ঢাকা, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ১১:০৬:০৫ PM

গল্প.”এক পথিক”

মান্নান মারুফ
19-04-2026 09:28:49 PM
গল্প.”এক পথিক”

আমি এক জনমের তৃষ্ণা নিয়ে তোমার স্মৃতির দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা এক পথিক। হাজারো ব্যস্ত ভিড়ের মাঝেও আমি, কেবল তোমাকেই খুঁজি। শুধু তোমাকে একবার স্পর্শ করবো—এই আনন্দে কেটে যাবে সহস্র জীবন, শুধু তোমাকে একবার স্পর্শ করবো।
এই আকাঙ্ক্ষার মধ্যে যে অদ্ভুত দীপ্তি, তা আমি প্রথম টের পাই এক বর্ষার বিকেলে। শহরের আকাশে তখন ধূসর মেঘের আধিপত্য, আর বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন নীরব কণ্ঠে গোপন কথা বলছিল। সেদিনই প্রথম তোমাকে দেখি—অথবা হয়তো বলা ভালো, প্রথমবার তোমার অস্তিত্ব আমার ভেতরে কোনো অদৃশ্য সুর তোলে।
তুমি ছিলে জনারণ্যের এক ক্ষণস্থায়ী দৃশ্য, অথচ সেই দৃশ্যই হয়ে উঠল আমার জীবনের স্থায়ী অনুরণন। ভেজা রাস্তায় ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে তুমি কারও জন্য অপেক্ষা করছিলে কি না, তা আমি জানি না; কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম তোমার জন্য—যেন বহুদিনের চেনা, বহু জন্মের আহ্বান।
সেদিন তোমার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। হয়নি কোনো পরিচয়। অথচ সেই না-ঘটা কথোপকথনই যেন আমার জীবনের দীর্ঘতম সংলাপ হয়ে রইল। তোমার চোখের দৃষ্টি, ঠোঁটের কোণে অচেনা হাসি, আর বৃষ্টিভেজা চুলের ভাঁজ—সবকিছু মিলিয়ে তুমি যেন এক অসমাপ্ত কবিতা, যার প্রতিটি পংক্তি আমি পড়তে চাই, বুঝতে চাই, অনুভব করতে চাই।
তারপর কেটে গেছে অনেক দিন। শহর বদলেছে, সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে। কিন্তু বদলায়নি আমার সেই তৃষ্ণা। আমি প্রতিদিন একই রাস্তায় হেঁটে যাই, একই মোড়ে দাঁড়াই, একই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি—হয়তো কোনো একদিন তুমি আবার ফিরে আসবে।
অনেকে বলে, স্মৃতি নাকি সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়ে যায়। কিন্তু আমার কাছে স্মৃতি যেন সময়ের সঙ্গে আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। তোমার অনুপস্থিতিই তোমাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে আমার কাছে। তুমি না থাকলেও, তোমার উপস্থিতি যেন আমার চারপাশে ছড়িয়ে থাকে—হাওয়ায়, বৃষ্টিতে, সন্ধ্যার নরম আলোয়।
একদিন হঠাৎ করে, অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই, আবার তোমাকে দেখলাম। এবার আর বৃষ্টি ছিল না, ছিল শুকনো, ক্লান্ত বিকেল। মানুষের ভিড়ের মধ্যে তোমাকে চিনতে এক মুহূর্তও সময় লাগেনি। তুমি হয়তো বদলেছিলে কিছুটা—চুলের বিন্যাসে, পোশাকের ধরনে, কিংবা চোখের গভীরতায়—কিন্তু আমার কাছে তুমি ঠিক সেই আগের মতোই ছিলে।
আমি তোমার দিকে এগিয়ে গেলাম। হৃদস্পন্দন তখন অস্বাভাবিক দ্রুত। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তেই যেন আমার সমস্ত জীবন নির্ধারিত হবে। তুমি তাকালে আমার দিকে। চোখে এক মুহূর্তের বিস্ময়, তারপর একটুখানি হাসি—যেন তুমি আমাকে চিনতে পেরেছ, অথবা অন্তত আমার অপেক্ষার গল্পটা বুঝতে পেরেছ।
“আপনি কি কিছু বলতে চাচ্ছেন?”—তোমার কণ্ঠে ছিল এক ধরনের স্বাভাবিক কৌতূহল।
