পর্ব – ২
রাত তখন প্রায় দুইটা।
শহরের উপর নেমে এসেছে ভারী নীরবতা। মাঝে মাঝে দূরে কোথাও কুকুরের ডাক, আর বাতাসে ধুলোর গন্ধ।
সামির ঘুমাচ্ছিল না।
আজকাল সে ঘুমাতে পারে না।
কেন জানি তার মনে হচ্ছিল—আজ কিছু একটা ঘটবে।
হঠাৎ—
ধাম! ধাম! ধাম!
দরজায় প্রচণ্ড শব্দ।
তার মা ঘুম ভেঙে উঠে বসে পড়লেন।
“কে? এই রাতে?”
কোনো উত্তর নেই।
শুধু আবার—
ধাম!
এবার দরজাটা প্রায় ভেঙে পড়ার মতো শব্দ হলো।
“দরজা খোলো!”
একটা কড়া, অচেনা কণ্ঠ।
নাজওয়ার হাত কাঁপতে লাগল।
“সামির…”
সামির উঠে দাঁড়াল।
“আমি খুলতেছি।”
দরজা খুলতেই এক ঝলক আলো চোখে এসে লাগল।
কয়েকজন সশস্ত্র মানুষ, তাদের মুখে কঠোরতা। তাদের চোখে কোনো অনুভূতি নেই—শুধু দায়িত্ব।
“সামির?”—একজন জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ।”
“তোমাকে আমাদের সাথে যেতে হবে।”
“কেন?”
“প্রশ্ন করো না।”
নাজওয়া এগিয়ে এলেন।
“আমার ছেলেকে কোথায় নিবেন? সে কী করছে?”
কেউ উত্তর দিল না।
একজন সামিরের হাত ধরে টেনে বের করল।
“আম্মা!”—সে চিৎকার করল।
নাজওয়া ছেলের দিকে ছুটে গেলেন।
“ওরে ছাইড়া দেন! ও কিছু করে নাই!”
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল।
কিন্তু কেউ থামল না।
একজন তাকে সরিয়ে দিল।
তিনি পড়ে গেলেন মাটিতে।
তার মাথার ওড়না সরে গেল।
তিনি উঠতে চাইলেন—পারলেন না।
শুধু চিৎকার করতে লাগলেন—
“আমার পোলারে নিও না! প্লিজ!”
কিন্তু রাতের অন্ধকারে সেই আর্তনাদ গিলে ফেলল সব শব্দ।
সামিরকে একটা গাড়িতে তোলা হলো।
তার চোখে কাপড় বেঁধে দেওয়া হলো।
হাত শক্ত করে বেঁধে রাখা।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
সে বুঝতে পারছে না—কোথায় যাচ্ছে।
তার মাথার ভেতর শুধু একটাই চিন্তা—
“আম্মা এখন কী করছে?”
জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ
চোখের বাঁধন খুলতেই তীব্র আলো।
একটা ঠাণ্ডা ঘর।
দেয়াল সাদা—কিন্তু অদ্ভুতভাবে চাপা।
একটা চেয়ার।
তাকে বসানো হলো।
একজন লোক সামনে এসে বসলো।
“নাম?”
“সামির।”
“তুমি পাথর ছুঁড়েছিলে?”
“না।”
“মিথ্যা বলো না।”
“আমি বলছি, আমি করি নাই।”
লোকটা হালকা হাসল।
“সবাই প্রথমে এটা বলে।”
একটা ফাইল খুলে দেখাল।
“এখানে লেখা আছে—তুমি অংশ নিয়েছো সহিংসতায়।”
সামির মাথা নেড়ে বলল,
“আমি শুধু দাঁড়ায়া ছিলাম।”
“দাঁড়িয়ে থাকা মানেই সমর্থন।”
এই কথাটার কোনো উত্তর নেই।
ঘন্টার পর ঘন্টা প্রশ্ন।
একই প্রশ্ন।
একই উত্তর।
“তুমি স্বীকার করো।”
“আমি করি নাই।”
“স্বীকার করো!”
চিৎকার।
টেবিলে হাত রেখে আঘাত।
সামির চুপ।
তার গলা শুকিয়ে গেছে।
“পানি…”
কেউ দেয় না।
সময়ের হিসাব নেই।
দিন না রাত—বুঝা যায় না।
ঘুমাতে দেওয়া হয় না।
চোখ বন্ধ করলেই—
“উঠো!”
আবার প্রশ্ন।
আবার একই কথা।
একসময় সে নিজেই ভাবতে শুরু করল—
“আমি কি সত্যিই কিছু করছিলাম?”
মানুষকে ভাঙার এটাই সবচেয়ে সহজ উপায়।
অন্যদিকে—মায়ের আর্তনাদ
সকাল হয়েছে।
নাজওয়া বাড়ির সামনে বসে আছে।
কাদঁতে কাদঁতে তার চোখ শুকিয়ে গেছে।
কান্না যেন আর বের হয় না।
পাশের বাড়ির লোকজন জড়ো হয়েছে।
কেউ পানি দিচ্ছে, কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছে।
কিন্তু কোনো শব্দ তার কানে ঢুকছে না।
“আমার ছেলারে ফিরায়া দাও…”
সে বারবার একই কথা বলছে।
তার ছোট মেয়ে এসে জড়িয়ে ধরল।
“আম্মা, ভাইয়া কই?”
এই প্রশ্নটার কোনো উত্তর নেই।
নাজওয়া মেয়েকে বুকে টেনে নিলেন।
তার বুক কাঁপছে।
“ও আসবে… ইনশাআল্লাহ আসবে…”
কিন্তু নিজের কণ্ঠেই সে বিশ্বাস খুঁজে পেল না।খোঁজ
নাজওয়া থানায় গেলেন।
কেউ কিছু জানে না।
এক অফিস থেকে আরেক অফিস।
একই উত্তর—
“আমরা জানি না।”
“তালিকায় নাম নেই।”
“পরে আসেন।”
দিন যায়।
রাত যায়।
সামিরের কোনো খবর নেই।
আবার জিজ্ঞাসাবাদ
“শেষবার বলছি—স্বীকার করো।”
সামির মাথা তুলল।
তার চোখ লাল।
“আমি মিথ্যা কইবো না।”
লোকটা চুপ করে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল—
“তাহলে তুমি এখানেই থাকবা।”
এই কথাটার ভেতর ভয় আছে।
অজানা সময়ের ভয়।
একটা অন্ধকার সেলে বসে আছে সামির।
দেয়ালে মাথা ঠেকানো।
সে চোখ বন্ধ করল।
তার মনে পড়ছে—
তার মা।
তার বোন।
তার বাড়ি।
হঠাৎ তার চোখ বেয়ে পানি পড়ল।
সে প্রথমবার ফিসফিস করে বলল—
“আম্মা… আমি ভয় পাইতেছি…”
এদিকে নাজওয়া রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে।
তার ঠোঁট কাঁপছে।
“আল্লাহ… আমার পোলারে ফেরত দাও…”
তার এই প্রার্থনা—
আকাশে মিলিয়ে যায়।
কেউ শোনে কিনা—জানা নেই।
এই পৃথিবীতে কিছু কান্না আছে—
যার কোনো সাক্ষী থাকে না।
কিছু আর্তনাদ আছে—
যা ইতিহাসের পাতায়ও লেখা হয় না।
চলবে........