ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ১২:৫৩:৪৩ AM

”অজ পাড়াগাঁ"

মান্নান মারুফ
15-04-2026 08:52:53 PM
”অজ পাড়াগাঁ"

শেষ পর্ব

দু:খ যদি বিক্রি হইতো আমি হইতাম ধনী…
আমার কাছে আছে শুধু দু:খেরই খনি…
ভাই, দু:খেরই খনি…

রাশেদ এখন আর এই কথাগুলো পুরোটা বলতে পারে না। মাঝপথেই গলা আটকে যায়। মনে হয়—শব্দগুলোও যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, যেমন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে তার জীবন।

তার দিন-রাত এখন এক হয়ে গেছে। ঘুম আসে না, আর এলেও সে ঘুমাতে চায় না। কারণ ঘুম মানেই স্বপ্ন, আর স্বপ্ন মানেই রিমি—যে আসে, হাসে, ডাকে… তারপর হঠাৎ হারিয়ে যায়। সেই হারিয়ে যাওয়ার মুহূর্তটাই সবচেয়ে অসহনীয়।

একদিন সকালে রাশেদ শহরের এক নির্জন কোণে বসে ছিল। চোখে অনিদ্রার ছাপ, মুখে দাড়ি, পোশাক এলোমেলো। তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই—এই মানুষটার ভেতরে কতগুলো ভাঙা গল্প জমে আছে।

হঠাৎ একটা লোক তার সামনে এসে দাঁড়াল।

“তুমি কি রাশেদ?”

রাশেদ মাথা তুলে তাকাল।

“হ্যাঁ… কেন?”

লোকটা একটু ইতস্তত করে বলল, “একটা খবর আছে… তোমার বোনের ব্যাপারে…”

রাশেদের বুক ধক করে উঠল।

“কোথায়? কোথায় সে?”

লোকটা বলল, “একটা মেয়েকে পাওয়া গেছে… অবস্থাটা ভালো না… তুমি গেলে হয়তো চিনতে পারবে…”

রাশেদের পা কাঁপছিল। তবুও সে দৌড়ে চলল লোকটার সঙ্গে।

তার মনে হচ্ছিল—এটা কি সত্যি? নাকি আবার কোনো মিথ্যা আশা?

তারা পৌঁছাল একটা সরকারি হাসপাতালে।

গন্ধটা ভারী, চারপাশে কান্না আর নিঃশব্দ যন্ত্রণা।

লোকটা তাকে একটা ওয়ার্ডের সামনে নিয়ে দাঁড় করাল।

“ভেতরে যাও…”

রাশেদের হাত কাঁপছিল।

সে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।

একটা বেডে শুয়ে আছে একটা মেয়ে। শরীর শুকিয়ে গেছে, মুখে আঘাতের চিহ্ন, চোখ বন্ধ।

রাশেদ ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

তার বুক ধুকপুক করছে।

সে ফিসফিস করে বলল, “রিমি…?”

মেয়েটার চোখের পাতা কেঁপে উঠল।

ধীরে ধীরে সে চোখ খুলল।

দৃষ্টি ঝাপসা, কিন্তু সেই চোখ… সেই মুখ....

রাশেদ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।

“রিমি! আমি… আমি তোর ভাই…”

মেয়েটার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

ঠোঁট কাঁপছিল।

“ভা…ই…য়া…”

এই একটা শব্দই যথেষ্ট ছিল।

রাশেদের পৃথিবী আবার এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।

কিন্তু এই ফিরে পাওয়া সুখ ছিল না, ছিল এক নতুন যন্ত্রণা।

ডাক্তার জানালেন—রিমি দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার । তাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, বিভিন্ন জায়গায় রাখা হয়। তার শরীর ও মন—দুটোই ভেঙে গেছে।

“ও এখন খুব দুর্বল,” ডাক্তার বললেন, “শুধু শারীরিক না, মানসিকভাবেও।”

রাশেদ চুপ করে শুনছিল।

তার মাথার ভেতর যেন ঝড় বইছিল।

সে ভাবছিল—কোথায় ছিল সে এতদিন? কেন সে বোনটাকে বাঁচাতে পারল না?

রিমি এখন আর আগের মতো নেই।

সে খুব কম কথা বলে। কখনো চুপচাপ তাকিয়ে থাকে, কখনো হঠাৎ ভয় পেয়ে চিৎকার করে ওঠে।

রাশেদ তার পাশে বসে থাকে।

“আমি আছি, ভয় পাস না…”

কিন্তু সে জানে—তার এই কথাগুলো খুবই দুর্বল।

কারণ কিছু ভয় আছে, যা কোনো আশ্বাসে মুছে যায় না।

একদিন রাতে রিমি হঠাৎ বলে উঠল—

“ভাইয়া…”

“হ্যাঁ?”

“আমি খারাপ হয়ে গেছি, তাই না?”

