ঢাকা, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৩:৪৩:২২ AM

ডিবি পরিচয়ে যাত্রাবাড়ীতে নানা অভিযোগ

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
06-10-2026 11:47:08 AM
ডিবি পরিচয়ে যাত্রাবাড়ীতে নানা অভিযোগ

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানাধীন বিভিন্ন আবাসিক হোটেলকে কেন্দ্র করে নারী পাচার, মাদক কারবার, জিম্মি করে রাখা ও নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধ পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। স্থানীয় বাসিন্দা ও কয়েকজন ভুক্তভোগীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী পরিচয় ব্যবহার করে যাত্রাবাড়ীর একাধিক আবাসিক হোটেলে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি।

অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার প্রভাব দেখাতে সাজ্জাদ নিজেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্য হিসেবে পরিচয় দিতেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ডিবির পরিচয় ব্যবহার করে তিনি যাত্রাবাড়ী এলাকার কয়েকটি আবাসিক হোটেলের ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন ধরনের অবৈধ লেনদেন এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করতেন।

অনুসন্ধানে হোটেল প্রজাপতি, হোটেল প্রাইম, হোটেল স্বাগতম, হোটেল রংধনু, হোটেল প্যারাডাইস, হোটেল হেভেন, হোটেল প্যালেস, হোটেল মুন, হোটেল রোজভিউ ও ফেইস ইনসহ বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেলের ব্যবস্থাপনা ও মালিকানার সঙ্গে সাজ্জাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব হোটেলে চাকরি ও বিভিন্ন ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে অসহায় নারীদের জিম্মি করে অনৈতিক কাজে বাধ্য করার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।

যাত্রাবাড়ীর এক ভুক্তভোগী নারী জানান, পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে গার্মেন্টসে কাজের সন্ধানে গিয়ে সাজ্জাদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে কৌশলে তাঁকে যাত্রাবাড়ীর একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে প্রায় তিন মাস আটকে রাখা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ সময় তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয় বলেও দাবি করেন ওই নারী। একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে সেখান থেকে পালিয়ে যান তিনি। পরে নিরাপত্তার জন্য সৌদি আরবে চলে যান বলে জানান ভুক্তভোগী।

সেলিম নামে আরেক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, সাজ্জাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে তাঁর জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ওই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে সাজ্জাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে প্রায় এক বছর আগে তিনি যাত্রাবাড়ী থানায় যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে অভিযোগ করার আগেই থানা থেকে সাজ্জাদকে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয় বলে তাঁর দাবি। এরপর ওই রাতেই মাছের আড়ত এলাকা থেকে তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন সেলিম। পরে তিন দিন আটকে রেখে অনাহারে রাখা এবং শারীরিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগও করেন তিনি।

স্থানীয়দের দাবি, সাজ্জাদ একা নন; যাত্রাবাড়ীর কয়েকটি আবাসিক হোটেলকেন্দ্রিক কথিত অবৈধ ব্যবসার নেপথ্যে আল-আমিন, তারামিয়া ও গণিসহ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়ানো কিংবা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট হোটেলগুলো থেকে প্রতি মাসে থানা পুলিশকে মোটা অঙ্কের ‘মাসোহারা’ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলো তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তার ভুয়া পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধির ১৭০ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। একইভাবে মানব পাচার, জিম্মি করে রাখা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। বেআইনিভাবে আটক ও মারধরের অভিযোগও তদন্তসাপেক্ষে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় বিচারযোগ্য হতে পারে।

এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, সংশ্লিষ্ট আবাসিক হোটেলগুলোর ট্রেড লাইসেন্স, মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নথি, সিসিটিভি ফুটেজ এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা উদঘাটন সম্ভব হতে পারে।

তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অভিযুক্ত সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ কিংবা অন্য অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের ওপরই এখন নির্ভর করছে বিষয়টির পরবর্তী অগ্রগতি।