ঢাকা, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬,
সময়: ০৭:৫৭:৩৩ PM

ইডিসি প্রকল্পে ১৫৫ কোটির আর্থিক অনিয়ম

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
29-07-2026 04:22:44 PM
ইডিসি প্রকল্পে ১৫৫ কোটির  আর্থিক অনিয়ম

চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে কোনো মালামাল সরবরাহ না করেই ‘ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন (ইডিসি)’ প্রকল্পে ৯২ কোটি ২৬ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া রাউটার ক্রয়ে অতিরিক্ত ব্যয়, আসবাবপত্র কেনা, আউটসোর্সিং জনবল, পরামর্শক নিয়োগ এবং অন্যান্য খাতে অনিয়ম মিলিয়ে প্রকল্পে ১৫৫ কোটিরও বেশি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে অপটিক্যাল ফাইবার কেবল ক্রয়কে প্রকল্পের সবচেয়ে বড় আর্থিক অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আইএমইডির মতে, যথাযথ নথিপত্র যাচাই ছাড়াই বিপুল অঙ্কের অর্থ ছাড় করা হয়েছে, যা সরকারি আর্থিক শৃঙ্খলার গুরুতর লঙ্ঘন।

দেশের তৃণমূল পর্যায়ে উচ্চগতির ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দিতে ৫ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ইডিসি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ২০২১ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজের ধীরগতির কারণে মেয়াদ ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তবে চার বছর অতিক্রম করেও চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ১৮ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় প্রকল্পের মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্প ব্যয় ৫ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ২ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাবও রয়েছে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন প্যাকেজে একই ধরনের রাউটার ভিন্ন ভিন্ন দামে ক্রয় করায় সরকারের ২৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বাজারদরের তুলনায় বেশি দামে রাউটার কেনা এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) বরাদ্দ না থাকলেও অফিস সংস্কারের নামে ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকার চুক্তি করে আসবাবপত্র কেনা হয়েছে। নির্ধারিত হারের বেশি অফিস ভাড়া দেওয়ায় সরকারের আরও ১৮ লাখ ১৭ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্যাচ কর্ড ক্রয়ে অতিরিক্ত পরিমাণ দেখিয়ে ৭ কোটি ২৯ লাখ টাকার অনিয়মিত চুক্তি করা হয়েছে। আউটসোর্সিং জনবলের দায়িত্ব নির্ধারণ ছাড়াই ১২ কোটি ২২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা পরিশোধ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে আরও ১১ কোটি ৬৭ লাখ ৫৮ হাজার ৩৩৭ টাকা ব্যয়ের অভিযোগও উঠে এসেছে। ত্রৈমাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন ছাড়াই স্থানীয় পরামর্শকদের ৩ কোটি ৮ লাখ টাকা এবং পিপিআর-২০০৮ লঙ্ঘন করে ব্যক্তিগত পরামর্শক নিয়োগে ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কাগজে-কলমে প্রায় ৫৫ হাজার প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। জরিপে অংশ নেওয়া ৫০ দশমিক ৫২ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তাদের ইন্টারনেট সংযোগ নিয়মিত বিচ্ছিন্ন থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সংযোগ দেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যেই তা অকার্যকর হয়ে পড়ে। চুক্তি অনুযায়ী ২০ এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক স্থানে গতি শূন্য এমবিপিএস পর্যন্ত নেমে আসে।

মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করা তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জামের মান ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে আইএমইডি। অনেক প্রতিষ্ঠানে সরঞ্জাম স্থাপনের এক মাসের মধ্যেই ত্রুটি দেখা দিলেও সময়মতো মেরামত করা হয়নি। পাশাপাশি ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ডিজিটাল সেবা ব্যাহত হচ্ছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত ইউপিএস বা বিদ্যুৎ ব্যাকআপ ব্যবস্থাও নেই।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ক্রয় ব্যবস্থায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনে গড়ে ৩৪ হাজার ৩২৬ টাকা ব্যয় হয়েছে, যা বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি। উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতার অভাবে কারিগরি ত্রুটি দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া নির্মিত কিছু আইসিটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেও নিম্নমানের কাজের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়েছে। গত চার বছরে তিনবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা হয়েছে। অনুমোদিত ৬৪৪টি পদের মধ্যে ৬১টি গুরুত্বপূর্ণ পদ এখনো শূন্য রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও ৭১ জনের পরিবর্তে মাত্র সাতজন সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগ পাওয়ায় প্রকল্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তদারকি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছে আইএমইডি।

তবে প্রকল্প পরিচালক তানজিনা ইসলাম এসব অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ৬৪ জেলার মধ্যে মাত্র দুটি জেলার ছয়টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের ভিত্তিতে অডিট আপত্তি উত্থাপন করা হয়েছে। যেসব স্থানে চার কোরের পরিবর্তে দুই কোর অপটিক্যাল ফাইবার কেবল ব্যবহার করা হয়েছিল, সেগুলো পরবর্তীতে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে এবং অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলছে। রাউটারের ভিন্ন দামের বিষয়ে তিনি বলেন, উন্মুক্ত দরপত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন মূল্য প্রস্তাব দিলেও মোট ব্যয় অনুমোদিত প্রাক্কলনের মধ্যেই ছিল, ফলে সরকারের কোনো আর্থিক ক্ষতি হয়নি। আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগও নির্ধারিত নিয়মে হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়ে তার বক্তব্য, অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহক প্রতিষ্ঠান ব্যান্ডউইথের বিল পরিশোধ না করায় সেবা ব্যাহত হয়েছে। আর সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার অভিযোগের ক্ষেত্রে তিনি বলেন, ওয়ারেন্টি সময়ের মধ্যে আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন করেছে এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।