ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৮:১৫:৪৩ PM

উপন্যাস:“শেষ দেখা”

মান্নান মারুফ
16-04-2026 01:32:20 PM
উপন্যাস:“শেষ দেখা”

পর্ব – ১

কারাগারের সেই করিডোরটা অদ্ভুত নীরব।
নীরবতা—কিন্তু তাতে শব্দ আছে। ভারী দরজার ঠকঠক শব্দ, দূরে কোথাও শিকল ঘষার আওয়াজ, আর মানুষের চাপা কান্না।

৩০শে মার্চ, ২০২৬।

আজ শেষ দেখা।

সামির দাঁড়িয়ে আছে লোহার গেটের সামনে। তার বয়স মাত্র ১৯। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু ভেতরে এক অদ্ভুত স্থিরতা। যেন সে অনেক আগেই বুঝে গেছে—এই পৃথিবীতে ন্যায়বিচার সবসময় সমানভাবে বণ্টিত হয় না।

তার হাত দুটো শিকলের মধ্যে বাঁধা। কিন্তু তার দৃষ্টি আটকে আছে সামনের দরজায়।

ওই দরজা দিয়েই আসবে তার মা।

একজন সৈনিক গম্ভীর গলায় বলল,
“পাঁচ মিনিট। শুধু পাঁচ মিনিট।”

পাঁচ মিনিট।

একটা জীবন বিদায় দেওয়ার জন্য পাঁচ মিনিট কি যথেষ্ট?

দরজাটা খুললো।

সাদা ওড়না মাথায়, চোখ ভেজা—সামিরের মা, নাজওয়া, ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকলেন। তার হাঁটার ভঙ্গিতে ক্লান্তি, কিন্তু চোখে একটাই খোঁজ—তার ছেলেকে দেখা।

“সামির...”

শব্দটা খুব আস্তে বের হলো। কিন্তু যেন পুরো ঘরটা কেঁপে উঠল।

সামির হাসার চেষ্টা করলো।
“আম্মা...”

দুজনের মাঝখানে কাঁচের দেয়াল। স্পর্শ করার অনুমতি নেই।

নাজওয়া কাঁচের ওপাশে হাত রাখলেন।
সামিরও রাখল নিজের হাত।

দুই হাত একসাথে—কিন্তু স্পর্শহীন।

“তুই খাইছিস?”—মায়ের প্রথম প্রশ্ন।

এই প্রশ্নটাই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক, সবচেয়ে অসহায় প্রশ্ন।

সামির একটু হেসে বলল,
“হ, আম্মা। তুমি কেমন আছো?”

মা উত্তর দিলেন না। শুধু তাকিয়ে রইলেন।

তার চোখে হাজারটা প্রশ্ন—
তোর দোষ কী ছিল?
তুই কেন এখানে?
আমি তোকে বাঁচাতে পারলাম না কেন?

“তারা বলছে… তুই নাকি পাথর ছুঁড়ছিলি?”

সামির একটু চুপ করে থাকল। তারপর আস্তে বলল,
“আম্মা… আমি শুধু দাঁড়ায়া ছিলাম।”

এই একটা বাক্যের ভেতর কতটা সত্য, কতটা অসহায়তা—তা বোঝার জন্য আর কিছু লাগে না।

নাজওয়ার ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
“তোরে তারা সন্ত্রাসী বলছে…”

সামির এবার চোখ নামিয়ে ফেলল।
“আম্মা, তারা যা খুশি বলুক… তুমি কি বিশ্বাস করো?”

মা সাথে সাথে মাথা নেড়ে বললেন,
“না! না! আমার পোলা এমন না!”

কিন্তু এই ‘না’ শব্দটা যেন দেয়ালে গিয়ে থেমে গেল। বাইরে কোনো পরিবর্তন হলো না।

ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করছে।

সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে।

“তুই ভয় পাস?”—মা জিজ্ঞেস করলেন।

সামির একটু ভেবে বলল,
“আগে পেতাম… এখন আর না।”

“কেন?”

