ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬,
সময়: ০২:১০:২৯ AM

উপন্যাস:তোমার মুখ”

মান্নান মারুফ
01-06-2026 08:41:15 PM
উপন্যাস:তোমার মুখ”

শেষ পর্ব 

পৃথিবীর সবচেয়ে কষ্টের সংবাদগুলো সাধারণত খুব সাধারণভাবেই আসে।

কোনো ঝড় ওঠে না।

আকাশ ভেঙে পড়ে না।

চারপাশের পৃথিবীও থেমে যায় না।

শুধু একটি খবর নিঃশব্দে এসে মানুষের জীবনের ভেতর সবকিছু বদলে দেয়।

সেদিন বিকেলেও ঠিক তেমনই ছিল।

নীলা অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছিল ক্লান্ত শরীরে।

বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছিল।

জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা জমে ছিল।

অদ্ভুতভাবে, এমন বৃষ্টির দিনে তার অনেক পুরোনো কথা মনে পড়ত।

যদিও বহু বছর ধরে সে নিজের জীবনকে নতুনভাবে গুছিয়ে নিয়েছে, তবুও কিছু স্মৃতি ছিল, যেগুলো কখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি।

হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে একটি পুরোনো পরিচিত নাম ভেসে উঠল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বন্ধু।

নীলা কল রিসিভ করল।

কিন্তু ওপাশের কণ্ঠ শুনেই তার বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠল।

কণ্ঠটি ভারী।

বিষণ্ন।

কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর বন্ধুটি বলল,

—"নীলা... একটা খবর আছে।"

নীলার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

—"কী হয়েছে?"

ওপাশে আবার নীরবতা।

তারপর খুব ধীরে ভেসে এল সেই কথাটি—

—"অর্ণব আর নেই।"

মুহূর্তের জন্য পৃথিবী যেন থেমে গেল।

নীলার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

তার কানে যেন আর কোনো শব্দ পৌঁছাচ্ছিল না।

শুধু একটি বাক্য বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—

"অর্ণব আর নেই।"

অনেক বছর পরও নামটি শুনে তার হৃদয় এভাবে কেঁপে উঠবে, সে কখনও ভাবেনি।

সে বিছানায় বসে পড়ল।

চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল।

বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে।

ঠিক সেই বৃষ্টির মতো, যেদিন তারা একসঙ্গে ভিজেছিল।

বন্ধুটি ধীরে ধীরে সব বলল।

অর্ণবের অসুস্থতার কথা।

হাসপাতালের দিনগুলোর কথা।

শেষ সময়ের কথা।

আর একটি কথা—

মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত অর্ণব নীলাকে ভুলতে পারেনি।

কথাটা শুনে নীলার ভেতরের জমাটবাঁধা দেয়ালটা যেন হঠাৎ ভেঙে পড়ল।

সে এত বছর ধরে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে সব শেষ হয়ে গেছে।

সময় সবকিছু বদলে দিয়েছে।

কিন্তু সেই মুহূর্তে সে বুঝতে পারল—

কিছু অনুভূতি সময়ের কাছে হার মানে না।

রাতভর তার ঘুম এল না।

একটার পর একটা স্মৃতি ফিরে আসতে লাগল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দিনগুলো।

লেকের ধারে বসে গল্প করা।

বৃষ্টিভেজা বিকেল।

হাত ধরে হাঁটা।

অর্ণবের হাসি।

অর্ণবের স্বপ্ন।

অর্ণবের চোখে তার জন্য অগাধ ভালোবাসা।

আর তারপর সেই ভুল বোঝাবুঝি।

সেই দূরে সরে যাওয়া।

সেই নীরবতা।

হঠাৎ তার মনে হলো, যদি সে একবার অর্ণবের কথা শুনত?

যদি একবার তাকে বিশ্বাস করত?

যদি একবার ফিরে তাকাত?

কিন্তু জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো—

কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়, যখন আর কিছুই বদলানোর সুযোগ থাকে না।

দুই দিন পর সেই বন্ধুটি নীলার কাছে একটি খাম নিয়ে এল।

খামের ওপর কোনো ঠিকানা নেই।

শুধু লেখা—

"নীলার জন্য।"

নীলার হাত কাঁপতে লাগল।

—"এটা কী?"

