কুদ্দুস আর হিমুর পরিচয়টা খুব সাধারণভাবেই হয়েছিল। একই কলেজে পড়তো তারা। প্রথম দিনেই চোখে পড়ার মতো কিছু ছিল না—না কোনো নাটকীয়তা, না কোনো বিশেষ ঘটনা। তবে সময়ের সাথে সাথে তাদের মধ্যে একটা অদৃশ্য সেতু তৈরি হতে থাকে। হিমু ছিল শান্ত স্বভাবের, একটু অন্তর্মুখী। অন্যদিকে কুদ্দুস ছিল সহজ-সরল, হাসিখুশি আর সবার সঙ্গে মিশে যেতে পারা এক মানুষ। ক্লাসের ফাঁকে, লাইব্রেরিতে, কিংবা ক্যাম্পাসের পুরনো গাছটার নিচে বসে তারা গল্প করতো। প্রথমে নোট শেয়ার করা, তারপর পড়ার চাপ নিয়ে কথা, ধীরে ধীরে সেই কথাগুলো জীবনের গল্পে গড়ায়।
বন্ধুত্বটা ছিল খুব নির্ভেজাল।
কোনো প্রত্যাশা ছিল না, কোনো হিসাব ছিল না।
একদিন বৃষ্টির বিকেলে, হিমু ভিজতে ভিজতে এসে দাঁড়িয়েছিল কুদ্দুসের সামনে। কুদ্দুস নিজের ছাতাটা এগিয়ে দিয়েছিল। সেই ছোট্ট ঘটনাটা যেন তাদের সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। হিমু প্রথমবারের মতো বুঝতে পারে—কুদ্দুস তার কাছে শুধু বন্ধু নয়।
কিন্তু সে কিছু বলেনি।
সময়ের সাথে সাথে কুদ্দুসও অনুভব করতে শুরু করলো, হিমুকে ছাড়া তার দিনটা অসম্পূর্ণ লাগে। কোনো কারণ ছাড়াই হিমুর হাসিটা তার মনে গেঁথে থাকতো। হিমুর দুঃখ হলে তার ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে যেত।
একদিন সাহস করে কুদ্দুস বলেই ফেললো,
— “হিমু, তুই শুধু আমার বন্ধু না... আমি তোকে অন্যভাবে ভাবি।”
হিমু চুপ করে ছিল। কিছুক্ষণ পর নিচু গলায় বলেছিল,
— “আমি জানতাম, একদিন তুই এটা বলবি।”
সেদিন থেকেই তাদের বন্ধুত্ব প্রেমে রূপ নেয়।
প্রথম প্রেমের দিনগুলো ছিল খুব সুন্দর। ছোট ছোট ব্যাপারেই আনন্দ খুঁজে পেত তারা। একসাথে চা খাওয়া, রাস্তা ধরে হাঁটা, একে অপরকে ছোট ছোট চিঠি লেখা—সবকিছুতেই ছিল এক অদ্ভুত মাধুর্য।
কিন্তু বাস্তবতা কখনো গল্পের মতো সহজ হয় না।
কুদ্দুসের পরিবার ছিল রক্ষণশীল। অন্যদিকে হিমুর পরিবারও ছিল বেশ কঠোর। তাদের সম্পর্কের কথা কেউ জানতো না। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করা, ফোনে কথা বলা—এসবের মধ্যেই চলছিল তাদের ভালোবাসা।
ধীরে ধীরে চাপ বাড়তে থাকে।
কুদ্দুস চাকরির জন্য শহর ছাড়তে বাধ্য হয়। দূরত্ব তখন শুধু জায়গার নয়, সময়েরও হয়ে দাঁড়ায়। আগের মতো কথা হয় না, দেখা হয় না। ভুল বোঝাবুঝি শুরু হয়।
একদিন রাতে ফোনে তর্ক হয় তাদের মধ্যে।
— “তুই বদলে গেছিস, কুদ্দুস।”
— “আমি বদলাইনি, পরিস্থিতি বদলেছে।”
— “পরিস্থিতি তো আগে থেকেই ছিল!”