এই প্রশ্নটা শুনে রাশেদের বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

সে কাঁপা গলায় বলল, “না রে… তুই কখনো খারাপ হতে পারিস না…”

“ওরা বলত…”

“ওরা মিথ্যা বলেছে!” রাশেদ হঠাৎ চিৎকার করে উঠল।

তার চোখ লাল হয়ে গেছে।

“তুই আমার বোন… তুই আমার সবকিছু…”

রিমি চুপ করে গেল।

তার চোখে আবার জল জমল।

রাশেদ এখন বুঝতে পারে—কিছু ক্ষত আছে, যা সারানো যায় না।

শুধু সময়ের সাথে একটু সহনীয় হয়।

কিন্তু ভুলে যাওয়া যায় না।

দিন কেটে যায়।

রিমি ধীরে ধীরে একটু সুস্থ হয়, কিন্তু পুরোপুরি না।

তার ভেতরের ভাঙনটা থেকে যায়।

আর রাশেদ…

সে নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না।

প্রতিদিন তার মনে হয়—সে ব্যর্থ।

একজন ভাই হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে।

একদিন সেই বৃদ্ধ লোকটির সাথে আবার দেখা হয়।

বৃদ্ধ বললেন, “তোমার বোনকে পেয়েছো শুনলাম…”

রাশেদ মাথা নিচু করে বলল, “পেয়েছি… কিন্তু যেভাবে পেয়েছি… সেটা পাওয়ার মতো না…”

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“জীবন সবসময় ন্যায়বিচার করে না।”

রাশেদ বলল, “তাহলে এই কষ্টের মানে কি?”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন—

“কিছু কষ্টের কোনো মানে হয় না। কিন্তু সেই কষ্ট নিয়ে তুমি কি করো, সেটাই তোমার মানে তৈরি করে।”

রাশেদ চুপ করে রইল।

এই কথাগুলো তার ভেতরে গভীরভাবে আঘাত করল।

সেদিন রাতে রাশেদ আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রার্থানা করলো।

“দু:খ যদি বিক্রি হইতো… আমি হইতাম ধনী…”

তার কণ্ঠ ভাঙা।

“আমার কাছে আছে শুধু দু:খেরই খনি…”

সে থামল।

তারপর ধীরে বলল—

“কিন্তু এই খনি নিয়ে আমি কি করব?”

তার চোখে জল।

কিন্তু সেই জলের ভেতরে এবার একটা ভিন্ন অনুভূতি ছিল।

পরদিন থেকে সে একটা সিদ্ধান্ত নেয়।

সে শুধু নিজের কষ্ট নিয়ে বাঁচবে না।

সে খুঁজে বের করবে—যারা এই একই কষ্টের মধ্যে আছে।

সে হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্র—এদিক-ওদিক ঘুরতে শুরু করে।

যেসব শিশু হারিয়ে গেছে, যেসব মানুষ নির্যাতিত—তাদের পাশে দাঁড়াতে শুরু করে।

সে জানে—সে সবকিছু ঠিক করতে পারবে না।

কিন্তু সে এটাও জানে—কেউ যদি পাশে দাঁড়ায়, তাহলে কষ্টটা একটু হলেও সহনীয় হয়।

রিমিও ধীরে ধীরে তার সাথে যেতে শুরু করে।

প্রথমে ভয় পেত, কিন্তু পরে অন্যদের দেখে বুঝতে পারে—সে একা না।

একদিন একটা ছোট মেয়ে তার হাত ধরে বলল, “আপু, তুমি কি আমার সাথে বসবে?”

রিমি একটু থেমে বলল, “হ্যাঁ…”

সেই মুহূর্তে রাশেদ বুঝল—হয়তো এটাই তাদের নতুন পথ।

তাদের কষ্ট শেষ হয়নি।

হয়তো কোনোদিন শেষও হবে না।

কিছু স্মৃতি আছে, যা সারাজীবন তাড়া করে বেড়াবে।

কিছু রাত আছে, যা কখনো শান্ত হবে না।

কিছু কান্না আছে, যা কখনো থামবে না।

কিন্তু তবুও তারা বেঁচে আছে।

কষ্ট নিয়ে,দু:খ নিয়ে, ভাঙা মন নিয়ে, তবুও বেঁচে আছে।

কারণ তারা বুঝেছে—বেঁচে থাকা মানে শুধু সুখ খোঁজা না, বরং কষ্ট নিয়ে এগিয়ে যাওয়া।

রাশেদ এখনো মাঝে মাঝে বলে—

“দু:খ যদি বিক্রি হইতো আমি হইতাম ধনী…”

কিন্তু এখন সে আর থেমে থাকে না।

সে যোগ করে—

“কিন্তু এই দু:খই আমাকে শিখিয়েছে—অন্যের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় শক্তি।”

তার চোখে জল থাকে না। হৃদয়ের কান্না আছে।

কিন্তু সেই কান্নার ভেতরেও এখন একটুখানি আলোও দেখছে রাশেদ।

এটাই তাদের গল্প।

একটা এমন দু:খের গল্প—যে দু:খ ভোলা যায় না।

যে দু:খ মানুষকে ভেঙে দেয়, আবার সেই ভাঙনের মধ্যেই নতুনভাবে গড়ে তোলে।

একটা অসহায় জীবনের গল্প—যেখানে হারানোই বেশি, পাওয়া যায় খুবই কম।

কিন্তু সেই সামান্য পাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বেঁচে থাকার কারণ।

সমাপ্ত।।