ঢাকা, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬,
সময়: ১২:২৭:২৭ AM

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে

মান্নান মারুফ
23-05-2026 08:22:27 PM
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে

দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। একই সঙ্গে হাম ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকিতে এ পর্যন্ত ৫০০-এর বেশি মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শিশুধর্ষণ, নির্যাতনের পর হত্যা এবং বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা সমাজে নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে তুলছে। মানবাধিকার সংগঠন, নারী অধিকারকর্মী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বিচারহীনতা, সামাজিক অবক্ষয়, মাদকের বিস্তার এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণেই পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়ায় অনেক অপরাধী সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। এর ফলে সমাজে এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যা নতুন অপরাধ সংঘটনে উৎসাহ জোগাচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, বিচার না পাওয়ার কারণেই অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে এবং ভয়ভীতি ছাড়াই অপরাধ করে যাচ্ছে।

বিশেষ করে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অপরাধ অনেকাংশে কমে আসতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তাঁদের মতে, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে সমাজে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে। একই সঙ্গে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে অপরাধ প্রবণতা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ মনে করছেন, দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। অনেকের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যুর পরিবর্তে অন্য খাতে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়ার কারণে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। ফলে অপরাধীরা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে এবং সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

এ ছাড়া ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের পর পুলিশ বাহিনীর ভেতরে এক ধরনের ভয় ও অনিশ্চয়তা কাজ করছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত ভূমিকা নিয়েও অনেকে আতঙ্কে রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে এখনো কিছু গোপন চক্র সক্রিয় থেকে পূর্ববর্তী সরকারের প্রভাব কাজে লাগিয়ে নানামুখী ষড়যন্ত্র ও অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কার, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি এবং জনআস্থা পুনর্গঠন অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে একটি কার্যকর, স্বাধীন ও আধুনিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা বাড়ছে। অনেকে মনে করছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি নতুন ও বিশেষায়িত বাহিনী গঠন বা বিদ্যমান বাহিনী পুনর্গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ যেন সাংবিধানিক কাঠামো, মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার মধ্যে থেকে পরিচালিত হয়, সে বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নারী ও শিশু নির্যাতনের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর মাসে ১৮১ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হন। ডিসেম্বর মাসে এ সংখ্যা সামান্য কমলেও ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে আবারও ১৮৩ জন করে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। মার্চ মাসে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯০ জনে এবং এপ্রিল মাসে তা সর্বোচ্চ ২২০ জনে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে নির্যাতনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানেও একই ধরনের উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ১ হাজার ১৮১টি। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে এপ্রিল মাসে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ১১টিতে। অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এ ধরনের অপরাধ। পুলিশের তথ্যমতে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ঢাকা রেঞ্জ, যেখানে এপ্রিল মাসেই ৩৭৫টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং অপরাধী চক্রের সক্রিয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতি মাসে ধর্ষণের গড় সংখ্যা ছিল ৩০ থেকে ৪৫-এর মধ্যে। কিন্তু মার্চ মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ এবং এপ্রিল মাসে ৫৮-এ পৌঁছায়। শুধু এপ্রিল মাসেই ১৭ জন নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ধর্ষণের চেষ্টার ঘটনাও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, সামাজিক নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ায় নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে শিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ১৯৯টি। এর মধ্যে ৯৪টি ছিল ধর্ষণের ঘটনা। একই সময়ে ১১৫টি শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১১ জন শিশুকে। এসব ঘটনায় জনমনে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের প্রতি এ ধরনের বর্বরতা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়েরই বহিঃপ্রকাশ।

সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত বিচার এবং কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। ফলে একই ধরনের অপরাধ বারবার ঘটছে। নারীমুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত বলেন, “অপরাধের সুষ্ঠু বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বিচারহীনতা সমাজে অপরাধ প্রবণতাকে উৎসাহিত করছে।” তিনি আরও বলেন, মাদক বিস্তার, বেকারত্ব এবং সামাজিক অবক্ষয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফাওজিয়া মোসলেম মনে করেন, সমাজে সহিংসতা ও অপরাধপ্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। তাঁর ভাষায়, “ক্ষমতার অপব্যবহার, সাংস্কৃতিক চর্চার অভাব এবং শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা সমাজকে অস্থির করে তুলছে।” তিনি বলেন, দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা না গেলে নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ আরও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নৈতিক শিক্ষা জোরদারের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে অপরাধ সংঘটনের ধরনও পরিবর্তিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, মাদক চক্রের বিস্তার, কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা মামলা করতে ভয় পান বা বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। ফলে অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে।

সাধারণ মানুষের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা বাড়ানো, অপরাধ তদন্তে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। সামাজিক মূল্যবোধের পুনর্গঠন, তরুণদের কর্মসংস্থান, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির মাধ্যমেও অপরাধ প্রবণতা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয়।

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ক্রমবর্ধমান ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার অবনতির ইঙ্গিতই নয়, বরং সমাজের গভীর সংকটের প্রতিফলন। যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সরকার ও প্রশাসন দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।