ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬,
সময়: ০২:১০:২৯ AM

উপন্যাস:তোমার মুখ”

মান্নান মারুফ
01-06-2026 08:37:10 PM
উপন্যাস:তোমার মুখ”

পর্ব ৭

হাসপাতালের সেই কক্ষটি এখন অর্ণবের কাছে পৃথিবীর শেষ ঠিকানা হয়ে উঠেছে।

সাদা দেয়াল। সাদা চাদর। ওষুধের গন্ধ। মেশিনের মৃদু শব্দ। আর জানালার ওপারে ধূসর আকাশ।

কয়েক সপ্তাহ আগেও সে জানত না জীবন এত দ্রুত শেষ প্রান্তে পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু এখন তার শরীরের প্রতিটি ক্লান্ত শ্বাস তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—সময় আর খুব বেশি নেই।

ডাক্তাররা আর আশার কথা বলছেন না।

বন্ধুরা চোখের জল লুকিয়ে কথা বলে।

নার্সরা মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকায়।

সবাই বুঝতে পারছে, একটি গল্পের শেষ অধ্যায় লেখা হয়ে গেছে।

শুধু অর্ণব এখনও একটি অসম্ভব আশাকে বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে।

নীলা।

বহু বছর ধরে যে নামটি তার নিঃসঙ্গ জীবনের একমাত্র আলো হয়ে ছিল, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও সেই নামটিই তার হৃদয়ে জেগে আছে।

সেদিন সকাল থেকেই অর্ণব অদ্ভুতভাবে অস্থির ছিল।

বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল।

কেউ ভেতরে ঢুকলেই তার চোখ জ্বলে উঠত।

কিন্তু প্রতিবারই হতাশা ফিরে আসত।

কখনও ডাক্তার।

কখনও নার্স।

কখনও কোনো বন্ধু।

কিন্তু নীলা নয়।

অর্ণব নিজেকেই প্রশ্ন করল—

"আমি কি এখনও অপেক্ষা করছি?"

উত্তরটা সে জানত।

হ্যাঁ।

আজও করছে।

এত বছর পরও করছে।

মৃত্যুর এত কাছে এসেও করছে।

দুপুরের দিকে তার এক পুরোনো বন্ধু দেখতে এল।

কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকার পর বলল,

—"কেমন লাগছে?"

অর্ণব মৃদু হাসল।

—"মনে হচ্ছে অনেক দূরে চলে যাচ্ছি।"

বন্ধুর চোখ ভিজে উঠল।

—"কিছু চাই?"

অর্ণব অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর আস্তে করে বলল,

—"একটা মুখ দেখতে ইচ্ছে করছে।"

বন্ধুটি বুঝে গেল।

নাম উচ্চারণ করার প্রয়োজন হলো না।

কারণ অর্ণবের জীবনের সবচেয়ে বড় গল্পের নাম সবাই জানত।

বন্ধুটি নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।

কোনো উত্তর দিতে পারল না।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল।

জানালার বাইরে আকাশে মেঘ জমেছে।

দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে।

অর্ণবের চোখের সামনে একের পর এক স্মৃতি ভেসে উঠতে লাগল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই প্রথম দিন।

লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি।

হাতে বই।

মুখে হাসি।

"এই বইটা কি আপনার?"

কত বছর পেরিয়ে গেছে!

তবুও সেই দৃশ্য আজও তার হৃদয়ে একদম স্পষ্ট।

তারপর একে একে ফিরে এল সব স্মৃতি।

বৃষ্টিভেজা বিকেল।

লেকের ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখা।

হাত ধরে হাঁটা।

ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

অভিমান।

ভুল বোঝাবুঝি।

নীরবতা।

বিচ্ছেদ।

আর দীর্ঘ প্রতীক্ষা।

সবকিছু যেন একসঙ্গে এসে ভিড় করল তার ক্লান্ত হৃদয়ে।

রাত নামার পর শ্বাস নিতে আরও কষ্ট হতে লাগল।

নার্স এসে ওষুধ দিল।

মেশিনের শব্দ একটু দ্রুত হলো।

কিন্তু অর্ণবের চোখ এখনও দরজার দিকে।

তার মনে হচ্ছিল—

হয়তো এখন।

হয়তো এই মুহূর্তে।

হয়তো দরজা খুলবে।

আর নীলা এসে দাঁড়াবে।

সে কল্পনা করতে লাগল—

দরজা ধীরে ধীরে খুলছে।

নীলা ভেতরে ঢুকছে।

তার চোখ ভেজা।

মুখে সেই পুরোনো কোমলতা।

সে কাছে এসে বসছে।

তার হাত ধরে বলছে—

"অর্ণব, আমি এসেছি।"

অর্ণবের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই বাস্তবতা ফিরে এল।

দরজা বন্ধই রইল।

কেউ এল না।

শুধু নিস্তব্ধতা।

রাত আরও গভীর হলো।

বন্ধুরা একজন একজন করে চলে গেল।

কক্ষে এখন শুধু অর্ণব আর তার স্মৃতিগুলো।

জানালার বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

বৃষ্টির শব্দ শুনে তার মনে পড়ল সেই দিনটির কথা, যেদিন নীলা তাকে টেনে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজিয়েছিল।

কত প্রাণবন্ত ছিল সে!