বন্ধুটি ধীরে বলল,

—"অর্ণবের জিনিসপত্রের মধ্যে পাওয়া গেছে। হয়তো তোমার জন্য লিখেছিল।"

খামটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল নীলা।

তারপর ধীরে ধীরে খুলল।

ভেতরে একটি চিঠি।

অর্ণবের হাতের লেখা।

বহু বছর পরও সেই লেখা তার চেনা।

চোখ ঝাপসা হয়ে এল।

সে পড়তে শুরু করল।

"প্রিয় নীলা,

হয়তো এই চিঠি তোমার হাতে কোনোদিন পৌঁছাবে না। তবুও লিখছি। কারণ কিছু কথা না বললে আমার হৃদয় অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

জানো, আমি তোমাকে কখনও ভুলতে পারিনি। জীবনের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি ঋতুতে, প্রতিটি নিঃসঙ্গ রাতে তোমার মুখটাই মনে পড়েছে।

আমি তোমার ওপর কোনো অভিমান রাখিনি। হয়তো আমরা দুজনেই সময়ের কাছে হেরে গিয়েছিলাম।

তুমি সুখে থাকো—এই প্রার্থনাই সবসময় করেছি।

যদি কোনোদিন আমার মৃত্যুর খবর তোমার কানে পৌঁছায়, তবে শুধু এটুকু জেনে রেখো—শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম।

আর শেষবার চোখ বন্ধ করার আগে বহুবার তোমার মুখটাই খুঁজেছি।

—অর্ণব"

চিঠির শেষ লাইন পড়তেই নীলা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

তার চোখের জল চিঠির ওপর ঝরে পড়ল।

বহু বছরের জমে থাকা কান্না একসঙ্গে বেরিয়ে এল।

সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

কারণ সে বুঝতে পেরেছে—

অর্ণব সত্যিই তাকে ভালোবেসেছিল।

শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।

আর সে?

সে কখনও সেই ভালোবাসার গভীরতা পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।

রাত গভীর হয়ে এল।

নীলা একা জানালার পাশে বসে ছিল।

হাতে সেই চিঠি।

বাইরে বৃষ্টি।

আকাশ অন্ধকার।

তার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর কোথাও অর্ণব এখনও আছে।

স্মৃতির ভেতর।

ভালোবাসার ভেতর।

অপূর্ণ স্বপ্নের ভেতর।

সে চোখ বন্ধ করল।

হঠাৎ মনে হলো, যেন দূরে কোথাও অর্ণব দাঁড়িয়ে আছে।

মুখে সেই চেনা শান্ত হাসি।

যে হাসি একদিন তার পৃথিবীকে সুন্দর করে দিয়েছিল।

নীলা ফিসফিস করে বলল,

—"ক্ষমা করে দিও, অর্ণব।"

জবাব এল না।

শুধু বৃষ্টির শব্দ।

কিন্তু তার মনে হলো, হয়তো অর্ণব শুনেছে।

হয়তো অনেক আগেই ক্ষমা করে দিয়েছে।

কারণ সত্যিকারের ভালোবাসা কখনও প্রতিশোধ নিতে জানে না।

ভালোবাসা শুধু ভালোবেসে যেতে জানে।

ধীরে ধীরে ভোর হয়ে এল।

আকাশে আলো ফুটতে শুরু করল।

নীলা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।

তার চোখে এখনও জল।

কিন্তু সেই জলের ভেতর আজ একটি উপলব্ধি জন্ম নিয়েছে—

কিছু ভালোবাসা শেষ হয় না।

কিছু সম্পর্কের কোনো সমাপ্তি হয় না।

শুধু মানুষ হারিয়ে যায়।

শুধু সময় তাদের আলাদা করে দেয়।

কিন্তু হৃদয়ের গভীরে তারা থেকে যায় চিরকাল।

অর্ণব নেই।

তার কণ্ঠ নেই।

তার উপস্থিতি নেই।

কিন্তু তার ভালোবাসা রয়ে গেছে।

একটি চিঠির পাতায়।

কিছু স্মৃতির ভেতর।

আর একটি অপূর্ণ শেষ ইচ্ছায়—

শেষবার নীলার মুখটি দেখার ইচ্ছায়।

জানালার কাঁচ বেয়ে বৃষ্টির শেষ ফোঁটাটি নিচে নেমে এল।

নীলার চোখ থেকেও একটি অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল।

আর সেই নিঃশব্দ অশ্রুর মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে গেল একটি অসমাপ্ত প্রেমের গল্প।

একটি গল্প, যেখানে ভালোবাসা ছিল।

অপেক্ষা ছিল।

বিচ্ছেদ ছিল।

কিন্তু ফিরে আসা ছিল না।

"যদি কখনও খবর পাও আমি মরে গেছি, তবে জেনে রেখো—শেষবার চোখ বোজার আগে বহুবার খুঁজেছি তোমার মুখটা। শুধু একবার দেখতে চেয়েছিলাম সেই চেনা চেহারা, যে চেহারার দিকে তাকিয়ে একদিন জীবন সাজাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কপালে ছিল না তোমার ছোঁয়া, ছিল না শেষ বিদায়ের কোনো শব্দ। ছিল শুধু ভাঙা হৃদয়ের নিঃশব্দ কান্না।" ❤️ সমাপ্তি।।