ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬,
সময়: ০২:১৭:৫৯ AM

”নিহারিকা”

মান্নান মারুফ
26-05-2026 12:42:31 PM
”নিহারিকা”

পর্ব ৭ 

“হয়তো দেখা হত কম...”

মানুষ অনেক কিছু হারিয়ে ফেলার পর বুঝতে পারে, কোন জিনিসটি তার জীবনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কুদ্দুসও বুঝতে পেরেছিল।

কিন্তু সেই উপলব্ধি এসেছিল এক ভয়ংকর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে।

সাহিত্য উৎসবে দেখা হওয়ার পর কয়েক মাস কেটে গেছে। তারা আবার নিয়মিত যোগাযোগ শুরু করে। মাঝেমধ্যে ছোট্ট বার্তা, কখনো কোনো বইয়ের ছবি, কখনো একটি কবিতার লাইন—এভাবেই নীরব সম্পর্কটা আবার ধীরে ধীরে জেগে উঠছিল।

তবুও দু’জনেই যেন এখনও সাবধানে হাঁটছিল।

যেন অনুভূতির খুব কাছে গেলেই আবার হারিয়ে যাবে সবকিছু।

এক সন্ধ্যায় কলেজ থেকে ফেরার সময় কুদ্দুসের ফোনে একটি অচেনা নম্বর ভেসে উঠল।

ওপাশে একজন নারীকণ্ঠ।

— “আপনি কি কুদ্দুস সাহেব?”

— “জি।”

— “আমি নিহারিকার সহকর্মী বলছিৃ ও হাসপাতালে ভর্তি।”

কুদ্দুসের বুকের ভেতরটা আচমকা ঠান্ডা হয়ে গেল।

— “কী হয়েছে?”

— “হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কয়েকদিন ধরেই শরীর খারাপ ছিল। আজ অফিসে অজ্ঞান হয়ে যায়।”

এরপর আর কিছু শুনতে পারেনি সে।

মনে হচ্ছিল, চারপাশের সব শব্দ হঠাৎ দূরে সরে গেছে।

সেই রাতেই কুদ্দুস ঢাকার ট্রেনে উঠে বসে।

জানালার বাইরে অন্ধকার ছুটছিল দ্রুত। মাঝে মাঝে দূরের স্টেশনের আলো এসে আবার হারিয়ে যাচ্ছিল।

তার বুকের ভেতরে শুধু একটাই ভয় ঘুরছিল—

যদি খুব দেরি হয়ে যায়?

মানুষ জীবনে অনেক কথা না বলেই কাটিয়ে দেয়। মনে করে, সময় আছে।

কিন্তু সময় কখন ফুরিয়ে যায়, কেউ জানে না।

ট্রেনের শব্দের ভেতর কুদ্দুস বারবার মনে করছিল নিহারিকার মুখ।

সেই প্রথম দেখা।

লাইব্রেরির বিকেল।

বৃষ্টির রাত।

আর সাহিত্য উৎসবে শেষবারের মতো তাকানো সেই চোখ।

তার হঠাৎ মনে হলো, এত বছর ধরে সে শুধু ভালোবেসেই গেছে, কিন্তু কোনোদিন স্পষ্ট করে বলেনি।

যদি আর বলার সুযোগ না পায়?

হাসপাতালের করিডোরে এক ধরনের ঠান্ডা নীরবতা থাকে।

সাদা দেয়াল, ম্লান আলো, দূরে নার্সদের পায়ের শব্দ—সবকিছু মিলিয়ে জায়গাটা কেমন বিষণ্ন।

কুদ্দুস যখন হাসপাতালে পৌঁছাল, তখন ভোর হয়ে গেছে।

নিহারিকার সহকর্মী তাকে কেবিনের সামনে নিয়ে গেল।

— “ডাক্তার বলেছেন এখন বিপদ কেটে গেছে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ আর দুর্বলতায় এমন হয়েছে।”

কুদ্দুস ধীরে দরজা খুলল।

নিহারিকা ঘুমিয়ে ছিল।

মুখটা অনেক ফ্যাকাশে লাগছিল। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।

এই প্রথমবার কুদ্দুস বুঝতে পারল, মানুষ আসলে কতটা ভঙ্গুর।

যে মানুষটিকে সে এত বছর ধরে নিজের অন্তরের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় রেখে দিয়েছে, তাকে হারানোর ভয় হঠাৎ তাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিল।

সে ধীরে চেয়ার টেনে বিছানার পাশে বসে রইল।

বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটছে।

অনেকক্ষণ পর নিহারিকার ঘুম ভাঙল।

চোখ খুলেই প্রথমে কিছু বুঝতে পারল না। তারপর ধীরে ধীরে কুদ্দুসকে দেখে স্থির হয়ে গেল।

তার চোখে বিস্ময়ের চেয়ে বেশি ছিল এক ধরনের গভীর শান্তি।

যেন এই মানুষটিকে পাশে দেখাটাই স্বাভাবিক।

কুদ্দুস কিছু বলতে পারছিল না।

শুধু তাকিয়ে ছিল।

নিহারিকা মৃদু স্বরে বলল,
— “তুমি এসেছো?”

