বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যাগুলো সবসময়ই নীলার খুব প্রিয় ছিল। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দূরের আলো-আঁধারের শহর দেখতে দেখতে সে প্রায়ই ভাবত—মানুষের জীবনও বুঝি এই শহরের মতো। বাইরে যত আলো, ভেতরে তত অন্ধকার।
আজও সে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ, চোখে ক্লান্তি আর বুকজুড়ে একরাশ না বলা অভিমান। ফোনের স্ক্রিনে বারবার তাকাচ্ছে, কিন্তু কোনো নতুন বার্তা নেই। যে মানুষটার একটি “কেমন আছো?” প্রশ্নের জন্য সে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছে, সেই মানুষটিই আজ সবচেয়ে বেশি দূরে।
নীলার মনে হঠাৎ করেই কিছু পুরোনো কথা ভেসে উঠল—
“আমার দুঃখের খবর কেউ রাখেনি। কিন্তু আমার ভুলের খোঁজ সবাই রেখেছে।”
কথাটা সে একদিন নিজের ডায়েরিতে লিখেছিল। তখনও বুঝতে পারেনি, এই কয়েকটি লাইন একদিন তার পুরো জীবনের গল্প হয়ে উঠবে।
নীলার জীবনটা খুব সাধারণ ছিল। ছোট্ট একটা চাকরি, মা-বাবাকে নিয়ে শান্ত সংসার আর নিজের মতো কিছু স্বপ্ন। কিন্তু তার জীবনে সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায় হয়ে এসেছিল আরিয়ান।
আরিয়ানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল এক বইমেলায়। নীলা তখন একটা বই হাতে দাঁড়িয়ে ছিল, আরিয়ান পাশ থেকে হেসে বলেছিল,
— “এই বইটা পড়েছেন?”
নীলা মাথা নেড়ে বলেছিল,
— “না, তবে লেখকের লেখা ভালো লাগে।”
সেদিন খুব সাধারণ কিছু কথার মধ্যেই অদ্ভুত এক ভালো লাগা জন্ম নিয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে কথা বাড়তে থাকে। রাত জেগে গল্প, হঠাৎ ফোনকল, ছোট ছোট অভিমান—সব মিলিয়ে একসময় দু’জনের পৃথিবী এক হয়ে যায়।
আরিয়ান ছিল খুব প্রাণবন্ত একজন মানুষ। সে নীলাকে হাসাতে জানত। নীলার মন খারাপ থাকলে বলত,
— “তুমি হাসলে পৃথিবীটা একটু বেশি সুন্দর লাগে।”
এই কথাগুলো নীলার বুকের ভেতর আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ত।
কিন্তু মানুষ হয়তো সবচেয়ে বেশি ভয় পায় সুখকে। কারণ সুখের পরেই আসে হারিয়ে যাওয়ার ভয়।
সম্পর্কের দুই বছর পার হওয়ার পর থেকেই সবকিছু বদলাতে শুরু করল। আরিয়ান ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজের কাজ নিয়ে। আগের মতো সময় দিত না। নীলা মাঝেমধ্যে অভিযোগ করত,
— “তুমি আগের মতো নেই।”
আরিয়ান বিরক্ত হয়ে বলত,
— “সবসময় অভিযোগ করো কেন?”
নীলা চুপ করে যেত। কারণ সে ঝগড়া করতে জানত না। সে শুধু চাইত কেউ তার মনটা একটু বুঝুক।
কিন্তু এই পৃথিবীতে মানুষ কারো কান্না দেখতে চায় না। সবাই শুধু ভুলগুলো দেখতে ভালোবাসে।
একদিন খুব ছোট একটা বিষয় নিয়ে তাদের বড় ঝগড়া হয়ে গেল। নীলা অভিমান করে ফোন বন্ধ করে রেখেছিল। আরিয়ান সেদিন অনেকবার ফোন করেছিল, কিন্তু নীলা ধরেনি।
পরদিন আরিয়ান শুধু একটা মেসেজ পাঠিয়েছিল—
“তুমি খুব বদলে গেছো।”
এই একটা বাক্য নীলার ভেতরটা ভেঙে দিয়েছিল।
সে সারারাত কেঁদেছিল। কিন্তু কেউ জানেনি। কেউ জিজ্ঞেস করেনি, রাতে তার ঘুম আসে কিনা। মনটা ভেঙে যায় কিনা।
মানুষ শুধু দেখেছে—নীলা রাগ করেছে, ফোন ধরেনি। এটাই ছিল তার “ভুল”।
তার কষ্টটা কেউ দেখেনি।
এরপর ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়তে থাকে। কথা কমে যায়। ভালোবাসা যেন কোথাও গিয়ে আটকে পড়ে।
নীলা অনেকবার চেষ্টা করেছিল সব ঠিক করতে। কিন্তু সম্পর্ক যখন একপক্ষ ধরে রাখে, তখন সেটা ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে যায়।
একদিন আরিয়ান খুব শান্ত গলায় বলেছিল,
— “আমাদের একটু দূরে থাকা দরকার।”
এই কথাটুকু শুনে নীলার মনে হয়েছিল, কেউ যেন তার বুকের ভেতর থেকে পুরো পৃথিবীটা সরিয়ে নিয়েছে।
তবু সে কাঁদেনি সামনে। শুধু মুচকি হেসে বলেছিল,
— “ভালো থেকো।”
কারণ সে শিখে গিয়েছিল—দুর্বলতা কাউকে দেখাতে নেই।
মানুষ সহানুভূতি কম দেয়, বিচার বেশি করে।
দিনগুলো এরপর খুব নিঃশব্দ হয়ে গেল। অফিস শেষে বাসায় ফিরে নীলা একা বারান্দায় বসে থাকত। রাত গভীর হলে পুরোনো চ্যাটগুলো পড়ত। আরিয়ানের পাঠানো “খেয়েছো?”, “ঘুমাওনি এখনো?”—এই ছোট ছোট মেসেজগুলোই তখন তার সবচেয়ে বড় কষ্ট হয়ে উঠেছিল।
এক রাতে হঠাৎ বৃষ্টি নামল। নীলা জানালার পাশে বসে ছিল। তার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল কেউ তাকে জড়িয়ে ধরে বলুক,
— “সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কিন্তু বাস্তবতা গল্পের মতো সুন্দর হয় না।
হঠাৎ ফোনে একটি নোটিফিকেশন এলো। আরিয়ানের মেসেজ।
“কেমন আছো?”
