেপে ধরেছে।
সে ফোনটা বন্ধ করে দেয়।
সেদিন রাতে সে বাইরে বের হয়।
শহরের রাস্তাগুলো ফাঁকা হয়ে এসেছে। বাতাসে এক ধরনের শীতলতা।
সে হাঁটতে থাকে।
কোনো গন্তব্য নেই।
একসময় সে সেই পুরনো মাঠের সামনে এসে দাঁড়ায়, যেখানে সে আর তার বন্ধুরা একসময় খেলত।
আজ সেখানে কেউ নেই।
মাঠটা নিঃশব্দ।
কুদ্দুছ ধীরে বসে পড়ে।
তার মনে পড়ে—
একদিন এই মাঠেই সে বলেছিল—
“একদিন আমি অনেক বড় কিছু করবো।”
সবাই হাততালি দিয়েছিল।
আজ সেই স্বপ্নটা কোথায়?
তার চোখে পানি আসে।
সে নিজেকে জিজ্ঞেস করে—
“আমি কি সত্যিই চেষ্টা করছি না?
নাকি আমার ভাগ্যটাই খারাপ?”
হঠাৎ করে তার মনে হয়—
সে ক্লান্ত।
ভীষণ ক্লান্ত।
শুধু শরীর না—মনও খুব খারাপ।
পরের দিন থেকে কুদ্দুছ ছোট ছোট কাজ খুঁজতে শুরু করে।
কোথাও সেলসম্যান, কোথাও ডেলিভারি বয়, কোথাও দোকানে বসা—
কিন্তু প্রতিটা জায়গায় একই প্রশ্ন—
“আগে কোথায় কাজ করেছেন?”
তার উত্তর—
“কোথাও না।”
আর তারপরই সেই একই দৃষ্টি।
অবহেলার।
একটা দোকানে মালিক সরাসরি বলে দেয়—
“দেখেন ভাই, আমরা অভিজ্ঞ লোক নিই। আপনাকে দিয়ে হবে না।”
এই “আপনাকে দিয়ে হবে না” কথাটা কুদ্দুছের কানে বারবার বাজতে থাকে।
সে হাঁটতে হাঁটতে ভাবে—
তাহলে কি সত্যিই তাকে দিয়ে কিছু হবে না?
সন্ধ্যায় সে আবার সেই চায়ের দোকানে যায়।
আজও কেউ তাকে ডাকে না।
সে নিজেই বলে—
“চাচা, একটা চা দেন।”
রহিম চাচা চা দেন, কিন্তু আগের মতো কথাও বলেন না তিনি।
কুদ্দুছ চা হাতে নিয়ে বসে থাকে।
তার মনে হয়—
এই শহরটা তাকে ধীরে ধীরে মুছে ফেলছে।
সে বুঝতে পারে—
ভাঙন শুরু হয়ে গেছে।
এবং এই ভাঙন শুধু তার জীবনে না—
তার আত্মসম্মান, তার সম্পর্ক, তার স্বপ্ন—সবকিছুতে।
রাত নামছে।
কুদ্দুছ আকাশের দিকে তাকায়।
তার মনে হয়—
এই বিশাল পৃথিবীতে তার জায়গাটা খুব ছোট।
হয়তো অদৃশ্য।
কিন্তু তবুও সে এখনও পুরোপুরি হাল ছাড়েন নি।
তার ভিতরে কোথাও একটা ছোট্ট আশা এখনও বেঁচে আছে—
“হয়তো… একদিন সব বদলে যাবে।”
কিন্তু সেই দিনটা কবে আসবে?
নাকি আদৌ আসবে না ?
এই প্রশ্নের উত্তর তখনও কুদ্দুছ জানে না…
চলবে.......