ঢাকা, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬,
সময়: ০২:৩০:৪৪ PM

উপন্যাস: এক থাপ্পর

মান্নান মারুফ
04-03-2026 01:02:00 PM
উপন্যাস: এক থাপ্পর

পর্ব–১

রাতে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া হয় মিতুর।
ঝগড়ার শুরুটা খুব সামান্য—একটা অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন, একটা অন্যমনস্ক উত্তর, তারপর একটু উঁচু স্বর। সংসারের তিন বছরে এমন ছোটখাটো মনোমালিন্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেদিনের ঝগড়ার ভেতর যেন অন্য রকম একটা তীব্রতা ছিল। কথা যেন শুধু কথা ছিল না, ছিল জমে থাকা ক্লান্তি, অপ্রাপ্তি আর অজানা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

রাত বাড়তে থাকল।
ডাইনিং টেবিলে ভাত ঠান্ডা হয়ে গেল, তরকারির ওপর জমে উঠল পাতলা চর্বির আস্তরণ। মিতু আর খায়নি। তাজুলও না। দু’জনেই আলাদা আলাদা ঘুমের ভান করল। অথচ ঘুম তাদের কারও চোখেই এলো না।

মিতু পাশ ফিরে শুয়ে ছিল। অন্ধকারে সে তাজুলের নিঃশ্বাসের ওঠানামা শুনছিল। এই মানুষটার পাশেই তো সে তিন বছর কাটিয়েছে। প্রথম প্রথম তাজুল রাতে ঘুমানোর আগে গল্প করত—অফিসের কথা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন, তাদের অনাগত সন্তানের নাম পর্যন্ত ঠিক করেছিল। মিতু লজ্জা পেত, আবার হাসতও। সেই দিনগুলো কি খুব দূরে সরে গেল?

সকালে আবারও ঝগড়া হলো।

সকালের আলো কখনো কখনো রাতের অন্ধকারকে আরও স্পষ্ট করে দেয়।
চায়ের কাপ হাতে তাজুল বলেছিল, “সবকিছু নিয়ে এত কথা বলতে হয়?”

মিতু শান্ত গলায় বলেছিল, “আমি তো শুধু জানতে চেয়েছিলাম।”

কথা থেকে কথা জন্ম নিল।
অভিযোগ এলো—“তুমি বদলে গেছ।”
প্রতিউত্তর এলো—“তুমিই তো আর আগের মতো নেই।”

হঠাৎ করেই তাজুলের চোখ লাল হয়ে উঠল। ক্লান্ত, বিরক্ত, অসহিষ্ণু।
আর তারপর—
একটা থাপ্পড়।

শব্দটা খুব জোরে হয়নি। কিন্তু সেই মুহূর্তে যেন সময় থেমে গেল।
মিতুর মাথা কেঁপে উঠল। গালে আগুনের মতো জ্বালা।
তার চেয়ে বেশি জ্বলছিল ভেতরটা।

তিন বছরের সংসার জীবন তাদের।
কখনও গায়ে হাত তোলেনি তাজুল।
মিতু এমন অপমান, এমন কষ্ট আর কখনো পায়নি।

তাজুল নিজেও যেন হতভম্ব হয়ে গেল। হাত নামিয়ে নিয়ে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শব্দ খুঁজে পেল না। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য অনুশোচনা ফুটে উঠেছিল—কিন্তু সে অনুশোচনা কি সেই আঘাত মুছে দিতে পারে?

মিতু কিছু বলল না।
চোখের জল আটকে রাখল।
চুপচাপ ওড়না ঠিক করে অফিসে বেরিয়ে গেল।

রাস্তায় বেরিয়ে হঠাৎ তার মনে হলো—আজকের সকালটা কি সত্যি? নাকি সে এখনও দুঃস্বপ্নের ভেতর আছে? বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সে বুঝল, দুঃস্বপ্ন হলে ভালো হতো। বাস্তব এত নিষ্ঠুর হয় কেন?

অফিসে পৌঁছে সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল। সহকর্মীরা কেউ বুঝতে পারল না তার ভেতরের ঝড়। কাগজপত্রে চোখ রাখলেও মন ছিল না। বারবার গালে হাত দিয়ে দেখছিল—দাগ পড়েছে কি না। আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হলো, মুখটা একই আছে, শুধু চোখ দুটো অন্যরকম।

মা-বাবার পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করেছিল মিতু।
তাজুল ছিল শিক্ষিত, ভদ্র, দায়িত্ববান। বিয়ের পর সবাই বলেছিল, “তোমার কপাল ভালো, এমন স্বামী সবাই পায় না।”
মিতুও বিশ্বাস করেছিল, সে ভাগ্যবতী।

তাজুল তাকে কখনো কষ্ট দেয়নি—কমপক্ষে ইচ্ছা করে নয়। অসুস্থ হলে মাথায় পানি দিয়েছে, রাতে ওষুধ খাইয়ে দিয়েছে। প্রথম বেতন দিয়ে মিতুর জন্য শাড়ি কিনেছিল। তাদের ছোট্ট ভাড়া বাসাটাকে দু’জনে মিলে সাজিয়েছিল কত যত্ন করে।

তাহলে আজ?