মাত্র দুটি শব্দ।
তবু এই দুটি শব্দ পড়েই নীলার চোখ ভিজে উঠল। কারণ অনেকদিন পর কেউ তাকে জিজ্ঞেস করেছে—সে কেমন আছে।
নীলা অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। কী উত্তর দেবে বুঝতে পারছিল না।
শেষ পর্যন্ত সে লিখল,
— “ভালো আছি।”
মিথ্যা।
মানুষ সবচেয়ে দ্রুত যে অভিনয়টা শিখে যায়, সেটা হলো ভালো থাকার অভিনয়।
কারণ সত্যিকারের কষ্ট কেউ বুঝতে চায় না।
আরিয়ান আবার লিখল,
— “তোমাকে খুব মিস করি।”
নীলার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। এতদিনের জমে থাকা অভিমান, কষ্ট আর ভালোবাসা একসঙ্গে ভিড় করল তার ভেতরে।
সে লিখল না কিছুই।
কিছুক্ষণ পর আরিয়ান ফোন করল।
ফোন রিসিভ করতেই ওপাশে নীরবতা।
তারপর খুব আস্তে করে আরিয়ান বলল,
— “তুমি কি এখনও আমার ওপর রাগ করে আছো?”
নীলা হাসল। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
— “রাগ নাৃ শুধু একটু কষ্ট পাই।”
আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “আমি বুঝতে পারিনি তুমি এতটা একা হয়ে গিয়েছিলে।”
নীলা চুপ করে রইল।
কারণ কিছু কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
আরিয়ান বলল,
— “জানো, তোমার একটা ভুল আমি মনে রেখেছিলাম। কিন্তু তোমার হাজারটা কষ্ট আমি বুঝিনি। এখন মনে হয়, আমি তোমাকে ঠিকভাবে ভালোবাসতেই পারিনি।”
নীলার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
ভালোবাসা আসলে খুব অদ্ভুত। মানুষ চলে যাওয়ার পরই তার গুরুত্ব বুঝতে শেখে।
সেদিন তারা অনেকক্ষণ কথা বলেছিল। পুরোনো দিনের মতো।
বৃষ্টির শব্দের মধ্যে নীলা অনুভব করল, কিছু সম্পর্ক কখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। অভিমান জমে, দূরত্ব তৈরি হয়, কিন্তু কোথাও না কোথাও ভালোবাসা থেকে যায়।
আরিয়ান হঠাৎ বলল,
— “একবার দেখা করবে?”
নীলা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— “যদি আবার কষ্ট দাও?”
আরিয়ান নরম গলায় উত্তর দিল,
— “এবার তোমার কষ্টের খবর রাখব। শুধু ভুলের হিসাব রাখব না।”
এই কথাটা শুনে নীলার চোখ আবার ভিজে উঠল।
হয়তো মানুষ সবসময় বদলায় না। কিন্তু কখনও কখনও ভালোবাসা মানুষকে বদলে দিতে পারে।
পরের বিকেলে তারা দেখা করল সেই পুরোনো কফিশপে, যেখানে প্রথম একসঙ্গে বসেছিল।
নীলা এসে দেখল, আরিয়ান আগের মতোই জানালার পাশের টেবিলে বসে আছে।
তাদের চোখাচোখি হতেই দু’জনেই হেসে ফেলল।
কিছু হাসির ভেতর অনেক কান্না লুকিয়ে থাকে।
আরিয়ান ধীরে ধীরে বলল,
— “তুমি আজও খুব সুন্দর।”
নীলা মাথা নিচু করে হাসল।
অনেকদিন পর তার মনে হলো, হয়তো জীবন এখনও পুরোটা ফুরিয়ে যায়নি।
হয়তো এখনও কেউ আছে, যে তার নীরব কষ্টগুলো বুঝতে চায়।
কফির কাপের ধোঁয়ার ভেতর দু’জনের নীরবতা মিশে যাচ্ছিল। বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
নীলা জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে মনে বলল—
“এই পৃথিবীতে কষ্ট নীরব থাকলে কেউ দেখে না। ভুল একটু চোখে পড়লেই সবাই হিসাব রাখতে শুরু করে। তাই মানুষ ভালো থাকার অভিনয় শিখে যায়। কারণ দুর্বলতা দেখলে মানুষ সহানুভূতির চেয়ে সমালোচনাই বেশি করে।”
কিন্তু আজ তার মনে হচ্ছিল, সব মানুষ একরকম নয়।
কেউ কেউ সত্যিই ফিরে আসে।
কারো কারো কাছে ভালোবাসা মানে শুধু সুখের সময় পাশে থাকা নয়, বরং মানুষের নীরব কান্নাগুলোও বুঝে নেওয়া।
আর হয়তো এটাই সত্যিকারের ভালোবাসা। সমাপ্ত।।