ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৮:২৫:১২ PM

উপন্যাস:“শেষ দেখা”

মান্নান মারুফ
16-04-2026 02:09:13 PM
উপন্যাস:“শেষ দেখা”

পর্ব – ৪

সকালের আলোটা আজ অন্যরকম।

কারাগারের ভিতরে দাঁড়িয়ে থাকা বন্দীদের চোখে আজ অদ্ভুত এক শূন্যতা। কেউ ফিসফিস করছে, কেউ চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে।

আজ “রায়” হবে।

সামিরকে ভোরেই সেল থেকে বের করা হয়েছে।

তার হাত বাঁধা না—কিন্তু তার ভেতরটা যেন শিকলে বাঁধা।

সে জানে না কী হবে।

কিন্তু তার বুকের ভেতর একটা ভার—যেন আগেই সব বুঝে গেছে।

আদালতের ঘর,

ঘরটা বড় না।

দেয়ালে কোনো অনুভূতি নেই—শুধু নিয়ম, কাঠামো, আর ঠাণ্ডা আনুষ্ঠানিকতা।

সামিরকে একটা কাঠের বেঞ্চে বসানো হলো।

তার পাশে আরও কয়েকজন তরুণ।

তাদের চোখে একই ভয়।

একজন ফিসফিস করে বলল—
“তোর কয় বছর হতে পারে?”

সামির একটু চুপ করে বলল—
“জানি না…”

“আমার ভাইরে ১০ বছর দিছে…”—ছেলেটা বলল।

এই কথাটা যেন বাতাসকে আরও ভারী করে দিল।

নাজওয়ার আগমন,

দরজার বাইরে ভিড়।

নাজওয়া ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছেন।

“আমি তার মা! আমাকে ঢুকতে দেন!”

তার কণ্ঠ কাঁপছে।

অনেক অনুরোধের পর তাকে ঢুকতে দেওয়া হলো।

ভেতরে ঢুকেই তার চোখ ছেলেকে খুঁজতে লাগল।

“সামির!”

সামির মাথা তুলে তাকাল।

তার চোখে অবাক হয়ে যাওয়া আলো।

“আম্মা…”

এই শব্দটা এত আস্তে বের হলো—তবুও যেন পুরো ঘরটা শুনে ফেলল।

নাজওয়া এগিয়ে যেতে চাইলেন।

কিন্তু তাকে থামিয়ে দেওয়া হলো।

দুইজনের মাঝে আবার সেই দূরত্ব।

এইবার কাঁচ না—আইন।

বিচার শুরু,

একজন কর্মকর্তা ফাইল খুলে পড়া শুরু করল।

“অভিযুক্ত—সামির…”

তারপর একের পর এক অভিযোগ।

“সহিংসতায় অংশগ্রহণ…”
“রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ…”
“নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা…”

প্রতিটা শব্দ যেন হাতুড়ির মতো আঘাত করছে।

নাজওয়া মাথা নেড়ে বলছেন—
“না… না… আমার পোলা এমন না…”

তার কথা আজ কেউ শুনছে না।

স্বীকারোক্তি পাঠ,

হঠাৎ সেই কাগজটা বের করা হলো।

যেটাতে সামির সই করেছিল।

“অভিযুক্ত নিজেই স্বীকার করেছে…”

এই কথাটা শুনে নাজওয়া স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

“না! এটা মিথ্যা!”

তিনি চিৎকার করে উঠলেন।

“ওরে জোর কইরা লিখাইছে!”

ঘরে একটু হইচই হলো।

কিন্তু বিচার থামল না।

কারণ এই চিৎকার—এই বিচার প্রক্রিয়ার অংশ না।

সামিরের ভেতরকার যুদ্ধ , সামির মাথা নিচু করে বসে আছে।

সে জানে—এই কাগজটা তার বিরুদ্ধে।

সে জানে—সে লিখেছে।

কিন্তু সে এটাও জানে—
এই লেখা তার সত্য না।

তার মাথার ভেতর শব্দ— মা যেন বলছে ,

“তুই কেন সই করলি?”

