ঢাকা, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬,
সময়: ০১:২৫:২৭ PM

লক্ষীপুরের চার হত্যার,উপন্যাস”শেষ আলো”

মান্নান মারুফ
27-06-2026 11:54:35 AM
লক্ষীপুরের চার হত্যার,উপন্যাস”শেষ আলো”

পর্ব-৭ 
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নিভে আসছিল।

আকাশে মেঘ জমেছে। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ। কিন্তু রিফাতের কাছে পৃথিবীর সব ঋতু যেন একসঙ্গে থেমে গেছে।

সে বসে আছে হাসপাতালের করিডোরে।

চারদিকে মানুষের চলাফেরা, পুলিশের আনাগোনা, আত্মীয়-স্বজনের কান্না—সবকিছুই যেন দূরের কোনো শব্দ। তার কানে কিছুই স্পষ্ট পৌঁছাচ্ছে না।

তার সামনে একটি লোহার বেঞ্চ।

সেই বেঞ্চেই বসে আছে সে, দু'হাত জড়িয়ে।

মনে হচ্ছে, তার বুকের ভেতর কেউ সমস্ত শব্দ, সমস্ত অনুভূতি, সমস্ত আলো নিঃশেষ করে দিয়েছে।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা এসে তার পাশে বসলেন।

নরম গলায় বললেন,

— "তোমার নাম রিফাত?"

সে মাথা নাড়ল।

— "তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলতে হবে।"

রিফাত কোনো উত্তর দিল না।

তিনি আবার বললেন,

— "আজ সকালে তুমি কখন বাড়ি থেকে বের হয়েছিলে?"

রিফাত অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— "আটটার একটু পরে।"

— "বাড়িতে কারা ছিল?"

রিফাত ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।

প্রতিটি মুখ ভেসে উঠল।

মা।

রিমি।

নীলা।

মুনা।

তার গলা কেঁপে উঠল।

— "সবাই..."

শব্দটা বলেই সে থেমে গেল।

এরপর আর কিছু বলতে পারল না।

সন্ধ্যার আগেই চারজনের জানাজার প্রস্তুতি শুরু হলো।

এলাকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এল।

যে বাড়িতে প্রতিদিন হাসির শব্দ শোনা যেত, সেই বাড়ির সামনে আজ শুধু মানুষের দীর্ঘশ্বাস।

রবিন মাথা নিচু করে বসে ছিল।

তার বারবার মনে পড়ছিল শাহানা আপার কথা।

"লোকটা বারবার আমাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে..."

তিনি যদি সেদিন বিষয়টাকে গুরুত্ব দিতেন!

এই অপরাধবোধ তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।

রিফাতকে কেউ কাঁদতে দেখল না।

তার চোখ শুকিয়ে গেছে।

অনেক সময় মানুষের দুঃখ এত বড় হয় যে, চোখের জলও বেরোতে পারে না।

সে শুধু সবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

মানুষজন এসে তাকে জড়িয়ে ধরে।

কেউ বলে,

— "ধৈর্য ধরো।"

কেউ বলে,

— "আল্লাহ শক্তি দিন।"

সে শুধু মাথা নাড়ে।

কিন্তু মনে মনে ভাবতে থাকে—

"শক্তি দিয়ে কী হবে?"

যাদের জন্য সে বাঁচত, তারা তো আর নেই।

রাতে প্রথমবার সে তাদের খালি বাড়িতে ঢুকল।

পুলিশের আনুষ্ঠানিক কাজ শেষ হয়েছে।

প্রতিবেশীরা ঘরটা গুছিয়ে দিয়েছে।

দরজার চৌকাঠে পা রাখতেই তার বুকটা কেঁপে উঠল।

এই তো সেই ঘর।

যেখান থেকে সকালে বেরিয়েছিল।

কিন্তু ঘরটা আর আগের মতো নেই।

এক ধরনের নীরবতা পুরো ঘরটাকে ঢেকে রেখেছে।

মায়ের সেলাই মেশিনটা কোণায় রাখা।

সুঁইয়ের সঙ্গে আধা সেলাই করা একটা জামা এখনও ঝুলছে।

মনে হচ্ছে, একটু পরেই মা এসে বসবেন।

বলবেন,

— "রিফাত, একটু পানি এনে দে তো।"

কিন্তু কেউ এল না।

রিমির পড়ার টেবিলে বই খোলা।

একটি খাতার পাতায় লেখা—

"পরের ক্লাসে পড়াতে হবে।"

রিফাত খাতাটা হাতে তুলে নিল।

তার মনে পড়ল—

আপু বলেছিল, "আজ নতুন ছাত্র আসবে।"

সে চুপচাপ খাতাটা বুকের সঙ্গে চেপে ধরল।

নীলার টেবিলে গণিতের খাতা।

শেষ অঙ্কটি অসমাপ্ত।

কালো কালি দিয়ে লেখা—

"সমাধান..."