আমি থেমে গেলাম। এতদিন ধরে মনে মনে যত কথা জমিয়েছিলাম, সব যেন একসঙ্গে হারিয়ে গেল। কী বলব, কীভাবে বলব—কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
শেষ পর্যন্ত আমি শুধু বললাম, “আমি আপনাকে খুঁজছিলাম।”
তুমি অবাক হলে। “আমাকে? কিন্তু আমি তো আপনাকে চিনি না।”
আমি মৃদু হেসে বললাম, “হয়তো এই জন্মে না। কিন্তু আমার মনে হয়, আমি আপনাকে অনেকদিন ধরেই চিনি।”
তুমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলে। তারপর ধীরে ধীরে বললে, “মানুষ অনেক সময় এমন অনুভূতি পায়। কিন্তু সব অনুভূতির পেছনে বাস্তবতা থাকে না।”
তোমার কথায় যুক্তি ছিল, বাস্তবতা ছিল। কিন্তু আমার অনুভূতিগুলো যুক্তির সীমা মানতে রাজি ছিল না।
“তবুও,” আমি বললাম, “আমি একবার আপনার সঙ্গে হাঁটতে চাই। খুব বেশি কিছু না—শুধু কিছুক্ষণ।”
তুমি একটু ভেবে সম্মতি দিলে। আমরা পাশাপাশি হাঁটতে লাগলাম। শহরের কোলাহল তখন আমাদের ঘিরে ছিল, কিন্তু আমাদের মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত নীরবতা—যেন সেই নীরবতাই আমাদের প্রকৃত ভাষা।
আমি তোমাকে কোনো প্রশ্ন করিনি। তুমি নিজেও খুব বেশি কিছু বলনি। কিন্তু আমাদের সেই হাঁটা—সেই ক্ষণিকের সহযাত্রা—আমার কাছে হয়ে উঠল এক অনন্ত যাত্রার সূচনা।
সেদিনের পর আমরা আর কখনো দেখা করিনি।
তুমি হারিয়ে গেলে—আবারও। কিন্তু এবার তোমার অনুপস্থিতি আগের মতো কষ্টদায়ক ছিল না। কারণ এবার আমি জানতাম, তুমি বাস্তব। তুমি কেবল কল্পনা নও, কোনো স্বপ্ন নও। তুমি এই পৃথিবীরই একজন মানুষ, যার সঙ্গে আমি হেঁটেছি, কথা বলেছি, যার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার নিজের অস্তিত্বকে নতুন করে চিনেছি।
আমি আবার সেই পুরনো রাস্তায় যাওয়া শুরু করলাম। কিন্তু এবার আর অপেক্ষা ছিল না। ছিল এক ধরনের প্রশান্তি। মনে হচ্ছিল, আমি যা চেয়েছিলাম, তা পেয়ে গেছি।
তবুও, হৃদয়ের গভীরে এক অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা রয়ে গেল—তোমাকে আর একবার ছোঁয়ার। সেই স্পর্শ, যা কখনো ঘটেনি, কিন্তু যার অভাব আমি প্রতিদিন অনুভব করি।
আমি জানি না, এই আকাঙ্ক্ষার শেষ কোথায়। হয়তো কোনোদিন তুমি আবার ফিরে আসবে, হয়তো আসবে না। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না।
কারণ আমি এখন বুঝতে শিখেছি—ভালোবাসা মানে সবসময় প্রাপ্তি নয়। ভালোবাসা মানে কখনো কখনো শুধু অপেক্ষা, শুধু অনুভব, শুধু এক অদৃশ্য বন্ধনের প্রতি নিঃশব্দ আনুগত্য।
আমি এখনও সেই পথিক—তোমার স্মৃতির দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা। সময় বদলেছে, ঋতু বদলেছে, কিন্তু আমার অবস্থান বদলায়নি।
হাজারো ব্যস্ত ভিড়ের মাঝেও আমি এখনও তোমাকেই খুঁজি।
আর আমি জানি, এই খোঁজের মধ্যেই আমার জীবন, আমার অর্থ, আমার অনন্ত যাত্রা।
শুধু তোমাকে একবার স্পর্শ করবে—এই স্বপ্ন নিয়েই আমি বেঁচে আছি।
হয়তো কোনোদিন, কোনো এক অচেনা বিকেলে, আবার আমাদের দেখা হবে। তুমি হয়তো তখনও আমাকে চিনবে না, আমি হয়তো আবারও নিজেকে পরিচয় করাতে পারব না।
কিন্তু সেই মুহূর্তে, যদি আমাদের হাত দুটো একবার স্পর্শ করে—তাহলেই আমার সমস্ত অপেক্ষা, সমস্ত তৃষ্ণা, সমস্ত জীবন পূর্ণতা পাবে।
ততদিন পর্যন্ত, আমি এই পথেই থাকব—একজন নীরব, অবিচল পথিক হয়ে।  সমাপ্ত।।