ঢাকা, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ১০:০০:২৪ PM

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত

ষ্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
13-04-2026 07:59:36 PM
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত

বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক ছিল উষ্ণ ও সহযোগিতামূলক। শুধু সরকার-টু-সরকার নয়, ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং বিরোধী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস-এর সঙ্গেও আওয়ামী লীগের দহরম মহরম সর্ম্পক ছিল।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্ক দৃশ্যত শীতল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে মুহম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের সময়ে বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্ক ইতিহাসের অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে নেমে যায় বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ছিল।

এই প্রেক্ষাপটে গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করলে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়। নির্বাচন-পরবর্তী সময়েই দৃশ্যপট দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তাকে অভিনন্দন জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একই সঙ্গে তার শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা

এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। ভারতের পক্ষ থেকে পাঠানো সেই আমন্ত্রণপত্র তার হাতে তুলে দেন ওম বিড়লা। এতে দুই দেশের সম্পর্ক নতুনভাবে পুনরুজ্জীবনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়।

সম্প্রতি ৭ এপ্রিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর বিদেশবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির দিল্লি সফর করেন। সফরকালে তারা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী-এর সঙ্গে বৈঠক করেন।

সরকারি বৈঠকের পাশাপাশি দলীয় পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ হয়। হুমায়ুন কবির বিজেপির পররাষ্ট্রবিষয়ক বিভাগের শীর্ষ নেতা বিজয় চৌথালিয়াশিশির বাজোরিয়া-এর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে বিজেপির সভাপতি নীতিন নবীন-কে লেখা একটি চিঠি হস্তান্তর করা হয়। এর আগে নীতিন নবীনও তারেক রহমানকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন।

দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনে অনুষ্ঠিত আলোচনায় সরকার-টু-সরকার সম্পর্কের পাশাপাশি বিএনপি ও বিজেপির মধ্যে পার্টি-টু-পার্টি সম্পর্ক জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুই পক্ষই দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট কাটিয়ে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী।

বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা সবসময় বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক রায়কে সম্মান করে। তাই বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে তারা আগ্রহী। শিশির বাজোরিয়া এক প্রতিক্রিয়ায় জানান, উভয় দলই সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে এবং জনগণ-ভিত্তিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে হুমায়ুন কবির ভারতীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ভারতের মন্ত্রী ও বিজেপি নেতাদের সঙ্গে আলোচনা অত্যন্ত গঠনমূলক হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে আওয়ামী লীগের আপত্তির কারণে বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক গতিতে এগোতে পারেনি। তবে এখন সেই বাধা কাটিয়ে দলীয় পর্যায়ে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং বিভিন্ন স্তরে সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থা ও বোঝাপড়া শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খান এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও দলের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, বিএনপি সবসময় বাংলাদেশ-ভারত জনগণের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে। তিনি দাবি করেন, বিজেপির সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক অতীতেও ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

 তিনি বলেন, দিল্লির এই বৈঠকে উভয় পক্ষ থেকেই ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের যোগাযোগ সীমিত ছিল, যা এখন পরিবর্তনের পথে।

নেতৃবৃন্দ বলেন দুই দেশের শাসক দলের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়লে তার সুফল সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রতিফলিত হবে। একই সঙ্গে তিনি পরামর্শ দেন, বিএনপি ও বিজেপি উভয় দলেরই উচিত নিজ নিজ দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রাখা, যাতে ভুল বোঝাবুঝি ও সংকট এড়ানো যায়।

সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আবারও পুনর্গঠনের পথে এগোচ্ছে। সরকার-টু-সরকার সম্পর্কের পাশাপাশি দলীয় পর্যায়ে যোগাযোগ বৃদ্ধির এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে দুই দেশের কূটনৈতিক ও জনগণ-ভিত্তিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।