চার্জশিটভুক্ত আসামিকে স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর প্রধানের দায়িত্ব
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি মো. নাছির উদ্দিনকে স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। ওষুধ, সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি ও প্যাথলজি সামগ্রী কেনাকাটায় ১ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে দুদক।
মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগ দেওয়া হলেও নাছির উদ্দিনের যোগদান নিয়ে আপত্তি তুলেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত ৬ সেপ্টেম্বর তিনি কর্মস্থলে যোগদানের জন্য পত্র জমা দিলেও প্রায় এক মাসেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়নি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ইমতিয়াজ হোসেনের স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে গত ২ সেপ্টেম্বর নাছির উদ্দিনকে স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে তিনি ছয় বছরের বেশি সময় ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হিসেবে ছিলেন এবং রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ে সংযুক্ত ছিলেন।
দুর্নীতির মামলায় চার্জশিটভুক্ত একজন কর্মকর্তাকে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) তিনি বলেন, ‘বিষয়টি জানা ছিল না। কেন এমন ঘটনা ঘটল, কীভাবে ঘটল, আজই ব্যবস্থা নেব।’
মামলার অভিযোগ
দুদকের চার্জশিট অনুযায়ী, নাছির উদ্দিন ২০১৯ সালে সিনিয়র স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সামগ্রী কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সার্জিক্যাল আইটেম ও ইকুইপমেন্ট এবং প্যাথলজিক্যাল আইটেম কেনার ক্ষেত্রে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। এতে সরকারের ১ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়।
ঘটনার পর দুদক ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ পৃথকভাবে অনুসন্ধান শুরু করে। প্রায় পাঁচ বছর তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ১১ জুলাই নাছির উদ্দিনসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক।
এর আগে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অনুসন্ধানেও তাঁর সম্পৃক্ততার কথা উঠে আসে। ২০২০ সালের ২৭ জুলাই স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর উপপ্রধান ও প্রোগ্রাম ম্যানেজারের পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে ওএসডি করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুদকের সহকারী পরিচালক আতাউর রহমান সরকার বলেন, মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচারপ্রক্রিয়া চলমান থাকায় আইনি প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগছে। তাঁর ভাষ্য, চার্জশিটভুক্ত হওয়ার পর সাধারণ প্রশাসনিক চর্চা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে নাছির উদ্দিনের দাবি, চার্জশিটে তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। তিনি আদালতে অব্যাহতির আবেদন করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি কোনো কেনাকাটা বা টেন্ডার কমিটির সদস্য ছিলেন না; অনুপস্থিত সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি হিসেবে কেবল একটি স্বাক্ষর করেছিলেন। তিনি আরও বলেন, তাঁকে বরখাস্ত করা হয়নি, তাই পদে থাকার ক্ষেত্রে আইনগত বাধা নেই।
যোগদান নিয়ে জটিলতা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দীন মোহাম্মদ রুমী বলেন, নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়মের বিষয়গুলো অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। তাই তাঁর যোগদানপত্র এখনো গ্রহণ করা হয়নি। দুদকের নথি হাতে পাওয়ার পর বিষয়টি পর্যালোচনা করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, নিয়োগ প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষরকারী উপসচিব ইমতিয়াজ হোসেন বলেন, তাঁদের কাছে তথ্য ছিল নাছির উদ্দিন ওই মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তথ্যের ঘাটতি থাকলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বাস্থ্যসচিব ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদও বিষয়টি আগে জানতেন না বলে জানান। তিনি বলেন, খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নাছির উদ্দিন বর্তমানে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করেন। তাঁর দাবি, ১ কোটি ৭ লাখ টাকা মূল্যের ফ্ল্যাটটি ১০ বছরের কিস্তিতে কিনেছেন। এর অর্থের উৎস হিসেবে তিনি পৈতৃক জমি বিক্রি, ব্যাংকঋণ ও অগ্রিম প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে পাওয়া অর্থের কথা জানিয়েছেন।