তারপর ফাঁকা।

রিফাতের মনে হলো, শুধু অঙ্কটাই নয়—

তাদের পুরো জীবনটাই যেন অসমাপ্ত থেকে গেল।

মুনার ছোট্ট বিছানায় তার পুতুলটা পড়ে আছে।

একপাশে রঙ পেন্সিল।

আর সেই আঁকা ছবিটা।

একটি বাড়ি।

পাঁচজন মানুষ।

উপরে লেখা—

"আমাদের পরিবার"

রিফাত আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।

সে ছবিটা বুকে জড়িয়ে বসে পড়ল।

প্রথমবার তার বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এল।

সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

"মুনা...

তুই তো বলেছিলি, বড় হয়ে ডাক্তার হবি...

কোথায় গেলি?"

খালি ঘরের দেয়াল তার কান্না ফিরিয়ে দিল।

কিন্তু কোনো উত্তর এল না।

রাতে ঘুম এল না।

বারবার মনে হচ্ছিল, রান্নাঘরে মা হাঁটছেন।

মনে হচ্ছিল, রিমি বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে।

নীলা হয়তো ডাকছে,

— "ভাইয়া, এই অঙ্কটা বুঝিয়ে দাও।"

মুনা হয়তো বলছে,

— "চকলেট এনেছ?"

রিফাত উঠে দাঁড়াল।

ঘরের এক কোণ থেকে আরেক কোণে হাঁটল।

কোথাও কেউ নেই।

শুধু নীরবতা।

রাত প্রায় দুইটা।

বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ পড়ছে।

ঠিক এমনই এক বৃষ্টির রাতে বাবা চলে গিয়েছিলেন।

আজ আবার বৃষ্টি।

কিন্তু এবার পুরো পরিবারটাই চলে গেল।

সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল।

মনে মনে বলল,

"আব্বু...

তুমি তো বলেছিলে, আমাদের দেখে রাখবে।

মাকে একা রেখে গিয়েছিলে।

এখন সবাইকে নিয়ে গেলে কেন?"

বাতাস ছাড়া কেউ উত্তর দিল না।

পরদিন সকালে বাড়িতে মানুষ আসা শুরু করল।

কেউ খাবার নিয়ে এসেছে।

কেউ টাকা দিল।

কেউ বলল,

— "কোনো দরকার হলে বলো।"

রিফাত সবাইকে ধন্যবাদ দিল।

কিন্তু তার মনে হচ্ছিল—

এই পৃথিবীর সব সাহায্য একসঙ্গে দিলেও কি একজন মাকে ফিরিয়ে আনা যায়?

একটি বোনের হাসি?

একটি ছোট্ট শিশুর স্বপ্ন?

রহমান সাহেব, যাঁর দোকানে রিফাত কাজ করত, এসে তার পাশে বসলেন।

অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

— "তুই কাজে ফিরতে তাড়া করিস না।"

রিফাত শান্ত গলায় বলল,

— "কাজ না করলে খাব কী?"

রহমান সাহেবের চোখ ভিজে উঠল।

— "এখন তুই একা নস। আমরা আছি।"

রিফাত মাথা নিচু করে রইল।

তার মনে হলো—

মানুষ পাশে দাঁড়াতে পারে।

কিন্তু শূন্যতা ভাগ করে নিতে পারে না।

বিকেলে পুলিশ আবার এল।

তদন্ত এগোচ্ছে।

সন্দেহভাজন ব্যক্তির অতীত খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রতিবেশীদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

রিফাতকে কিছু কাগজে সই করতে হলো।

সবকিছু যেন যন্ত্রের মতো করছিল সে।

কোনো অনুভূতি নেই।

শুধু কাজ।

সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ চলে গেল।

ঘর অন্ধকার।

রিফাত একটি মোমবাতি জ্বালাল।

মোমের আলোয় পুরো ঘরটা কেমন অপরিচিত লাগছিল।

হঠাৎ তার চোখ পড়ল মায়ের সেলাই মেশিনের পাশে রাখা একটি ছোট্ট টিনের বাক্সে।

এটা সে আগে খেয়াল করেনি।

বাক্সটার ওপর ধুলো জমে আছে।

মনে হলো, বহুদিন কেউ খোলেনি।

সে ধীরে ধীরে বাক্সটা তুলে নিল।

ভেতরে কী আছে?

মায়ের জমিয়ে রাখা টাকা?

নাকি পুরোনো কোনো স্মৃতি?

কাঁপা হাতে ঢাকনাটা খুলতে গিয়ে সে থেমে গেল।

তার বুকের ভেতর আবার সেই অদ্ভুত ধুকপুকানি শুরু হলো।

কারণ সে বুঝতে পারছিল না—

এই ছোট্ট বাক্সের ভেতরে কী এমন আছে, যা হয়তো তার মায়ের না-বলা জীবনের শেষ গল্পটি তাকে শুনিয়ে দেবে।

মোমের আলো নিঃশব্দে কাঁপছিল।

আর রিফাত ধীরে ধীরে বাক্সটির ঢাকনা তুলতে হাত বাড়াল...

চলবে.....