ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬,
সময়: ০৯:০৯:৩১ PM

নীরব প্রশ্রয় শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থ রক্ষা হবে

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
19-05-2026 04:06:54 PM
নীরব প্রশ্রয় শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থ রক্ষা হবে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ে নতুন বাস্তবতার জন্ম হলেও পুরোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর দৌরাত্ম্য পুরোপুরি থেমে যায়নি—এমন অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে সচিবালয় বিটে কর্মরত একাধিক সাংবাদিকের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে কোণঠাসা হয়ে পড়া বিতর্কিত ও দলীয় প্রভাবশালী সাংবাদিক সিন্ডিকেট আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আর তাদের পুনর্বাসনের পেছনে নেপথ্য ভূমিকা রাখছেন সরকারের ভেতরের কিছু সুযোগসন্ধানী ও উদারতাবাদী মন্ত্রী এবং তাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সচিবালয় বিটের এক সাংবাদিক বলেন, “৫ আগস্টের আগে যেসব সাংবাদিক সচিবালয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করত, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে তারা অনেকটাই আড়ালে চলে যায়। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর ধীরে ধীরে সেই পুরোনো সিন্ডিকেট আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।”

অভিযোগ রয়েছে, এই গোষ্ঠীর অধিকাংশ সদস্য দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নিজেদের প্রভাব বলয় তৈরি করেছে। সচিবালয়ের আমলা, দপ্তর প্রধান, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক দৃঢ়। ফলে সরকার পরিবর্তনের পরও তারা দ্রুত নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে।

সচিবালয়কেন্দ্রিক সাংবাদিকদের একটি অংশ মনে করেন, পুরোনো এই নেটওয়ার্ক এখন শুধুই সংবাদ সংগ্রহে সীমাবদ্ধ নেই; বরং প্রশাসনের ভেতরে রাজনৈতিক পুনর্গঠনের গোপন কার্যক্রমেও তারা ভূমিকা রাখছে। অভিযোগ রয়েছে, নিষিদ্ধ ও কোণঠাসা রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে দেশ-বিদেশে যোগাযোগ রক্ষা, তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রশাসনের অভ্যন্তরে সমর্থক সংগঠিত করার কাজেও তারা সক্রিয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রের আশপাশে থাকা ব্যক্তিরা সহজে প্রভাব হারায় না। প্রশাসনের অলিগলি, ফাইলের গতিপথ, কর্মকর্তা বদলির রাজনীতি কিংবা গোপন নীতিনির্ধারণী তৎপরতা—সবকিছু সম্পর্কে তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকে। সেই অভিজ্ঞতাকেই এখন নতুন করে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরকারপন্থি মিডিয়ার কয়েকজন কর্মী দাবি করেন, কিছু মন্ত্রীর ‘উদারতা’ দেখানোর নামে আসলে পুরোনো সুবিধাভোগী গোষ্ঠীকেই পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। তাদের ভাষায়, “যারা গত ১৫ বছর মাঠে ছিলেন না, নির্যাতন-নিপীড়নের ঝুঁকি নেননি, তারাই এখন ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়ে উদারতার বুলি আওড়াচ্ছেন।”

অন্যদিকে যারা দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, মামলা-হামলা সহ্য করেছেন কিংবা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন—তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, প্রকৃত ত্যাগীদের বাদ দিয়ে প্রশাসনের ভেতরে আবারও সুবিধাবাদীদের প্রভাব বাড়ানো হচ্ছে।

সচিবালয়ের অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কিছু মন্ত্রীর আচরণেই এই দ্বৈত অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যেসব মন্ত্রী অতীতে রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তারা আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ বা সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর প্রতি তুলনামূলক কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন। কিন্তু যারা দীর্ঘদিন দলে নীরব ছিলেন বা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন, ঐসব মন্ত্রীদের অনেকেই এখন আপসকামী ও নমনীয় আচরণ করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই উদারতার পেছনে রয়েছে এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল এবং ব্যক্তিস্বার্থ। প্রশাসনের ভেতরে শক্তিশালী পুরোনো নেটওয়ার্ককে পুরোপুরি বিরোধিতায় ঠেলে না দিয়ে নিজেদের অবস্থান নিরাপদ রাখতেই অনেকে নরম নীতি অনুসরণ করছেন। কিন্তু এই নরম অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে সরকারের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

কারণ, প্রশাসনের ভেতরে যদি পুরোনো রাজনৈতিক আনুগত্য পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে ভবিষ্যতে তা ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেই বিভক্তি ও অবিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে এই আশঙ্কা প্রবল যে, সুবিধাবাদী গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করলেও প্রকৃত রাজনৈতিক কর্মীরাই আবারও ঝুঁকির মুখে পড়বেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইতিহাস বলে—যে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক পুনর্গঠন ব্যর্থ হলে পুরোনো শক্তি দ্রুত ফিরে আসার সুযোগ পায়। বাংলাদেশেও এখন সেই বাস্তবতার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। সচিবালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে এখনও এমন অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন, যাদের রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আর সাংবাদিকতা ও প্রশাসনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অস্বচ্ছ সম্পর্ক সেই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।

অভিযোগ উঠেছে, কিছু সাংবাদিক প্রশাসনের গোপন তথ্য সংগ্রহ করে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন প্রভাব, সুবিধা ও নিরাপত্তা। ফলে সচিবালয়ে এখন এক ধরনের অদৃশ্য ক্ষমতার বলয় তৈরি হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এ অবস্থায় সরকারের ভেতরে আদর্শিক বিভাজনও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে রয়েছেন কঠোর অবস্থানের নেতারা, যারা প্রশাসনে পুরোনো প্রভাবমুক্ত পরিবেশ চান। অন্যদিকে রয়েছেন আপসকামী ও সুবিধাবাদী অংশ, যারা স্থিতিশীলতার অজুহাতে পুরোনো গোষ্ঠীগুলোকেও জায়গা করে দিতে আগ্রহী।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই দ্বৈত অবস্থান অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সরকারের ভেতরেই আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। কারণ ত্যাগী রাজনৈতিক কর্মীরা যদি নিজেদের বঞ্চিত ও অনিরাপদ মনে করেন, তাহলে তা সংগঠনের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হবে।

সচিবালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতার পালাবদলের পর কে প্রকৃত পরিবর্তন চায় আর কে কেবল নিজের অবস্থান রক্ষায় ব্যস্ত—তা এখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। আর সেই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—সুযোগবাদী মন্ত্রীদের এই নীরব প্রশ্রয় শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থ রক্ষা করবে, আর কার জন্য তৈরি করবে নতুন সংকট?