ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৮:১৭:৪৯ PM

উপন্যাস:“শেষ দেখা”

মান্নান মারুফ
16-04-2026 02:22:34 PM
উপন্যাস:“শেষ দেখা”

পর্ব – ৫

সময় এখানে আলাদা ভাবে চলে।

ঘড়ি আছে—কিন্তু তার কোনো মানে নেই।

দিন আসে, রাত যায়—কিন্তু পার্থক্য বোঝা যায় না।

কারাগারের ভেতরে সময় শুধু একটা দীর্ঘ, টানা অন্ধকার।

প্রথম বছর,

সামির দেয়ালের পাশে বসে আছে।

সে দেয়ালে ছোট ছোট দাগ কেটে রেখেছে।

প্রতিদিন একটা করে।

আজ ৩৬৫টা দাগ পূর্ণ হলো।

এক বছর।

সে আঙুল দিয়ে দাগগুলো ছুঁয়ে দেখে।

প্রতিটা দাগ—একটা দিন, একটা অপেক্ষা, একটা না-পাওয়া।

ইয়াসিন পাশে বসে বলল—
“এক বছর পার করলি…”

সামির হালকা হাসল।
“মনে হয় এক জীবনের মতো…”

ইয়াসিন বলল—
“এখনো এগারো বছর…”

এই কথাটা বলেই সে চুপ হয়ে গেল।

কারণ এই সংখ্যাটা—
শব্দে বলা যায়, কিন্তু সহ্য করা যায় না।

কারাগার,

এখানে প্রতিটা মানুষ একটা গল্প।

কেউ ৫ বছর, কেউ ১০, কেউ আজীবন।

একজন বৃদ্ধ আছেন—সবাই তাকে “চাচা” বলে ডাকে।

তিনি ২০ বছর ধরে এখানে।

তিনি প্রায়ই বলেন—
“বাইরের পৃথিবীটা কেমন, ভুলে গেছি…”

সামির একদিন জিজ্ঞেস করল—
“আপনি কি আশা করেন—বের হবেন?”

চাচা হেসে বললেন—
“আশা না থাকলে মানুষ বাঁচে কেমনে?”

হঠাৎ,

একদিন সকালে সেলের দরজা হঠাৎ জোরে খুলে গেল।

একজন বন্দীকে ডাকা হলো।

তার নাম রাশেদ।

সে উঠে দাঁড়াল।

তার চোখে ভয়।

সে জানে না—কোথায় নিয়ে যাবে।

যাওয়ার আগে সে বলল—
“আমার মায়েরে যদি কেউ দেখিস… বলিস আমি ভালো আছি…”

কেউ কিছু বলতে পারল না।

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

সেই দিন রাশেদ আর ফিরে আসেনি।

নীরব মৃত্যু,

পরের দিন ফিসফিস করে খবর এল—

“রাশেদ নাই…”

কেউ জোরে কিছু বলে না।

কারণ ভয় আছে।

কিন্তু এই খবরটা আগুনের মতো ছড়িয়ে যায়।

সামির দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকে।

তার মাথায় একটা চিন্তা—

“আমার নামও কি কোনোদিন এমনভাবে বলা হবে?”

মায়ের অপেক্ষা—দ্বিতীয় বছর,

নাজওয়ার চুলে এখন পাক ধরেছে।

তার চোখের নিচে কালি।

তিনি এখনও প্রতিদিন অপেক্ষা করেন।

প্রতিদিন দরজার দিকে তাকান।

যেন হঠাৎ কেউ এসে বলবে—
“আপনার ছেলে এসেছে…”

কিন্তু কেউ আসে না।

চিঠি,

একদিন ডাক এল।

একটা চিঠি।

সামিরের লেখা।

নাজওয়ার হাত কাঁপতে লাগল।

তিনি চিঠিটা খুললেন।

“আম্মা,
আমি ভালো আছি…
তুমি কাঁদো না…”

