বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর সরকারের নতুন মন্ত্রিসভা ঘোষণাকে ঘিরে দলের ভেতরে এক ধরনের নীরব অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। প্রকাশ্যে খুব বেশি কেউ মুখ খুলতে না চাইলেও তৃণমূলের একাংশ নেতাকর্মীর মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের ভার যাঁরা কাঁধে বহন করেছেন, সরকার গঠনের পর তাঁদের অনেকেই উপেক্ষিত রয়ে গেছেন। ক্ষমতায় ফেরার অল্প সময়ের মধ্যেই এই হতাশা দৃশ্যমান হয়ে ওঠায় দলীয় অঙ্গনে আলোচনা বাড়ছে। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ভাষ্য, গত ১৫ বছর নানা নির্দেশনা মেনে তাঁরা রাজপথে থেকেছেন। পুলিশের মারধর, মামলা-হামলা, গ্রেপ্তার আতঙ্ক সত্ত্বেও সভা-সমাবেশে উপস্থিত থেকেছেন। অনেকেই দিনের পর দিন বাড়ির বাইরে থেকেছেন, পরিবার-পরিজন থেকে দূরে কাটিয়েছেন সময়। সেই কঠিন সময়ে যাঁদের নির্দেশে তাঁরা আন্দোলনে ছিলেন, তাঁদের অনেকেই আজ কাঙ্ক্ষিত দায়িত্ব বা গুরুত্বপূর্ণ পদ না পাওয়ায় তৃণমূলের কর্মীরা হতাশ।
দলের মাঠপর্যায়ের পরিচিত মুখ নাদিম বলেন, “গত ১৫ বছর যারা মামলা, হামলা আর নির্যাতন সহ্য করেছেন, দিনের পর দিন বাড়ির বাইরে থেকেছেন, ব্যবসা হারিয়েছেন—তাঁদেরই আজ ছিটকে পড়তে দেখা যাচ্ছে। আমরা ভেবেছিলাম ত্যাগীদের মূল্যায়ন হবে।” তাঁর ভাষায়, অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, অন্তত দলীয়ভাবে তাঁদের আত্মত্যাগ স্মরণ রাখা হবে। কিন্তু মন্ত্রিসভা ঘোষণার পর সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলেই মনে করছেন তাঁরা।
তৃণমূলের অভিযোগ আরও গভীর। শত শত মামলার আসামি হয়ে যাঁরা বছরের পর বছর পালিয়ে বেড়িয়েছেন, পুলিশের ভয়ে বাসায় রাত কাটাতে পারেননি, যাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রতিপক্ষের দখলে চলে গেছে—ক্ষমতায় আসার পর তাঁদের পুনর্বাসন বা মর্যাদা দেওয়ার স্পষ্ট কোনো উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। এমনকি আন্দোলনে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সরকার গঠনের পর কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
দলের ভেতরে আলোচনায় বারবার উঠে আসছে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম—যাঁরা দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় ছিলেন এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মির্জা আব্বাস, গয়েস্বর চন্দ্র রায়, ড. মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সেলিমা রহমান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, শামসুজ্জামান দুদু, জয়নাল আবেদীন ফারুক, রুহুল কবির রিজভী, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবিবুন নবী খান সোহেল এবং রুহুল কুদ্দুছ তালুকদার দুলু। রুহুল কবির রিজভীর অবদান সীমাহীন। তার কঠোর পরিশ্রম ও ত্যাগের কারনে দলটি দু:সময়ে দাড়িয়েছিল। তৃণমূলের অনেকেই মনে করেন, এঁদের অনেকে সরাসরি মন্ত্রিসভায় না থাকলেও অন্তত গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেতে পারতেন। তাঁদের যুক্তি, এসব নেতার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও আস্থার জায়গা রয়েছে।
একজন জেলা পর্যায়ের নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দল যখন কঠিন সময়ে ছিল, তখন মাঠে যারা ছিলেন, তারা জানেন কারা ত্যাগ করেছেন। এখন যদি সেই নেতারাই ভালো পদে না যান, তাহলে মাঠের কর্মীদের জন্যও কিছু করতে পারবেন না।” তাঁর মতে, ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে সরে গেলে নির্যাতিত কর্মীদের পুনর্বাসন, মামলা মোকাবিলায় সহায়তা বা আর্থিক সহযোগিতা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়বে।
আরেকজন উপজেলা পর্যায়ের কর্মী বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম ক্ষমতায় এলে অন্তত যারা জেল খেটেছে, মামলা মাথায় নিয়ে ঘুরেছে, তাদের একটা তালিকা করে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু এখনো তেমন কিছু চোখে পড়ছে না।” তাঁর অভিযোগ, অনেক কর্মী আজও অর্থকষ্টে রয়েছেন; কেউ কেউ রোজার মাসেও পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
তবে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি নন। তাঁদের কেউ কেউ মনে করেন, সরকার গঠনের ক্ষেত্রে দলীয় ভারসাম্য, জোট-রাজনীতি, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও নানা কৌশলগত বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। সব ত্যাগী নেতাকে একসঙ্গে মন্ত্রিসভায় নেওয়া সম্ভব নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁদের মূল্যায়ন করা হতে পারে বলেও কেউ কেউ ইঙ্গিত দিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের পর ক্ষমতায় এলে প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। বিশেষ করে যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের প্রত্যাশা আরও বেশি থাকে। ক্ষমতায় ফেরার পর দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ না এলে তৃণমূলের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবে এ ধরনের অসন্তোষ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তা সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও ঐক্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের আরও মত, আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে সরকার পরিচালনায় রূপান্তর একটি জটিল প্রক্রিয়া। এখানে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে কেবল ত্যাগের ভিত্তিতে পদবণ্টন সব সময় সম্ভব হয় না। কিন্তু একই সঙ্গে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখা দলীয় নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
দলের ভেতরের এই নীরব ক্ষোভ কতটা বিস্তৃত এবং নেতৃত্ব তা কীভাবে সামাল দেয়—সেটিই এখন দেখার বিষয়। তৃণমূলের প্রত্যাশা, আত্মত্যাগ ও নির্যাতনের ইতিহাস বিবেচনায় নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য মূল্যায়ন কাঠামো তৈরি করা হবে। নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের তালিকা প্রণয়ন, মামলা মোকাবিলায় সহায়তা, আর্থিক পুনর্বাসন এবং রাজনৈতিক মর্যাদা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হলে অনেকাংশেই এই হতাশা কমে আসতে পারে।
অন্যদিকে দলীয় নেতৃত্ব যদি দ্রুত কার্যকর বার্তা দিতে পারে যে ত্যাগীদের মূল্যায়ন ধাপে ধাপে করা হবে, তাহলে মাঠপর্যায়ের আস্থা পুনর্গঠিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ শেষ পর্যন্ত যেকোনো রাজনৈতিক দলের শক্তির মূল ভিত্তি তৃণমূলের কর্মীরাই। তাঁদের মনোবল ও আস্থাই দলকে টিকিয়ে রাখে কঠিন সময়েও।
ক্ষমতার প্রথম পর্বেই যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো—ত্যাগ ও নেতৃত্বের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে। বিএনপির সামনে এখন শুধু সরকার পরিচালনার নয়, নিজেদের সাংগঠনিক প্রত্যাশা সামাল দেওয়ারও বড় পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় নেতৃত্ব কতটা সফল হয়, সেটিই আগামী দিনের রাজনীতিতে দলটির অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।