“কারণ আমি জানি… আমি একা না।”

মা অবাক হয়ে তাকালেন।

“আমার মতো হাজার হাজার আছে, আম্মা… সবাই একই গল্প।”

তার কণ্ঠে অভিযোগ নেই। আছে শুধু একধরনের ক্লান্ত সত্য।

হঠাৎ পাশ থেকে এক সৈনিক চিৎকার করল—
“দুই মিনিট!”

দুই মিনিট।

এখন আর কথা খুঁজে পাওয়া যায় না।

নাজওয়া দ্রুত বললেন,
“তোর ছোট বোন তোর জন্য কাঁদে রোজ…”

সামিরের চোখ ভিজে উঠল।
“ওরে বলবা… আমি ঠিক আছি।”

“মিথ্যা কইস না!”—মা হঠাৎ বললেন।

এই প্রথম তিনি একটু জোরে কথা বললেন।

“তুই ঠিক নাই… আমি জানি…”

একটা দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর সামির খুব আস্তে বলল,
“আম্মা… যদি আর দেখা না হয়…”

“চুপ!”—মা থামিয়ে দিলেন।
“এই কথা বলবি না।”

কিন্তু এই কথাটাই তো আজকের সত্য।

দুজনেই জানে।

কেউ বলতে চায় না।

সৈনিক আবার বলল—
“টাইম ওভার!”

নাজওয়া কাঁচে হাত চাপড়ালেন।
“আরেকটু… প্লিজ!”

কেউ শুনল না।

দরজাটা আবার খুলে গেল।

সামিরকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

সে শেষবারের মতো ফিরে তাকালো।

“আম্মা!”

মা কেঁদে উঠলেন—
“সামির!”

এই দুইটা শব্দ—
দুইটা নাম—
এই করিডোরে প্রতিধ্বনি হয়ে রয়ে গেল।

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

নাজওয়া একা দাঁড়িয়ে রইলেন।

তার হাত এখনও কাঁচের ওপরে রাখা।

কিন্তু ওপাশে আর কেউ নেই।

অন্যদিকে…

কারাগারের আরেকটা সেলে বসে আছে ইয়াসিন। বয়স ১৬।

তার হাতে একটা ছোট কাগজ। তাতে সে লিখছে—

“আজ আমার মায়ের সাথে শেষ দেখা হলো…”

সে থেমে গেল।

কলমটা কাঁপছে।

সে লিখতে পারছে না।

কারণ কিছু অনুভূতি ভাষায় ধরা যায় না।

তার পাশের সেলে কেউ ফিসফিস করে বলল,
“তুই লিখতেছিস?”

ইয়াসিন মাথা নেড়ে বলল,
“হ… যদি কেউ পড়ে কোনোদিন…”

“কে পড়বে?”—অন্যজন হাসল তিক্তভাবে।

ইয়াসিন একটু চুপ করে থেকে বলল,
“কেউ না… তাও লিখতেছি।”

কারণ লেখা মানে বেঁচে থাকা।

লেখা মানে—
“আমি ছিলাম”—এই কথাটা রেখে যাওয়া।

শেষ দৃশ্য

কারাগারের বাইরে সূর্য ডুবছে।

আকাশ লাল।

রক্তের মতো লাল।

একদল মা, বোন, বাবা—গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে।

তারা জানে না ভেতরে কী হচ্ছে।

তারা শুধু অপেক্ষা করে।

কখনো একটা নাম ডাকবে—
“তোমার ছেলে…”

কিন্তু বেশিরভাগ সময়—
কেউ ডাকে না।

এই পৃথিবীতে কিছু গল্প আছে—
যেগুলো কেউ শুনতে চায় না।

কারণ সেগুলো খুব ভারী।

কিন্তু সেই গল্পগুলোই সবচেয়ে সত্য।

চলবে....