— “কিন্তু তখন তুই ছিলি পাশে…”
এই ছোট ছোট কথাগুলোই ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠে।
একসময় সেই দিনটা এলো, যেদিন তারা বুঝলো—সবকিছু আগের মতো নেই।
হিমু বলেছিল,
— “আমরা কি আবার বন্ধু হয়ে থাকতে পারি?”
কুদ্দুস কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেছিল,
— “বন্ধুত্ব থেকে প্রেম হতে পারে,
কিন্তু ভাঙা প্রেম থেকে আর বন্ধুত্ব হয় না।”
হিমুর চোখে পানি চলে এসেছিল।
কুদ্দুস আবার বললো,
— “কারণ সেখানে থাকে অসমাপ্ত অনুভূতি,
না বলা কষ্ট আর অদৃশ্য দূরত্ব।”
সেদিন তারা শেষবারের মতো দেখা করেছিল। কোনো নাটকীয়তা ছিল না, কোনো চিৎকার ছিল না। শুধু এক ধরনের নীরবতা ছিল, যা হাজারটা কথার থেকেও বেশি ভারী।
সময় কেটে যায়।
কুদ্দুস তার জীবনে এগিয়ে যায়। নতুন শহর, নতুন মানুষ, নতুন ব্যস্ততা। কিন্তু মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙে গেলে হিমুর কথা মনে পড়ে।
অন্যদিকে হিমুও চেষ্টা করে সব ভুলে যেতে। পরিবার তাকে বিয়ে দিতে চায়। সে রাজি হয়, কিন্তু মনটা কোথাও আটকে থাকে।
একদিন হিমু পুরনো ডায়েরি খুলে দেখে। সেখানে কুদ্দুসের লেখা একটা লাইন—
“তুই না থাকলে আমি অসম্পূর্ণ।”
হিমু বুঝতে পারে, কিছু সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও তাদের অনুভূতি কখনো পুরোপুরি মরে না।
যেমন জীবিত মানুষকে বাঁচাতে ওষুধ কাজ করে,
মৃত্যুর পর তা আর কোনো কাজে লাগে না।
তেমনি “বন্ধু হয়ে থাকি” কথাটা
ভাঙা সম্পর্কের পরে শুধু এক ধরনের সান্ত্বনা।
বছর দুই পর একদিন হঠাৎ তাদের দেখা হয়ে যায়।
একটা বইমেলায়।
কুদ্দুস দাঁড়িয়ে ছিল একটা স্টলের সামনে। হিমু পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। চোখাচোখি হতেই দুজনেই থেমে যায়।
— “কেমন আছিস?”
— “ভালো… তুই?”
সাধারণ কথাবার্তা। কিন্তু ভেতরে জমে থাকা অনুভূতিগুলো তখনো অমলিন।
কুদ্দুস বললো,
— “আমরা কি সত্যিই বন্ধু হতে পারতাম?”
হিমু হালকা হেসে বললো,
— “না… পারতাম না।”
— “কেন?”
— “কারণ তুই এখনো আমার কাছে শুধু বন্ধু না।”
কুদ্দুস কিছু বললো না। শুধু তাকিয়ে রইলো।
সেদিন তারা আবার আলাদা হয়ে গেল।
কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই, কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই।
শুধু একটা সত্য মেনে নিয়ে—
কিছু সম্পর্কের শেষ মানে শেষ নয়,
কিন্তু সেই সম্পর্ককে নতুন নামে ডাকা সম্ভব নয়।
দূরত্ব শুধু মাইল দিয়ে মাপা যায় না।
কিছু দূরত্ব থাকে মনে—
যেখানে মানুষ কাছাকাছি থেকেও অনেক দূরে।
কুদ্দুস আর হিমুর গল্পটা ঠিক তেমনই।
বন্ধুত্ব থেকে শুরু, প্রেমে রূপ,
আর শেষে এক অদৃশ্য দূরত্বে হারিয়ে যাওয়া।
শেষ পর্যন্ত তারা দুজনেই বেঁচে ছিল,
নিজ নিজ জীবনে।
কিন্তু তাদের ভেতরে কোথাও একটা গল্প অসমাপ্তই রয়ে গেল।
সমাপ্ত।।