ঢাকা, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ০৭:২৬:২২ PM

রাজনীতি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি,কিন্তু এখন ?

মান্নান মারুফ
25-04-2026 05:27:56 PM
রাজনীতি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি,কিন্তু এখন ?

রাজনীতি কোনো অপরাধ নয়—বরং এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি। তবে সেই রাজনীতি যখন শালীনতা হারায়, তখন তা সমাজের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতির চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভাষার অবক্ষয়, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং অশালীনতার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। এই প্রবণতা শুধু রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং নতুন প্রজন্মের মানসিক গঠনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরেই দেশের ছাত্ররাজনীতির আতুরঘর হিসেবে পরিচিত। এখান থেকেই বহু জাতীয় নেতা উঠে এসেছেন, যারা পরবর্তীতে দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে ডাকসু (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) একটি ঐতিহাসিক ও প্রভাবশালী প্ল্যাটফর্ম। অনেকের কাছে ডাকসু মানেই যেন পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব। তবে বাস্তবতা হলো, ডাকসু একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক রাজনৈতিক কাঠামোর একমাত্র নির্ধারক নয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করছেন। কিছু ছাত্রনেতাকে জাতীয় নেতার মর্যাদায় উপস্থাপন করার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এতে করে ছাত্ররাজনীতির স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।

একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক সহাবস্থান বজায় রাখত। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পাশাপাশি বাংলাদেশ ছাত্রদল সক্রিয় ছিল এবং তারা নিজেদের কর্মসূচি পালন করত। এমনকি ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিনিধিরাও একসঙ্গে সহাবস্থান করত, যা ছাত্ররাজনীতির একটি বড় শক্তি ছিল।

কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। রাজনৈতিক বক্তব্যে শালীনতার অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। নেতাদের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার এমনকি নারীদের নিয়েও কটূক্তি করা হচ্ছে, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতির মারাত্মক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়। এটি শুধু প্রতিপক্ষকে ছোট করার কৌশল নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন। যখন রাজনীতির মঞ্চে অশ্লীল ভাষা ব্যবহৃত হয়, তখন তা সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে এবং সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, উসকানিমূলক বক্তব্যের পরও প্রতিপক্ষ সংঘর্ষে না গিয়ে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। এটিকে কেউ কেউ দুর্বলতা হিসেবে দেখলেও, অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি পরিণত রাজনৈতিক আচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ সহিংসতা এড়িয়ে যুক্তি ও সংযমের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিচায়ক।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে একটি বড় সমস্যা হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব। একসময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেও ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হতো না। কিন্তু এখন সেই সীমারেখা ভেঙে গেছে। এর ফলে রাজনীতি হয়ে উঠছে ক্রমেই অশোভন এবং অগ্রহণযোগ্য।

এই পরিস্থিতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে তরুণ প্রজন্মের ওপর। তারা যখন দেখে যে রাজনীতিতে সফল হতে হলে অশালীন ভাষা ও আচরণ গ্রহণ করতে হয়, তখন তাদের মূল্যবোধে নেতিবাচক পরিবর্তন আসে। ফলে সমাজে সহনশীলতা কমে যায় এবং বিভাজন বাড়ে।

এছাড়া, রাজনীতির এই অবক্ষয় গণতান্ত্রিক চর্চার জন্যও হুমকি। কারণ গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, যুক্তি এবং পারস্পরিক সম্মান। যখন রাজনৈতিক ভাষা অশালীন হয়ে ওঠে, তখন তা ভিন্নমতকে দমন করার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়।

সমাজ ও পরিবেশে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ২০ বছর আগের ধ্যান-ধারণা এখন অনেকটাই অচল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে আমরা ডিজিটাল যুগে বসবাস করছি। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা আগের সময়ের তুলনায় অনেক ভিন্নভাবে চিন্তা করে এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে অভ্যস্ত।

এখন রাজনীতিতেও মেধার প্রতিযোগিতা অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সন্ত্রাস বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে কোনো সংগঠন গড়ে তোলা বা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে গেছে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের কর্মপদ্ধতি ও আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে।

দলের পক্ষে জনসমর্থন বাড়ানো বা নতুন কর্মী সংগ্রহের ক্ষেত্রেও এখন মেধা ও যোগ্যতার বিকল্প নেই। যার যত বেশি জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রজ্ঞা রয়েছে, সে তত বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর আত্মসমালোচনা এবং শুদ্ধাচারের প্রতি প্রতিশ্রুতি। ছাত্ররাজনীতিকে পুনরায় একটি গঠনমূলক ও শিক্ষণীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে শালীনতা, সহনশীলতা এবং যুক্তির চর্চা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি, কারণ এখান থেকেই ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তৈরি হয়।

পরিশেষে বলা যায়, রাজনীতি একটি মহৎ পেশা হতে পারে, যদি তা নৈতিকতা ও শালীনতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও, সচেতনতা ও দায়িত্বশীল উদ্যোগের মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। রাজনৈতিক নেতাদের সংযত আচরণ এবং শিক্ষার্থীদের সচেতন অংশগ্রহণই পারে একটি সুস্থ ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে।