ঢাকা, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
সময়: ১২:০৯:০৪ AM

গল্প" নতুন ভোর"

মান্নান মারুফ
10-06-2026 12:09:04 AM
গল্প" নতুন ভোর"
রাস্তায় আজ ধুলোর জ্বর ভাঙছে। সকাল থেকেই শহরের বাতাস ভারী। চারদিকে বুলডোজারের গর্জন, পুলিশের সাইরেন আর মানুষের অসহায় চিৎকার মিলেমিশে এক অদ্ভুত আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। যে শহর একসময় হাজারো মানুষের ঘাম, শ্রম আর স্বপ্নে বেঁচে ছিল, সেই শহর আজ যেন নিজের মানুষদেরই অস্বীকার করছে।
রহিম দাঁড়িয়ে ছিল রাস্তার পাশে। তার চোখের সামনে ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলা হচ্ছে তার ছোট্ট চায়ের দোকান। দোকান বলতে বাঁশ, টিন আর কাঠের তৈরি একটি ঘর। কিন্তু সেই ঘরই ছিল তার পৃথিবী। সেই দোকানের আয়ে চলত বৃদ্ধ মা, স্ত্রী আর দুই সন্তান।
বুলডোজারের বিশাল চাকাগুলো এগিয়ে আসতেই তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
মনে পড়ল, কত বছর আগে এক মুঠো পুঁজি নিয়ে সে এই শহরে এসেছিল। গ্রামের নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল শহরের ফুটপাতে। প্রথমে দিনমজুরের কাজ করেছে, পরে রিকশা চালিয়েছে। বছরের পর বছর কষ্ট করে কিছু টাকা জমিয়ে বানিয়েছিল এই ছোট্ট দোকান।
কিন্তু আজ সব শেষ।
এক মুহূর্তে টিনের চাল উড়ে গেল। কাঠের বেঞ্চ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কাচের বয়ামগুলো ছিটকে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
রহিমের চোখে জল।
সে বিড়বিড় করে বলল—
“তিল তিল করে জমানো পুঁজি এক নিমিষে করলি ছাই। এই শহরের ফুটপাতে কি গরিব মানুষের জায়গা নাই?”
তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল জসিম। সে ফল বিক্রি করত ফুটপাতে। গতকালও যেখানে তার দোকানে মানুষের ভিড় ছিল, আজ সেখানে শুধু ইট-পাথরের স্তুপ।
জসিম মাটিতে বসে মাথায় হাত দিয়ে বলল—
“যে দোকানে কালকেও চা ফুটেছে, যে ফুটপাতে ছিল কত প্রাণ, আজ সেখানে শুধু ধ্বংসস্তূপ। কেড়ে নিল জসিমদের সম্মান।”
চারপাশে শত শত মানুষ একই কষ্টে কাঁদছে। কেউ দোকান হারিয়েছে, কেউ ঘর। কেউ আবার জীবনের একমাত্র আয়ের পথ।
সবচেয়ে করুণ ছিল শিশুদের কান্না।
এক কোণে দাঁড়িয়ে রহিমের ছোট ছেলে রাব্বি কাঁদছে।
“আব্বা, আমরা এখন কোথায় যাব?”
প্রশ্নটা শুনে রহিমের বুক ফেটে যাচ্ছিল।
সত্যিই তো, যাবে কোথায়?
পেটের খিদে কি এসব ক্ষমতাবান মানুষ বোঝে?
বাচ্চাগুলোর কান্না শুনে যেন মানুষগুলো পাথর হয়ে গেছে।
সেদিন সন্ধ্যায় ফুটপাত ও বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলো একসঙ্গে জড়ো হলো।
কেউ কথা বলছিল না।
সবাই যেন শোক পালন করছে।
হঠাৎ বৃদ্ধ আবদুল গফুর দাঁড়িয়ে বললেন—
“ভাইরা, কান্না করে লাভ কী? আমাদের জীবন কি প্রথমবার ধ্বংস হলো? আমরা তো বারবার ভেঙেছি, আবার দাঁড়িয়েছি।”
তার কথা শুনে সবাই মাথা তুলল।
তিনি আবার বললেন—
“ভোটের আগে যারা বলেছিল গরিবের পাশে থাকবে, তারা আজ কোথায়? তখন তো ভাই ভাই বলে কাঁধে হাত রাখত। আজ গদিতে বসে আমাদের অস্তিত্ব মুছে দিতে চায়।”
জনতার মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো।
রহিম দাঁড়িয়ে বলল—
“আমরা কি মানুষ না? আমাদের সন্তানদের কি বাঁচার অধিকার নেই?”
কেউ উত্তর দিল না।
কিন্তু সবার চোখে একই আগুন জ্বলছিল।
সেই রাতেই সিদ্ধান্ত হলো।
তারা সংগঠিত হবে।
নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়বে।
পরদিন সকাল থেকে শুরু হলো নতুন সংগ্রাম।
উচ্ছেদ হওয়া শ্রমিক, দোকানি, রিকশাচালক, হকার—সবাই মিলে গঠন করল একটি কমিটি।
লাল পতাকা হাতে তারা রাস্তায় নামল।
তাদের দাবি ছিল সহজ—
পুনর্বাসন চাই।
কর্মসংস্থান চাই।
বাঁচার অধিকার চাই।
প্রথমে অনেকেই ভয় পেয়েছিল।
কিন্তু ক্ষুধা যখন গলায় হাত দেয়, তখন ভয়ের জায়গা থাকে না।
দিনের পর দিন তারা মানববন্ধন করল।
মিছিল করল।
স্লোগানে মুখর হয়ে উঠল শহরের রাজপথ।
“গরিব মারার রাজনীতি চলবে না।”
“পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ মানি না।”
“মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দাও।”
এই আন্দোলনের খবর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল।
শহরের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন তাদের পাশে এসে দাঁড়াল।
শিক্ষার্থীরাও সমর্থন জানাল।
একসময় হাজার মানুষের কণ্ঠ এক হয়ে গেল।
ক্ষমতাবানরা বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে প্রথমে উপহাস করেছিল।
তারা ভেবেছিল কয়েক দিনের মধ্যেই আন্দোলন থেমে যাবে।
কিন্তু থামল না।
বরং আরও শক্তিশালী হলো।
একদিন বিশাল মিছিল নিয়ে শ্রমজীবী মানুষরা শহরের কেন্দ্রস্থলে গেল।
সেখানে পুলিশ ব্যারিকেড বসিয়েছিল।
জনতাকে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো।
পুলিশের লাঠি উঁচিয়ে ধরা হলো।
চারদিকে উত্তেজনা।
কিন্তু রহিম সামনে এগিয়ে গেল।
তার কণ্ঠে কোনো ভয় ছিল না।
সে বলল—
“আমরা অন্যায় করতে আসিনি। আমরা আমাদের অধিকার চাইতে এসেছি।”
পুলিশের এক কর্মকর্তা কঠোর গলায় বললেন—
“ফিরে যান।”
রহিম উত্তর দিল—
“পেটের ক্ষুধা নিয়ে কোথায় ফিরব? সন্তানদের মুখে কী খাবার দেব?”
হাজারো মানুষ তখন একসঙ্গে গর্জে উঠল।
তাদের কণ্ঠে ছিল দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ইতিহাস।
শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
মানবিক মর্যাদার দাবি।
সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, অদৃশ্য এক শক্তি তাদের সাহস জোগাচ্ছে।
কেউ আর পিছু হটতে রাজি নয়।
সংগ্রাম চলতেই থাকল।
দিন পেরিয়ে সপ্তাহ, সপ্তাহ পেরিয়ে মাস।
একসময় প্রশাসনও বুঝতে পারল, এই মানুষদের উপেক্ষা করা যাবে না।
আলোচনার ডাক এল।
কমিটির প্রতিনিধিরা আলোচনায় বসল।
রহিমও সেখানে ছিল।
সে স্পষ্ট ভাষায় বলল—
“আমরা দয়া চাই না। আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার চাই।”
দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে কিছু দাবি মেনে নেওয়া হলো।
উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠন করা হবে।
বিকল্প কর্মস্থলের ব্যবস্থাও করা হবে।
খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই মানুষের মুখে দীর্ঘদিন পর হাসি ফুটল।
এটি হয়তো সম্পূর্ণ বিজয় ছিল না।
কিন্তু এটি ছিল সংগ্রামের জয়।
ঐক্যের জয়।
মানুষের মর্যাদার জয়।
সেদিন সন্ধ্যায় রহিম দাঁড়িয়ে ছিল নতুন বরাদ্দ পাওয়া জায়গাটিতে।
তার পাশে ছিল জসিম, গফুর চাচা আর আরও অনেকেই।
সামনে উড়ছিল লাল পতাকা।
সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছিল।
আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছিল।
রহিম তার ছেলেকে কোলে তুলে বলল—
“দেখ বাবা, মানুষ যদি এক হয়, তাহলে কোনো শক্তিই তাকে হারাতে পারে না।”
রাব্বি বিস্মিত চোখে আকাশের দিকে তাকাল।
সেখানে লাল পতাকা বাতাসে দুলছে।
মনে হচ্ছিল, পতাকাটি শুধু কাপড় নয়, হাজারো মানুষের স্বপ্ন।
হাজারো শ্রমজীবী মানুষের ঘাম।
অসংখ্য নির্যাতিত মানুষের আশা।
গফুর চাচা ধীরে ধীরে বললেন—
“লড়াই শেষ হয়নি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই কখনো শেষ হয় না। কিন্তু আজ আমরা প্রমাণ করেছি, গরিব মানুষ দুর্বল হতে পারে, অসহায় হতে পারে, কিন্তু পরাজিত নয়।”
সবাই নীরবে মাথা নাড়ল।
সত্যিই, তাদের ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, সম্মান কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
কিন্তু তাদের স্বপ্ন ভাঙা যায়নি।
তাদের সাহস শেষ হয়ে যায়নি।
তারা শিখেছে, অধিকার কেউ হাতে তুলে দেয় না; অধিকার আদায় করে নিতে হয়।
সেদিন শহরের বাতাসে আর ধুলোর জ্বর ছিল না।
ছিল নতুন প্রত্যয়ের গন্ধ।
ছিল সংগ্রামের গান।
ছিল মানুষের জয়ের ইতিহাস।
আর লাল পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে হাজারো শ্রমজীবী মানুষ বিশ্বাস করতে শিখল—
যে ভোরের জন্য তারা এতদিন লড়েছে, সেই নতুন ভোর একদিন অবশ্যই আসবে।
সমাপ্ত।।