ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৩:২৬:৫০ PM

উপন্যাস: বাঁকা চোখ”

মান্নান মারুফ
08-04-2026 12:56:36 PM
উপন্যাস: বাঁকা চোখ”

পর্ব – ৬

ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে সেই রাতটা ছিল অস্বাভাবিক ভারী। আকাশে চাঁদ ছিল, কিন্তু কুয়াশার চাদরে ঢেকে গিয়ে তার আলো যেন মাটিতে পৌঁছাতে পারছিল না। চারপাশ নিস্তব্ধ—তবু সেই নীরবতার ভেতর একটা অস্থিরতা ছিল, যেন কিছু একটা ভেঙে পড়ার অপেক্ষায়।

মজিবুর রহমান উঠানের এক কোণে বসে ছিলেন। তার চোখে ঘুম নেই, মনে শান্তি নেই। দিনের ঘটনার অপমান, মানুষের কথার বিষ—সব মিলিয়ে তিনি ভেতর থেকে যেন ক্ষয়ে যাচ্ছিলেন।

রিমা ঘরের ভেতর বসে ছিল। তার চোখ লাল, মন অস্থির। সে অনেকক্ষণ ধরে ভাবছিল—কী করলে এই অপমানের শেষ হবে? কী করলে দাদুকে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়া যাবে?

তার ভেতরে একটা ভয়ংকর চিন্তা জন্ম নিয়েছে। সে জানে, এই চিন্তা স্বাভাবিক নয়। তবুও পরিস্থিতি তাকে সেই দিকেই ঠেলে দিচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত সে উঠে দাঁড়াল।

ধীরে ধীরে বাইরে এসে মজিবুর রহমানের পাশে বসল।

“দাদু…”—তার কণ্ঠে কাঁপন।

মজিবুর রহমান তাকালেন। “কি হয়েছে মা?”

রিমা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। যেন সাহস সঞ্চয় করছে।

তারপর খুব ধীরে বলল—

“একটা কথা বলব… তুমি রাগ করবে না তো?”

“বল,”—তিনি শান্ত গলায় বললেন।

রিমা গভীর শ্বাস নিল।

“দাদু… সমাজ যখন আমাদের নিয়ে নোংরা কথা বলছেই… তবে তাই হোক…”

মজিবুর রহমান ভ্রু কুঁচকালেন। “মানে?”

রিমা চোখ তুলে তাকাল। তার দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা আর ভাঙা সাহসের মিশ্রণ।

“তুমি… তুমি আমায় বিয়ে করো।”

মুহূর্তের মধ্যে যেন সবকিছু থেমে গেল।

হাওয়া থমকে গেল, সময় থেমে গেল।

মজিবুর রহমানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“কি বললি তুই?”—তার কণ্ঠ কাঁপছিল।

রিমা এবার স্পষ্ট করে বলল—

“তাহলে কেউ আর কিছু বলতে পারবে না। আমি তোমার ঘরে শান্তিতে থাকতে পারব। কেউ আঙুল তুলতে পারবে না…”

এরপর আর কিছু বলার আগেই মজিবুর রহমান যেন বিস্ফোরিত হলেন।

“চুপ!”—তিনি চিৎকার করে উঠলেন—“এই কথা তুই কীভাবে ভাবলি?”

তার চোখে ছিল আতঙ্ক, যন্ত্রণা, আর গভীর ক্ষোভ।

“এটা পাপ! এটা অন্যায়! এটা সম্পর্কের অপমান!”

রিমা কেঁপে উঠল, কিন্তু থামল না।

“পাপ কি আমরা করছি, দাদু?”—সে কাঁদতে কাঁদতে বলল—“না সমাজ আমাদের পাপী বানাচ্ছে?”

এই প্রশ্নটা মজিবুর রহমানকে থামিয়ে দিল।

তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

রিমা বলল—

“আমি জানি, এটা ঠিক না। কিন্তু আমি কী করব? তারা তো আমাদের থাকতে দেবে না। আমি গেলে তুমি একা হয়ে যাবে। তুমি গেলে আমি কোথায় যাব?”