কুদ্দুস মাথা নেড়ে বলল,
— “হ্যাঁ।”

তারপর আবার নীরবতা।

হাসপাতালের ঘরে সেই নীরবতাও কেমন ভারী হয়ে ছিল।

সেদিন সারাদিন কুদ্দুস হাসপাতালেই ছিল।

ডাক্তার আসছে, নার্স ওষুধ দিচ্ছে, বাইরে মানুষের আসা-যাওয়া—সবকিছুর মাঝেও তার মনে হচ্ছিল, এই ছোট্ট ঘরটাই যেন এখন পুরো পৃথিবী।

নিহারিকা মাঝেমধ্যে চুপচাপ তার দিকে তাকাচ্ছিল।

সেই দৃষ্টিতে অদ্ভুত কোমলতা ছিল।

বিকেলের দিকে বাইরে বৃষ্টি নামল।

জানালার কাঁচ বেয়ে বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছিল ধীরে ধীরে।

নিহারিকা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “বৃষ্টির শব্দ এখনও তোমার কথা মনে করিয়ে দেয়।”

কুদ্দুস চোখ নামিয়ে ফেলল।

এত বছর ধরে বুকের ভেতরে জমে থাকা অনুভূতিগুলো যেন ধীরে ধীরে ভেঙে বেরিয়ে আসছিল।

সে হঠাৎ বুঝতে পারল—ভালোবাসা লুকিয়ে রাখতে রাখতে মানুষ কখনো কখনো পুরো জীবনটাই হারিয়ে ফেলে।

রাত গভীর হলে হাসপাতাল আরও নির্জন হয়ে গেল।

দূরে কোথাও মেশিনের শব্দ হচ্ছিল ক্ষীণভাবে।

নিহারিকা খুব ধীরে বলল,
— “জানো, আমি মাঝে মাঝে ভাবতামৃ তুমি হয়তো আর আমাকে মনে রাখোনি।”

কুদ্দুসের বুক কেঁপে উঠল।

সে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর প্রথমবারের মতো নিজের সমস্ত নীরবতা ভেঙে খুব আস্তে বলল—

— “তুমি দূরে ছিলে, কিন্তু কোনোদিন আমার বাইরে ছিলে না।”

কথাটা বলেই সে চোখ নামিয়ে নিল।

এত সহজ একটি স্বীকারোক্তি।

তবুও এই কয়েকটি শব্দ বলতে তার কত বছর লেগে গেল।

নিহারিকার চোখ ভিজে উঠল ধীরে ধীরে।

সে কিছু বলল না।

শুধু হাত বাড়িয়ে খুব আলতো করে কুদ্দুসের হাত ছুঁয়ে দিল।

সেই স্পর্শে বহু বছরের দূরত্ব যেন ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছিল।

কুদ্দুস তখন অনুভব করছিল, ভালোবাসা আসলে কখনো হারায় না।

শুধু মানুষ ভয় পায়।

প্রত্যাখ্যানের ভয়।

হারিয়ে ফেলার ভয়।

সময় বদলে যাওয়ার ভয়।

আর সেই ভয়েই অনেক সত্য কথা বলা হয় না।

কিন্তু জীবন খুব অনিশ্চিত।

কখন কোন বিকেল শেষ বিকেল হয়ে যায়, কেউ জানে না।

রাতের শেষ প্রহরে বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল।

জানালার বাইরে আকাশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছিল।

নিহারিকা আধো ঘুমে চোখ বন্ধ করে ছিল। তার হাত এখনও কুদ্দুসের হাতের ওপর রাখা।

কুদ্দুস চুপচাপ বসে ছিল।

তার মনে হচ্ছিল, এতদিন পরে হয়তো তারা সত্যিই একে অপরের কাছে ফিরতে শুরু করেছে।

কিছু ভালোবাসা দীর্ঘ অপেক্ষার পর আরও গভীর হয়ে ওঠে।

কারণ সেই ভালোবাসার ভেতরে শুধু অনুভূতি থাকে না—থাকে সময়, স্মৃতি, হারানোর ভয়, আর ফিরে পাওয়ার নিঃশব্দ আকাঙ্ক্ষা।

চলবেৃৃ.........