বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ, তীব্র মূলধন সংকট ও হাজার হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতিতে ধুঁকছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। ঋণ কেলেঙ্কারি ও আর্থিক সংকটে যখন ব্যাংকটি আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষা দিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখনই কর্মকর্তাদের বোনাস ও লাঞ্চ সাবসিডির নামে ব্যাংকের কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে কর্মকর্তাদের উৎসাহ ও উৎসব বোনাস হিসেবে দেওয়া হয়েছে ১৫৩ কোটি ৪৭ লাখ ৫৪ হাজার ৯৫৪ টাকা। একই সঙ্গে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে কর্মকর্তাদের লাঞ্চ সাবসিডি বাবদ ব্যয় করা হয়েছে আরও ১১৩ কোটি ২ লাখ ৭৮ হাজার ৩৫৭ টাকা। সব মিলিয়ে বোনাস ও লাঞ্চ সুবিধার নামে কর্মকর্তাদের পেছনে ব্যয় হয়েছে ২৬৬ কোটি ৫০ লাখ ৩৩ হাজার ৩১১ টাকা।
সম্প্রতি মহাহিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয়ের বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর জনতা ব্যাংকের ২০২৩ ও ২০২৪ সালের কার্যক্রম নিরীক্ষা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং ‘চাকরি (ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান) (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ-২০১৫’ উপেক্ষা করেই এসব আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
ভুয়া মুনাফায় ১৫৩ কোটি টাকার বোনাস
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মূল বেতনের ৩ দশমিক ৭৫ গুণ হারে উৎসাহ ও উৎসব বোনাস দেওয়া হয়। এ জন্য ব্যাংকের তহবিল থেকে ব্যয় হয় ১৫৩ কোটি ৪৭ লাখ ৫৪ হাজার ৯৫৪ টাকা।
অথচ ওই সময়ে ব্যাংকটির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা ছিল নাজুক। নিরীক্ষিত হিসাবে ২০২৩ সালে ব্যাংকের ২১ হাজার ১৮১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন থাকলেও সংরক্ষণ করা হয় মাত্র ৫ হাজার ৮৩৫ কোটি ৪ লাখ টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৩৪৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এই ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকটি কাগজে-কলমে ৫৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা মুনাফা দেখিয়ে বোনাস দেয়।
এ ছাড়া, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে উৎসাহ বোনাস পেতে চূড়ান্ত মূল্যায়নে ন্যূনতম ৫০ স্কোর প্রয়োজন। জনতা ব্যাংকের স্কোর ছিল মাত্র ৩৫। ফলে কর্মকর্তাদের বোনাস দেওয়ার সুযোগ ছিল না বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরীক্ষা দল বোনাসের অর্থকে বেআইনি ও অনাদায়ি আর্থিক ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তা আদায় করে ব্যাংকের কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে।
সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে ১১৩ কোটি টাকার লাঞ্চ
অন্যদিকে, ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৪০৬তম সভায় ২য় থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের প্রতিদিন ২০০ টাকা হারে লাঞ্চ সাবসিডি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে এ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বছরের পর বছর কর্মকর্তাদের এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
তবে ‘চাকরি (ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান) (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ-২০১৫’-এর ২০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা মাসিক ২০০ টাকা টিফিন ভাতা পাওয়ার যোগ্য। ২য় থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য দৈনিক ভিত্তিতে লাঞ্চ সাবসিডি দেওয়ার কোনো বিধান নেই।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদ বা ব্যাংকের কোনো প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ সরকারি আইন ও আদেশের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা অনুমোদন করতে পারে না। ফলে ১১৩ কোটি ২ লাখ ৭৮ হাজার ৩৫৭ টাকা লাঞ্চ সাবসিডি হিসেবে ব্যয় করাকে বেআইনি ও অপব্যয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সংকট আরও গভীর
জনতা ব্যাংকের আর্থিক সংকটের অন্যতম কারণ খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি। ২০২৫ সালের জুনে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৭২ হাজার ১০৭ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭২ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের জুনে খেলাপি ঋণ ছাড়িয়েছে ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। এর প্রায় ৮০ শতাংশই শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে আটকে রয়েছে।
২০২৫ সালের নিরীক্ষিত হিসাবে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ছিল ৫৫ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। একই সময়ে নিট লোকসান হয়েছে ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের জুনে মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
অডিট আপত্তির বিষয়ে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমান বলেন, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিয়েই বোনাস ও লাঞ্চ সাবসিডি দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে এবং অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেও এর প্রচলন আছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রভিশন ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে বোনাস ও লাঞ্চ সাবসিডি দেওয়া হয়েছে, তার জবাব জনতা ব্যাংকই ভালো দিতে পারবে। অডিট আপত্তির বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকেই সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, প্রভিশন ঘাটতি থাকলে বোনাস দেওয়ার সুযোগ নেই। আগের মতো এখন আর এভাবে ইনসেনটিভ দেওয়া হয় না এবং ভবিষ্যতে যাতে অনিয়ম না হয়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি নিয়ম ভঙ্গ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তাদের এভাবে বোনাস ও ভাতা দেওয়া ক্ষমতার অপব্যবহার ও জনগণের অর্থের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। তার মতে, অনিয়মের সঙ্গে জড়িত পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং অর্থ গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।