ঢাকা, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬,
সময়: ১২:৪৭:০০ AM

দিল্লির বৈঠকে আওয়ামী লীগের নতুন কৌশল

মান্নান মারুফ
22-05-2026 09:36:47 PM
দিল্লির বৈঠকে আওয়ামী লীগের নতুন কৌশল

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা নিয়ে। সম্প্রতি ভারতের দিল্লিতে অনুষ্ঠিত একটি গোপন বৈঠককে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে, বৈঠকে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলটির সাবেক ছয়জন মন্ত্রী এবং একজন সিনিয়র নেতা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে দলের ভবিষ্যৎ কৌশল, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং বিশেষ করে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময় ও প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সূত্র অনুযায়ী, বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে আগামী ডিসেম্বর থেকে মার্চের মধ্যেই শেখ হাসিনা দেশে ফেরার চেষ্টা করবেন। যদিও তাঁর ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ কিংবা যাতায়াতের পথ এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে দলের অভ্যন্তরে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া এক নেতার বরাত দিয়ে জানা যায়, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে রাজধানী ঢাকায় ঐদিন বিশাল জনসমাগম ঘটানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, অন্তত এক কোটি মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মহল্লায় মহল্লায় কাজ চলছে । যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সংখ্যা বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তবে দলীয় নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যেই কয়েক হাজার “ক্যাডার” প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যারা সম্ভাব্য বাধা মোকাবিলায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে বলে উল্লেখ করেছেন। বৈঠকে নাকি এমনও আলোচনা হয়েছে যে, কোনো রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্রীয় বাহিনী বাধা দিলে তার “জবাব” দেওয়ার কৌশলও প্রস্তুত রাখা হবে। যদিও এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

দলের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করতে শেখ হাসিনার সরাসরি উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে আওয়ামী লীগের একটি অংশ। তাদের ধারণা, শেখ হাসিনা দেশে না থাকায় মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা বড় ধরনের কর্মসূচি পালনে সাহস পাচ্ছেন না।

বিশেষ করে বর্তমান সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রেপ্তার ও মামলার ভয় কাজ করছে। ফলে মাঠে সক্রিয়তা কমে গেছে। আওয়ামীলীগের অনেক নেতা-কর্মী বিগত বছরগুলোতে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছেন এবং তারা এখন অকারণে ঝুঁকি নিতে অনাগ্রহী বলেও দলীয় সূত্রের ভাষ্য।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পর একটি দলের সাংগঠনিক শক্তি অনেকাংশে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সেই বাস্তবতায় শেখ হাসিনার অনুপস্থিতি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সূত্র আরও জানায়, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সহজ করতে বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক লবিং চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে প্রবাসী সমর্থক এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে দলটি নিজেদের পক্ষে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছেন।

একই সঙ্গে দেশের ভেতরেও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সক্রিয় করা হচ্ছে। সাংগঠনিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা নেতাদের আবার মাঠে নামানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট বৈঠক, যোগাযোগ রক্ষা এবং সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের কাজ নীরবে এগিয়ে চলছে বলে জানাযায়।

প্রতিবেদনের সূত্রগুলো দাবি করছে, একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার নেতাকর্মী ভিন্ন কৌশলে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। যদিও ওই সম্প্রদায়ের নাম প্রকাশ করা হয়নি। তাদের দায়িত্ব মূলত সাংগঠনিক যোগাযোগ রক্ষা, কর্মী সমাবেশ নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক সহায়তা সমন্বয় করা।

এছাড়া নগর আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা বর্তমানে প্রকাশ্যে নীরব থাকলেও আড়ালে অর্থ ও সাংগঠনিক সহায়তা দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তারা সরাসরি মাঠে না থাকলেও দলের পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখছেন বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে কী অবস্থান নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সরকার বিষয়টিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে দেখছে। কারণ শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বড় ধরনের সমাবেশ বা রাজনৈতিক শোডাউনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সময় রাজধানী ঢাকায় বড় ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি, সরকারপন্থী গোষ্ঠী এবং আওয়ামী লীগের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকার রাজনৈতিক পরিবেশ অতীতেও বহুবার সংঘাতময় পরিস্থিতির সাক্ষী হয়েছে। ফলে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সকল পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও সহিংসতা বা সংঘাত কোনো পক্ষের জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না দেশটির জন্য।

সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতি এখন এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার গুঞ্জন যেমন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করছে, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করছে।

তবে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল, সরকারের অবস্থান এবং দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। এখন পর্যন্ত সবকিছুই মূলত বিভিন্ন সূত্র ও রাজনৈতিক গুঞ্জনের ওপর নির্ভরশীল। তাই বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।