ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬,
সময়: ০২:০৯:৪০ AM

উপন্যাস:তোমার মুখ”

মান্নান মারুফ
01-06-2026 08:26:54 PM
উপন্যাস:তোমার মুখ”

পর্ব ৪

মানুষ যখন কাউকে গভীরভাবে ভালোবাসে, তখন সে বিশ্বাস করতে চায়—সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। যত ভুল বোঝাবুঝিই হোক, যত অভিমানই জমুক, একদিন না একদিন প্রিয় মানুষটি ফিরে আসবে। অর্ণবও ঠিক সেই বিশ্বাসটুকু আঁকড়ে ধরে ছিল।

কিন্তু কিছু গল্পে ফিরে আসার পথ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।

আর মানুষ তা বুঝতে পারে তখনই, যখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

নীলা এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

আগের মতো কোনো ফোন নেই, কোনো বার্তা নেই, কোনো খোঁজ নেই।

অর্ণব প্রথম দিকে প্রতিদিন চেষ্টা করত।

সকালে একটি বার্তা পাঠাত।

রাতে আরেকটি।

কখনও লিখত—

"কেমন আছো?"

কখনও লিখত—

"একবার কথা বলো, প্লিজ।"

আবার কখনও শুধু লিখত—

"আমি অপেক্ষা করছি।"

কিন্তু প্রতিটি বার্তাই উত্তরহীন থেকে যেত।

নীলার নীরবতা যেন একটি অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

যে দেয়াল অর্ণব যতই ভাঙতে চায়, ততই উঁচু হয়ে ওঠে।

একদিন সাহস করে সে নীলার বিভাগের সামনে গিয়েছিল।

দূর থেকে দেখল, নীলা বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে।

হাসছে।

কিন্তু সেই হাসির মধ্যে অর্ণবের জন্য কোনো জায়গা নেই।

অর্ণব কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

ভাবল, হয়তো একবার চোখাচোখি হবে।

হয়তো নীলা এগিয়ে এসে বলবে, "কথা বলতে চাই।"

কিন্তু কিছুই হলো না।

নীলা যেন তাকে দেখেও দেখল না।

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে অর্ণব প্রথমবার অনুভব করল, মানুষ জীবিত থেকেও কতটা একা হয়ে যেতে পারে।

দিনগুলো ধীরে ধীরে আরও ভারী হয়ে উঠতে লাগল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি জায়গায় নীলার স্মৃতি লুকিয়ে ছিল।

লাইব্রেরির সেই কোণ।

ক্যান্টিনের জানালার পাশের টেবিল।

লেকের ধারের বেঞ্চ।

কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচের ছায়া।

সবকিছু যেন বারবার তাকে মনে করিয়ে দিত—

কখনও এখানে নীলা ছিল।

কখনও এখানে তারা একসঙ্গে হেসেছিল।

কখনও এখানে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল।

এখন শুধু স্মৃতি আছে।

মানুষ নেই।

এক বিকেলে অর্ণব একা লেকের ধারে বসেছিল।

আকাশে মেঘ জমেছে।

হালকা বাতাস বইছে।

তার মনে পড়ল, একদিন ঠিক এই জায়গায় বসে নীলা বলেছিল—

"যদি কোনোদিন আমরা হারিয়ে যাই?"

সেদিন সে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল।

আজ বুঝতে পারছে, নীলা হয়তো তখনই কোনো অজানা আশঙ্কা অনুভব করেছিল।

অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তার মনে হলো, মানুষ ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না, কিন্তু কখনও কখনও হৃদয় আগেই বিপদের শব্দ শুনে ফেলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ সেমিস্টার শুরু হলো।

চারপাশে সবাই ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত।

কেউ চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেউ উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করছে।

কিন্তু অর্ণবের পৃথিবী যেন থমকে গেছে।

সে ক্লাসে যায়।

নোট করে।

পরীক্ষা দেয়।

কিন্তু সবকিছুই যন্ত্রের মতো।

ভেতরে কোনো আনন্দ নেই।

কোনো স্বপ্ন নেই।

রাতে ঘুম আসে না।

মোবাইলের পুরোনো ছবিগুলো খুলে বসে থাকে।

একটি ছবিতে নীলা বৃষ্টিতে ভিজে হাসছে।

আরেকটিতে ক্যান্টিনে বসে চা খাচ্ছে।

আরেকটিতে লেকের ধারে সূর্যাস্ত দেখছে।

অর্ণব ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে।

মনে হয়, এই মানুষটিকে সে সত্যিই হারিয়ে ফেলেছে?

এত সহজে?

একদিন রাতে সে পুরোনো মেসেজগুলো পড়ছিল।

একটি বার্তায় নীলা লিখেছিল—

"তুমি না থাকলে আমার দিন অসম্পূর্ণ লাগে।"

অর্ণবের চোখ ভিজে উঠল।

কী অদ্ভুত!

