ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ১০:০৪:৩৯ PM

উপন্যাস: “কষ্ট”

মান্নান মারুফ
09-04-2026 08:04:02 PM
উপন্যাস: “কষ্ট”

পর্ব-১

কষ্ট কখনও দেখা যায় না—কিন্তু অনুভব করা যায় প্রতিটি নিঃশ্বাসে। কুদ্দুছ আজ অনেকক্ষণ ধরে বসে আছে পুরনো সেই চায়ের দোকানের সামনে। একসময় এই জায়গাটা ছিল তার নিজের মতো একটা রাজত্ব। বন্ধুদের হাসি, আড্ডা, স্বপ্ন—সবকিছু মিলিয়ে এখানে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো কেটেছে।

কিন্তু আজ…

আজ কেউ তাকে ডাকছে না।

চায়ের দোকানের মালিক রহিম চাচা তাকিয়েও দেখলেন না। অথচ একসময় কুদ্দুছ আসলে তিনি নিজেই চা বানিয়ে দিতেন, বলতেন—
“এই নে, তোর জন্য আলাদা করে বানালাম।”

আজ সেই চা-টা কুদ্দুছ নিজে চেয়ে নিতে লজ্জা পাচ্ছে।

কারণ সে এখন “কেউ না”।

কুদ্দুছ নিজের দিকে তাকায়। পুরনো শার্ট, কিছুটা ছেঁড়া প্যান্ট, চোখের নিচে কালো দাগ। এই শহরেই সে বড় হয়েছে, এই শহরের প্রতিটা রাস্তায় তার স্মৃতি আছে—কিন্তু আজ মনে হচ্ছে শহরটা তাকে ভুলে গেছে।

কিংবা…
হয়তো শহর না—মানুষগুলোই তাকে ভুলে গেছে।

একসময় কুদ্দুছ ছিল সবার প্রিয়।

স্কুলে ভালো ছাত্র, কলেজে জনপ্রিয়,সাহসী যুবক, বন্ধুদের আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু। সবাই তাকে নিয়ে গর্ব করত। এমনকি তার ভালোবাসার মানুষ ঐশিও বলত—
“তুমি একদিন অনেক বড় হবে, কুদ্দুছ।”

কুদ্দুছ বিশ্বাস করত।

স্বপ্ন দেখত।

কিন্তু স্বপ্ন সবসময় বাস্তব হয় না তার প্রমান কুদ্দুছ নিজেই।

কলেজ জীবন,বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি শেষ হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় তার জীবনের আসল পরীক্ষা। চাকরি খোঁজা, একের পর এক ব্যর্থতা, পরিচিতদের কাছে ছোট হয়ে যাওয়া—সবকিছু মিলে সে যেন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।

প্রথমে বন্ধুরা পাশে ছিল।

তারপর ধীরে ধীরে তারা ব্যস্ত হয়ে গেল নিজেদের জীবনে।

কারও চাকরি হলো, কেউ ব্যবসা শুরু করল, কেউ বিদেশে চলে গেল।

আর কুদ্দুছ?

সে থেকে গেল… ঠিক আগের জায়গাতেই।

সবচেয়ে বেশি বদলে গেল ঐশি।

যে মেয়েটা একসময় কুদ্দুছ ছাড়া একদিনও থাকতে পারত না, সেই ঐশি এখন তাকে দেখলে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে।

আজ বিকেলেও কুদ্দুছ তাকে দেখেছে।

রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে ছিল ঐশি। সুন্দর পোশাক, চোখে সানগ্লাস—তার পাশে একজন ভদ্রলোক।

কুদ্দুছ প্রথমে ভেবেছিল, ঐশি তাকে দেখেনি।

কিন্তু না…

ঐশিও কুদ্দুছকে দেখেছিল।

দেখেও না দেখার ভান করেছিল সে।

এই একটা মুহূর্ত কুদ্দুছের ভিতরটা ভেঙে দিল।

সে বুঝতে পারল—

সে শুধু গরিব হয়নি,
সে এখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে।

রাত নামছে।

কুদ্দুছ ধীরে ধীরে হাঁটছে তার ভাড়া করা ছোট্ট ঘরের দিকে। ঘরটা অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে, আর নিঃসঙ্গ।

দরজা খুলতেই একটা গুমোট গন্ধ আসে।

এটাই এখন তার পৃথিবী।

সে বিছানায় বসে থাকে কিছুক্ষন।

মোবাইলটা হাতে নেয়।

কোনো মেসেজ নেই।
কোনো কল নেই।

একসময় এই ফোনটাই থামত না—আজ সারাদিনেও একটা নোটিফিকেশন আসে নাই।

কুদ্দুছ হঠাৎ করে নিজের সাথে কথা বলতে শুরু করে—

“আমি কি সত্যিই এতটাই বদলে গেছি?
নাকি মানুষগুলো বদলে গেছে?”

তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু এই কান্না কেউ দেখে না।

কারণ—

কষ্ট কখনও দেখা যায় না।

সেদিন রাতে কুদ্দুছ একটা সিদ্ধান্ত নেয়।

সে আর কাউকে খুঁজবে না।

কেউ যদি তার খোঁজ না রাখে, সেও কারও খোঁজ রাখবে না।

কিন্তু মানুষের মন কি এত সহজে বদলায়?

সে চোখ বন্ধ করে—

আর সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে ঐশির কথা। ঐশির ছবি ভেসে উঠে সামনে।

“তুমি আমাকে কখনও ছেড়ে যাবে না, তাই না?”

ঐশির সেই প্রশ্নটা আজও কুদ্দুছের কানে বাজে।

সে আস্তে করে বলে—

“আমি তো যাইনি… তুমি চলে গেছো।”

সেই রাতে কুদ্দুছ ঘুমাতে পারে নাই।

তার মনে হয়—

এই পৃথিবীতে সে এখন একা।

পুরোপুরি একা।

এবং এখান থেকেই শুরু হয় তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়…

চলবে............