ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চলমান পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শ্রমিকদের দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলনে অস্থিরতা তৈরিতে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত কয়েকজন মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, এ ঘটনায় ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ১০ নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিরা হলেন—মোয়াজ্জেম শাহরিয়ার নিয়াজ (২৬), মো. আরিফ আকন্দ (২৯), মো. ওলিউল্লাহ অনিক (২০), মো. মাহিম মোল্লা (১৯), মো. রমজান সরকার (১৮), মো. কামাল গাজী (৩২), আলীফ হোসেন ইমন (২৬), মো. নাহিদ হাসান (২০) এবং মো. আরিফ (২০)। প্রাপ্ত তালিকায় মো. কামাল গাজীর নাম দুইবার রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শ্রমিক আন্দোলনে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত আরও কয়েকজনও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আন্দোলন ঘিরে ছাত্রলীগের কয়েকজন পদধারী নেতার সক্রিয়তার তথ্য সামনে এসেছে। তাদের মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজিবুল ইসলাম নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আন্দোলনস্থলের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করেছেন।
রোববার দুপুর ২টা ১৭ মিনিটে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, “বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কারও ওপর ভর করে ক্ষমতায় আসবে না। আমরা জনগণের শক্তি সঙ্গে নিয়ে কর্মসূচি দেব।”
এর আগে একই দিন দুপুর ১২টা ৫১ মিনিট, দুপুর ১টা ২৬ মিনিট এবং সকাল ১০টা ৬ মিনিটে তিনি আন্দোলনসংক্রান্ত একাধিক ভিডিও ও পোস্ট প্রকাশ করেন। একটি পোস্টে তিনি লেখেন, “শ্রমিকের বেতন ৩০০০০ বৃদ্ধির দাবিতে টানা চতুর্থ দিনের মতো আজকেও শ্রমিক আন্দোলন চলছে।”
শনিবার সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটে তিনি আগুন জ্বালানোর একটি ভিডিওও পোস্ট করেন। ভিডিওটিতে “৩০ হাজার বেতন দে, নইলে গদি ছেড়ে দে” স্লোগান শোনা যায়।
তবে এসব পোস্ট থেকে আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা বা কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না। বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ।
এদিকে আন্দোলনে সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো চক্র যুক্ত হয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে এবং সেই প্রক্রিয়ায় বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে। শ্রমিকদের বিষয়টি বোঝানোর পরও তারা সড়ক ছাড়েননি। পুলিশের কাছে মনে হয়েছে, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কোনো সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী চক্র যুক্ত হয়ে পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করছে।
গত চার দিন ধরে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে রাজধানীসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আন্দোলন চলছে। মিরপুরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ভাঙচুর এবং একটি পুলিশ গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের পর নিরাপত্তার স্বার্থে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশনে সাময়িকভাবে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়।
অন্যদিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরেও একই দাবিতে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। আন্দোলনকারীরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে সড়কে আগুন জ্বালান। পাশাপাশি ব্যাংক, যানবাহন ও দোকানপাটে ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনাগুলো গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।
এদিকে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিকে কেন্দ্র করে চলমান আন্দোলনের পাশাপাশি এর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং শ্রমিকদের দাবির শান্তিপূর্ণ সমাধান নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্টদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।