একসময় যে মানুষটি তাকে ছাড়া দিন কল্পনা করতে পারত না, আজ সেই মানুষটিই তাকে ছাড়া নতুন জীবন শুরু করে দিয়েছে।

সময় গড়াতে লাগল।

একদিন হঠাৎ খবর পেল, নীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব কম আসছে।

কেউ বলল, পরিবারের চাপে সে অন্য শহরে চলে যেতে পারে।

কেউ বলল, তার জন্য অন্য কোথাও বিয়ের প্রস্তাব এসেছে।

কেউ বলল, সে নতুন জীবন শুরু করতে চাইছে।

কোন খবরটি সত্যি, অর্ণব জানত না।

কিন্তু প্রতিটি গুজবই তার হৃদয়কে আরও ভারী করে তুলছিল।

সে অনেকবার ভাবল, শেষবারের মতো নীলার সঙ্গে দেখা করবে।

সব কথা খুলে বলবে।

কিন্তু সাহস পেল না।

কারণ সে বুঝে গিয়েছিল—

যে মানুষ চলে যেতে চায়, তাকে ধরে রাখা যায় না।

একদিন বিকেলে অর্ণব নীলার নম্বরে ফোন করল।

অনেকদিন পর।

কিন্তু ফোনে ভেসে এল—

"এই নম্বরটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।"

সে আবার চেষ্টা করল।

পরদিনও করল।

তারপরের দিনও।

একই উত্তর।

নম্বরটি বন্ধ।

মনে হলো, শুধু ফোন নয়, তাদের গল্পটাও বন্ধ হয়ে গেছে।

কিছুদিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেও নীলা অদৃশ্য হয়ে গেল।

তার প্রোফাইল নেই।

ছবি নেই।

কোনো খোঁজ নেই।

যেন সে পৃথিবীর কোনো এক অচেনা প্রান্তে হারিয়ে গেছে।

সেদিন রাতে অর্ণব জানালার পাশে বসে ছিল।

বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল।

ঠিক সেই বৃষ্টির মতো, যেদিন তারা একসঙ্গে ভিজেছিল।

কিন্তু আজ পাশে কেউ নেই।

শুধু নিঃসঙ্গতা।

হঠাৎ তার মনে হলো, নীলা যদি এখন ফিরে আসে?

যদি দরজায় কড়া নাড়ে?

যদি বলে—

"আমি ভুল করেছি, অর্ণব।"

এই কল্পনা তাকে কিছুক্ষণ সুখ দিল।

তারপর আবার বাস্তবতা ফিরে এল।

নীলা আর ফিরল না।

তবুও অর্ণব অপেক্ষা করা ছাড়ল না।

প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙলে সে একবার ফোন চেক করত।

হয়তো কোনো বার্তা এসেছে।

হয়তো কোনো অচেনা নম্বর থেকে কল।

হয়তো নীলা।

কিন্তু প্রতিদিনই হতাশা অপেক্ষা করত।

তবুও সে অপেক্ষা করত।

কারণ ভালোবাসা কখনও কখনও মানুষকে অদ্ভুতভাবে একগুঁয়ে করে তোলে।

যেখানে যুক্তি থেমে যায়, সেখানে অপেক্ষা বেঁচে থাকে।

মাস পেরিয়ে গেল।

ঋতু বদলে গেল।

ক্যাম্পাসের কৃষ্ণচূড়া আবার ফুলে ভরে উঠল।

কিন্তু অর্ণবের জীবনে কোনো নতুন রঙ এল না।

তার জীবন এখন স্মৃতির মধ্যে আটকে আছে।

সে বর্তমানের চেয়ে অতীতেই বেশি বাঁচে।

যেখানে নীলা এখনও হাসে।

এখনও হাত ধরে হাঁটে।

এখনও বলে—

"তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মানুষ।"

বাস্তবে সেই মানুষটি নেই।

কিন্তু স্মৃতিতে আছে।

আর সেই স্মৃতিগুলোই ধীরে ধীরে অর্ণবের সবচেয়ে বড় আশ্রয় এবং সবচেয়ে বড় যন্ত্রণায় পরিণত হলো।

কারণ মানুষকে হারিয়ে ফেলার কষ্টের চেয়েও ভয়ংকর হলো—

প্রতিদিন তাকে মনে করে বেঁচে থাকা।

আর অর্ণব ঠিক সেই জীবনটাই বেছে নিয়েছিল।

সে এখনও বিশ্বাস করত—

কোনো একদিন, কোনো এক বিকেলে, হয়তো নীলা ফিরে আসবে।

হয়তো আবার একবার তার নাম ধরে ডাকবে।

কিন্তু ভাগ্য তখন নীরবে অন্য একটি গল্প লিখছিল।

একটি গল্প, যেখানে অপেক্ষা থাকবে, স্মৃতি থাকবে, ভালোবাসা থাকবে—

কিন্তু ফিরে আসা থাকবে না।

চলবে.........