এই কয়েকটা লাইন।

কিন্তু এই কয়েকটা লাইনের জন্যই তিনি বেঁচে আছেন।

তিনি চিঠিটা বুকে চেপে ধরলেন।

“আমার পোলা বাঁচে আছে…”

তার চোখে পানি—কিন্তু এই পানি অন্যরকম।

কারাগারের ভেতরে পরিবর্তন,

সামির এখন আগের মতো না।

সে কম কথা বলে।

তার চোখে একটা গভীরতা এসেছে।

সে এখন নতুন বন্দীদের সান্ত্বনা দেয়।

“ভয় পাস না… সময় চলে যাবে…”

কিন্তু সে নিজে জানে—
সময় চলে যায় না, শুধু জমে থাকে।

ইয়াসিনের গল্প,

ইয়াসিন এখনও লিখছে।

তার কাগজগুলো এখন অনেক।

সে বলল—
“যদি আমরা না থাকি… এই লেখাগুলো থাকবে…”

সামির বলল—
“কেউ পড়বে?”

ইয়াসিন একটু হেসে বলল—
“হয়তো… হয়তো না… তাও লিখি…”

বাইরের এক ট্র্যাজেডি,একদিন খবর এল—

একটা সংঘর্ষে কয়েকজন মারা গেছে।

সামির চুপ হয়ে গেল।

তার মনে একটা ভয় ঢুকে গেল।

“আম্মা…?”

সে দেয়ালে মাথা ঠেকাল।

তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে।

সেদিন সন্ধ্যায়—

নাজওয়ার বাড়ির পাশেই একটা বিস্ফোরণের শব্দ।

মানুষ দৌড়াচ্ছে।

চিৎকার।

তিনি বাইরে বের হলেন।

চারদিকে ধোঁয়া।

কেউ বলছে—
“একটা বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে…”

তিনি হঠাৎ দৌড়াতে শুরু করলেন।

কারণ তার মনে একটা ভয়—

“আমার মেয়েটা…”

তিনি সেখানে পৌঁছালেন।

মানুষ ভিড় করে আছে।

কেউ তাকে থামাতে চাইল।

কিন্তু তিনি ছুটে গেলেন।

তার চোখে যা পড়ল—

সে চিৎকার করে উঠলেন।

“না!!!”

তার ছোট মেয়েটা…

নড়ছে না।

নাজওয়া মেয়েকে কোলে তুলে নিলেন।

“উঠ… মা… উঠ…”

কোনো সাড়া নেই।

তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে—

“আমি তোকে ভাইয়ার কাছে নিতে চেয়েছিলাম…”

তিনি কাঁদছেন, চিৎকার করছেন—

“একটা নিলি, আরেকটা ক্যান নিছো?!”

এই প্রশ্ন—
আকাশ ভেদ করে যায়।

কিন্তু উত্তর আসে না।

সামির জানে না—বাইরে কী হয়েছে।

সে শুধু অস্থির।

তার বুক কাঁপছে।

“আমার কিছু হইছে…”

সে বুঝতে পারছে—
কিছু একটা ভেঙে গেছে।

রাতে সেলে সবাই চুপ।

সামির দেয়ালের দিকে তাকিয়ে।

তার চোখে পানি।

সে ফিসফিস করে বলল—

“আম্মা… তুমি ঠিক আছো তো?”

বাইরে,

নাজওয়া একা বসে আছে।

তার কোলে আর কেউ নেই।

তার ঘর ফাঁকা।

তার জীবন ফাঁকা।

তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেন—

“আমার কাছে আর কিছু রাখলা না…”

এই পৃথিবীতে কিছু কারাগার আছে—
যেখানে শুধু বন্দীরা না,
তাদের পরিবারও বন্দী হয়ে যায়।

কিছু মৃত্যু আছে—
যা দূরে ঘটে,
কিন্তু কারও বুকের ভেতর সবকিছু ভেঙে দেয়।

আর কিছু মা আছে—
যারা এক জীবনে বারবার সন্তান হারায়। আর কাদেঁ

চলবে.......