“আমি পারি নাই…”

“আম্মা এখন কি ভাবতেছে?”

তার চোখ ভিজে উঠল।

রায় ঘোষণার মুহূর্ত,

ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ।

সবাই চুপ।

কেউ কেউ শ্বাসও নিচ্ছে আস্তে আস্তে।

“রায়…”

এই একটা শব্দই যথেষ্ট।

“অভিযুক্ত সামিরকে… ১২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলো।”

এই একটা বাক্য—
একটা জীবনের সব শব্দ থামিয়ে দিল।

নাজওয়া প্রথমে বুঝতে পারলেন না।

“কত বছর?”

কেউ উত্তর দিল না।

তিনি আবার বললেন—
“কত বছর?!”

একজন আস্তে বলল—
“বারো…”

“বারো…”

শব্দটা তার মুখে আটকে গেল।

তার চোখ ফাঁকা হয়ে গেল।

তারপর হঠাৎ—

তিনি চিৎকার করে উঠলেন।

“না!!!”

এই চিৎকার—
ঘরের দেয়াল কাঁপিয়ে দিল।

“আমার পোলারে আমি ১২ বছর পর পাইমু?!”

তিনি মাটিতে বসে পড়লেন।

তার হাত মাটিতে আঘাত করছে।

“ওরে তো আমি এখনো বড় হইতে দেখি নাই…”

তার কান্না আর চিৎকার একসাথে মিশে যাচ্ছে।

কেউ এগিয়ে এসে তাকে ধরল।

কিন্তু হৃদয়ের এই ভাঙন—ধরা যায় না।

সামিরের প্রতিক্রিয়া,

সামির চুপ।

সে কাঁদছে না।

সে শুধু তাকিয়ে আছে তার মায়ের দিকে।

তার চোখে একটা অদ্ভুত স্থিরতা।

যেন সে হঠাৎ বড় হয়ে গেছে।

সে আস্তে বলল—
“আম্মা… কাঁদো না…”

কিন্তু তার নিজের কণ্ঠ কাঁপছে।

“আমি ঠিক থাকমু…”

এই ‘ঠিক’ শব্দটা—
একটা মিথ্যা, কিন্তু দরকারি মিথ্যা।

বিদায়ের আগের মুহূর্ত

সৈনিকরা তাকে নিতে আসল।

নাজওয়া উঠে দাঁড়ালেন।

“একটু… আমি ওরে ধরমু…”

কেউ অনুমতি দিল না।

তিনি দূর থেকেই হাত বাড়ালেন।

“সামির… তুই আমারে ভুলিস না…”

সামির মাথা নেড়ে বলল—
“কখনো না…”

“আমি তোর জন্য অপেক্ষা করমু…”

“আমিও…” মা,

এই কথাগুলো—
দুইটা মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা।

সামিরকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

তার পেছনে দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

নাজওয়া দাঁড়িয়ে—

তার চোখে পানি নেই আর।

শুধু শূন্যতা।

তিনি আস্তে করে বললেন—
“বারো বছর…”

এই শব্দটা যেন তার ঠোঁটে শুকিয়ে গেল।

মানুষজন তাদের জীবনে ব্যস্ত।

রাস্তা চলছে, গাড়ি চলছে, দোকান খোলা।

কেউ জানে না—
একটা মা আজ তার ছেলেকে ১২ বছরের জন্য হারালো।

এই পৃথিবীতে কিছু রায় আছে—
যেগুলো শুধু কাগজে লেখা হয় না,
মানুষের জীবনে খোদাই হয়ে যায়।

কিছু শাস্তি আছে—
যা একজন মানুষ না, পুরো পরিবার ভোগ করে।

আর কিছু অপেক্ষা আছে—
যা কখনো শেষ হয় না।

চলবে......