সময় কখনো একরকম থাকে না।
সময় পরিবর্তন হয়।
সময় বদলালে মানুষের মনও কি বদলে যায়?

কয়েক মাস ধরে তাজুলের আচরণে সূক্ষ্ম পরিবর্তন টের পাচ্ছিল মিতু। অফিসের চাপ, ব্যবসায় লোকসান, আত্মীয়দের কটূক্তি—সব মিলিয়ে সে যেন ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠেছিল। আগের মতো হাসত না। কথায় মিষ্টতা কমে গিয়েছিল। তুচ্ছ বিষয়েও বিরক্ত হতো।

মিতু ভেবেছিল, সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু আজকের থাপ্পড় যেন সেই ধারণাকে ভেঙে দিল।

দুপুরে মা ফোন করলেন।
“কী রে, কেমন আছিস?”
মিতু এক মুহূর্ত থমকালো। বলতে ইচ্ছে করল—“মা, আজ তাজুল আমাকে মেরেছে।”
কিন্তু সে বলল, “ভালো আছি।”

মায়ের কণ্ঠে আশ্বাস ছিল—“সংসারে একটু-আধটু ঝগড়া হতেই পারে। মানিয়ে নিতে শিখতে হয়।”
মিতু চুপ করে রইল। সে জানে, মা জানেন না পুরোটা। আর জানলেও হয়তো বলতেন—“স্বামীর হাত একবার উঠলে সংসার ভাঙতে নেই।”

অফিস শেষে বাসায় ফিরতে তার ভয় লাগছিল। দরজা খুলে সে দেখল, তাজুল সোফায় বসে আছে। চোখে ক্লান্তি, মুখে অপরাধবোধের ছাপ।
কিন্তু দু’জনের কেউ কিছু বলল না।

রাত নামল আবার।
খাবার টেবিলে নীরবতা।
ঘরে বাতাস ভারী।

মিতু বিছানায় শুয়ে ভাবতে লাগল—একটা থাপ্পড় কি সবকিছু বদলে দিতে পারে? ভালোবাসা কি এতটাই ভঙ্গুর? নাকি এটা শুধু একটা দুর্ঘটনা?

তার মনে হচ্ছিল, আজ যদি সে প্রতিবাদ না করে, কাল হয়তো আরও সহজ হয়ে যাবে এই হাত তোলা।
আবার মনে হচ্ছিল, তাজুল তো এমন ছিল না। হয়তো সত্যিই চাপের কারণে হয়েছে।

এই দ্বন্দ্ব তাকে ছিঁড়ে ফেলছিল।

রাত গভীর হলো।
মিতুর চোখে ঘুম এলো না। সে ধীরে ধীরে উঠে বারান্দায় গেল। দূরে আকাশে চাঁদ ঝাপসা। বাতাসে হালকা শীত।

তার মনে হলো, জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাতগুলো শব্দ করে আসে না—চুপচাপ এসে হৃদয়ে দাগ কেটে যায়।

পেছন থেকে তাজুলের কণ্ঠ ভেসে এলো, নিচু আর ভাঙা—
“মিতু…”

সে ঘুরে তাকাল না।

তাজুল আবার বলল, “আমি ভুল করেছি।”

এই প্রথম সে স্বীকার করল।
কিন্তু ক্ষমা কি এত সহজ?

মিতুর বুকের ভেতর জমে থাকা কান্না হঠাৎ বেরিয়ে এলো না। বরং অদ্ভুত এক শূন্যতা ভর করল। সে বুঝল, কষ্টের চেয়েও ভয়ঙ্কর হলো এই শূন্যতা।

চার বছরের বিশ্বাস, ভালোবাসা, স্বপ্ন—সবকিছু আজ প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে।
তবু সে জানে, সিদ্ধান্ত এখনই নেওয়া যায় না। একটা থাপ্পড় হয়তো শেষ নয়, আবার হয়তো শুরু।

বারান্দার বাতাসে দাঁড়িয়ে মিতু মনে মনে বলল—
“আমি ভাঙবো না। কিন্তু আমাকে ভাঙতেও দেওয়া হবে না।”

তার ভেতরে কোথাও একটা শক্ত কণ্ঠ জেগে উঠেছে।
ভালোবাসা থাকবে—কিন্তু আত্মসম্মানের বিনিময়ে নয়।

রাত আরও গভীর হলো।
তাদের সম্পর্কও যেন নতুন এক অন্ধকারে প্রবেশ করল—যার শেষ কোথায়, কেউ জানে না।

চলবে…