ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬,
সময়: ০৪:৩৯:১৬ PM

বেনামে বন্ড ব্যবসা: অভিযোগের মুখে এনবিআর সদস্য

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
01-10-2026 10:13:46 AM
বেনামে বন্ড ব্যবসা: অভিযোগের মুখে এনবিআর সদস্য

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে বেনামে বন্ড প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, বন্ড সুবিধায় পণ্য আমদানি এবং রাজস্ব ফাঁকির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে তাঁর প্রভাব ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পণ্য ছাড়করণে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। এ বিষয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ফারুক হোসেন। এর আগে ২৪ জুন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডেও একই ধরনের অভিযোগ করা হয়। ওই অভিযোগের ট্র্যাকিং নম্বর ১৩০৮৯৪১০৯০০০০৪। অভিযোগটির বর্তমান অবস্থা হিসেবে ‘মতামতের জন্য প্রেরিত’ উল্লেখ রয়েছে।

দুদকে দেওয়া অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত মেসার্স ইউএজিএম বিডি লিমিটেড নামের একটি বন্ড প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে মোয়াজ্জেম হোসেনের বেনামি ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা তথ্যের বাইরে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এনবিআরের ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখের একটি পত্রের পরও কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ) থেকে ইউএজিএম বিডি লিমিটেডকে পিভিসি ফ্লেক্স আমদানির প্রাপ্যতা দেওয়া হয়। পণ্যটির এইচএস কোড হিসেবে ৩৯২১.৯০.৯৯ উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় বন্ড কমিশনারেটের তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার কামরুল এবং ডেপুটি কমিশনার ব্যারিস্টার পূরবীর বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন অভিযোগকারী।

অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, ইউএজিএম বিডি লিমিটেডের কার্যক্রম নিয়ে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সন্দেহ তৈরি হলে প্রতিষ্ঠানটিতে একটি প্রিভেন্টিভ টিম পাঠানো হয়। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, টিম সেখানে গিয়ে মেশিনারিজসহ প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রম বন্ধ অবস্থায় দেখতে পায়। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রায় ৯০ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির একটি মামলার খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির এক প্রতিনিধি কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই ব্যক্তির বক্তব্যের বরাত দিয়ে অভিযোগকারী দাবি করেছেন, ইউএজিএম বিডি লিমিটেড প্রকৃতপক্ষে মোয়াজ্জেম হোসেনের প্রতিষ্ঠান এবং তিনি এটি বেনামে পরিচালনা করেন। তবে এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মাধ্যমে ইউএজিএম বিডি লিমিটেডের পিভিসি ফ্লেক্সের কয়েকটি চালান বন্ড সুবিধায় ছাড় করানোর অভিযোগও করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মোজাম্মেল নামের এক ব্যক্তিকে মোয়াজ্জেম হোসেনের খালাতো ভাই হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে অভিযোগে।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের প্রশাসন শাখার রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফের বিরুদ্ধেও প্রতিষ্ঠানটির পণ্য চালান ছাড়করণে ভূমিকা রাখার অভিযোগ করেছেন ফারুক হোসেন। অভিযোগকারীর দাবি, ওই কর্মকর্তা নিজে গেটে অবস্থান করে কয়েকটি চালান ছাড় করিয়ে দেন এবং তিনি মোয়াজ্জেম হোসেনের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত। তবে এসব দাবির সমর্থনে অভিযোগপত্রে স্বাধীন বা যাচাইকৃত প্রমাণের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগে ১৮ জুন ২০২৬ তারিখের ঈ১০৯৯২৯৬ নম্বর বিল অব এন্ট্রির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সংশ্লিষ্ট শাখা ওই বিল অব এন্ট্রি লক করে। পরে লক বহাল থাকবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

ফারুক হোসেনের অভিযোগ, মোয়াজ্জেম হোসেন বন্ড ও প্রশাসন-সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকার সময় চারটি বন্ড লাইসেন্স বেনামে নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বন্ড সুবিধায় পণ্য আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রির মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এ কাজে বর্তমানে সিআইসির যুগ্ম কমিশনার হিসেবে উল্লেখ করা কামরুল সহায়তা করেছেন বলেও অভিযোগকারীর দাবি।

এনবিআরের ওয়েবসাইটে মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে বর্তমানে সদস্য (মূসক নিরীক্ষা) হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর আগে তিনি সদস্য (কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঘিরে এর আগেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগসংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত তদন্তের ফলাফল বা আদালতের রায় প্রকাশ্যে পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি।

দুদকে দেওয়া সর্বশেষ অভিযোগে ফারুক হোসেন মোয়াজ্জেম হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বন্ড লাইসেন্স, আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত নথি, বিল অব এন্ট্রি, পণ্য ছাড়ের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।

এ বিষয়ে মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের বক্তব্য অভিযোগপত্রে পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর অবস্থানও প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।