কত আলো ছিল তার হাসিতে!

অর্ণব চোখ বন্ধ করল।

তার মনে হলো, যদি সময়কে একবার ফিরিয়ে নেওয়া যেত!

যদি আবার সেই দিনগুলোতে ফিরে যাওয়া যেত!

যদি আবার প্রথম পরিচয়ের মুহূর্তে দাঁড়ানো যেত!

তাহলে হয়তো সে আরও শক্ত করে নীলার হাত ধরে রাখত।

হয়তো ভুল বোঝাবুঝিকে তাদের মাঝখানে আসতে দিত না।

কিন্তু জীবনে "যদি" শব্দটির কোনো মূল্য নেই।

সময় কখনও পেছনে ফেরে না।

রাত প্রায় শেষের দিকে।

অর্ণবের শরীর আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে আসছে।

চোখদুটো বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

তবুও সে চেষ্টা করছে জেগে থাকতে।

কারণ তার মনে হচ্ছে—

যদি নীলা আসে?

যদি ঠিক এখনই আসে?

যদি সে ঘুমিয়ে পড়ে আর দেখা না হয়?

এই আশাটুকুই তাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছে।

একসময় তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল।

ঘরের আলো অস্পষ্ট হয়ে গেল।

মেশিনের শব্দ দূরে সরে যেতে লাগল।

কিন্তু সেই অস্পষ্টতার মধ্যেও সে দরজার দিকে তাকানোর চেষ্টা করল।

হয়তো...

হয়তো এখনও সময় আছে।

হয়তো এখনও অলৌকিক কিছু ঘটতে পারে।

তার ঠোঁট কাঁপল।

অস্পষ্ট স্বরে একটি নাম বেরিয়ে এল—

—"নীলা..."

কক্ষের ভেতর কোনো উত্তর এলো না।

শুধু বৃষ্টির শব্দ।

শুধু নীরবতা।

অর্ণবের চোখের কোণে একফোঁটা জল জমে উঠল।

সেই জল কি মৃত্যুভয়ের?

না।

সে তো অনেক আগেই মৃত্যুকে মেনে নিয়েছে।

সেই জল ছিল অপূর্ণ ভালোবাসার।

একটি মুখ শেষবার দেখার আকাঙ্ক্ষার।

একটি অসমাপ্ত গল্পের।

শেষ শক্তিটুকু দিয়ে সে আবার চোখ মেলল।

দরজার দিকে তাকাল।

কিন্তু সেখানে কেউ নেই।

কোনো পরিচিত মুখ নেই।

কোনো চেনা হাসি নেই।

কোনো কণ্ঠ নেই, যে বলবে—

"আমি তোমাকে আজও ভালোবাসি।"

ধীরে ধীরে তার চোখের পাতা ভারী হয়ে এল।

হৃদস্পন্দন ধীর হয়ে গেল।

শ্বাসপ্রশ্বাস ক্ষীণ হয়ে এল।

আর সেই শেষ মুহূর্তেও অর্ণব কোনো হাসপাতালের ছাদ দেখছিল না।

সে খুঁজছিল একটি মুখ।

একটি চিরচেনা মুখ।

যে মুখের দিকে তাকিয়ে একদিন সে জীবন সাজানোর স্বপ্ন দেখেছিল।

যে মুখ তাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিল।

যে মুখ তাকে ভেঙেও দিয়েছিল।

শেষ নিঃশ্বাসের আগমুহূর্তে তার মনের ভেতর শুধু একটি ছবিই ভেসে উঠল—

বৃষ্টিভেজা বিকেলে হাসতে থাকা নীলা।

সেই হাসির মধ্যেই যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল অর্ণবের সমস্ত ব্যথা।

তার সমস্ত অপেক্ষা।

তার সমস্ত অপূর্ণতা।

আর পৃথিবীর বুকে শেষবারের মতো নিঃশব্দে ভেসে উঠল একটি নাম—

নীলা। চলবে..........