তার কণ্ঠে অসহায়তা।

“আমি শুধু একটা পথ খুঁজছি… একটা পরিচয়, যাতে আমরা বাঁচতে পারি…”

মজিবুর রহমান ধীরে ধীরে মাথা নিচু করলেন।

তার চোখ দিয়ে জল পড়ছে।

“মানুষের কথার জন্য আমরা নিজেদের সম্পর্ক বদলে ফেলব?”—তিনি ফিসফিস করে বললেন—“তাহলে তো তাদের মিথ্যাই সত্যি হয়ে যাবে…”

রিমা চুপ।

সে জানে, দাদু ঠিক বলছেন।

কিন্তু তার ভয়ও সত্যি।

“আমি তোমাকে হারাতে চাই না…”—সে আস্তে বলল।

মজিবুর রহমান তার দিকে তাকালেন।

তার চোখে গভীর মমতা।

“তুই আমাকে হারাবি না,”—তিনি ধীরে বললেন—“আর আমি তোকে ছাড়ব না। কিন্তু এইভাবে না… কখনো না।”

তিনি রিমার হাত ধরলেন।

“ভালোবাসা মানে শুধু একসাথে থাকা না। ভালোবাসা মানে ঠিক পথে থাকা। অন্যায়কে আশ্রয় না দেওয়া।”

রিমা কাঁদতে লাগল।

“কিন্তু আমরা কোথায় যাব?”

এই প্রশ্নটা বাতাসে ঝুলে রইল।

মজিবুর রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“যেখানে সত্যের জন্য লড়াই করা যায়, সেখানেই আমাদের জায়গা। পালিয়ে গেলে চলবে না।”

এই কথাগুলো সহজ ছিল না।

কিন্তু সত্যি ছিল।

রাত আরও গভীর হলো।

কুয়াশা আরও ঘন হলো।

রিমা দাদুর পাশে বসে রইল। তাদের মাঝে আর কোনো কথা নেই, কিন্তু এক ধরনের বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে।

একটা সীমারেখা তারা অতিক্রম করেনি—করবেও না।

কারণ তারা জানে, তাদের সম্পর্কের পবিত্রতা কোনো অপবাদ দিয়ে মুছে ফেলা যাবে না।

ওদিকে গ্রামের মানুষ কিছুই জানে না এই রাতের কথোপকথন।

তারা এখনো নিজেদের মতো গল্প বানাচ্ছে।

“মেয়েটা নিশ্চয়ই কিছু একটা করবে…”

“এই বাড়িতে ঠিক কিছু একটা ঘটছে…”

কিন্তু তারা জানে না—এই বাড়িতে যা ঘটছে, তা হলো এক কঠিন লড়াই।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অপবাদের বিরুদ্ধে, আর নিজের ভেতরের দুর্বলতার বিরুদ্ধেও।

পরদিন সকালে রিমার চোখে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু এক ধরনের স্বচ্ছতা।

সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকাল।

সে জানে—গত রাতের চিন্তাটা ভুল ছিল।

কিন্তু সেই ভুলের মধ্য দিয়েই সে বুঝেছে—ভালোবাসার আসল রূপ কী।

ভালোবাসা কখনো নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়ে বাঁচে না।

ভালোবাসা নিজেকে সঠিক রাখে, যতই কঠিন হোক।

সে বাইরে বের হলো।

মানুষ তাকাচ্ছে।

বাঁকা চোখে।

কিন্তু আজ সে একটু ভিন্নভাবে তাকাল।

ভয় নিয়ে না—সাহস নিয়ে।

কারণ সে জানে—তার সম্পর্ক পবিত্র।

তার ভালোবাসা সত্য।

এবং এই সত্যকে কোনো মিথ্যা দিয়ে ঢেকে রাখা যাবে না।

মজিবুর রহমান উঠানে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

রিমা তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

কিছু না বলেই।

কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই ছিল এক প্রতিজ্ঞা—

তারা একসাথে থাকবে, কিন্তু মাথা নত করে নয়।

সত্যের পথে।

ব্রহ্মপুত্র তখন ধীরে বয়ে যাচ্ছে।

নদী জানে—ঝড় এখনো শেষ হয়নি।

কিন্তু এই ঝড়ের মাঝেই মানুষ নিজেদের খুঁজে পায়।

আর ভালোবাসা—তার আসল রূপে প্রকাশ পায়।

(চলবে…)