ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬,
সময়: ১২:০৩:০৫ AM

দুদু বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক পথিক

মান্নান মারুফ
24-06-2026 09:05:29 PM
দুদু বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক পথিক

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা নেতাদের মধ্যে অন্যতম নাম শামসুজ্জামান দুদু। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত তার রাজনৈতিক যাত্রা বিস্তৃত। প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন।

রাজনীতিকে ব্যক্তিগত লাভ বা ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং আদর্শ ও সংগঠনের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে দেখেন শামসুজ্জামান দুদু। তার ঘনিষ্ঠজনদের মতে, ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতিকে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা উত্থান-পতন, প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও তিনি দলীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন।

রাজধানীর পল্টনের একটি রাজনৈতিক কার্যালয়ে প্রায় প্রতিদিনই দেখা মেলে এই প্রবীণ রাজনীতিকের। সকাল থেকেই সেখানে জড়ো হন বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল এবং বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। শুধু রাজনৈতিক কর্মীরাই নন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাধারণ মানুষও নানা সমস্যার কথা নিয়ে তার কাছে আসেন। কেউ আর্থিক সংকটে, কেউ পারিবারিক সমস্যায়, আবার কেউ রাজনৈতিক বা সামাজিক জটিলতায় সহায়তা প্রত্যাশা করেন।

দুদু মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শোনেন এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার চেষ্টা করেন। অনেক ক্ষেত্রে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহায়তাও প্রদান করেন বলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান। তার রাজনৈতিক কার্যালয় অনেকের কাছে যেন পরামর্শকেন্দ্র ও সহায়তার একটি নির্ভরযোগ্য স্থান হয়ে উঠেছে।

শামসুজ্জামান দুদুর রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শিক্ষাঙ্গন হিসেবে পরিচিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে তিনি নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের সুযোগ পান। ১৯৮৫ ও ১৯৮৬ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় ছাত্ররাজনীতিতে তার সক্রিয় ভূমিকা তাকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি এনে দেয়।

ছাত্রদলের নেতৃত্বে থাকার সময় তিনি সংগঠন সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় এবং দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীকালে ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করে বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। একই সঙ্গে বিএনপির কৃষিবিষয়ক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে দলীয় সূত্রগুলো উল্লেখ করে।

পরবর্তীকালে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-এর উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন শামসুজ্জামান দুদু। এ দায়িত্বে থেকে তিনি দলীয় নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কৌশল প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন।

নির্বাচনী রাজনীতিতেও রয়েছে তার উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। যদিও সেই নির্বাচন দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলো বর্জন করেছিল এবং নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, তবুও তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

একই বছরের জুন মাসে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে বিজয়ী হয়ে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এভাবে টানা দুইবার জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করে তিনি নিজ এলাকার উন্নয়ন এবং জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলের মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন রাজনীতিক নন, বরং দীর্ঘদিনের পরিচিত জননেতা হিসেবেও পরিচিত। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতে, জাতীয় পর্যায়ের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নিজ এলাকার মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। এলাকার সামাজিক, রাজনৈতিক ও উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততা আজও অব্যাহত রয়েছে।

বর্তমানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে শামসুজ্জামান দুদু দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং নীতিগত আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতন্ত্র, নির্বাচন এবং জনগণের অধিকার সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে তিনি নিয়মিত বক্তব্য দিয়ে থাকেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তিনি বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে বিবেচিত।

দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে বিএনপিকে আরও শক্তিশালী ও সংগঠিত করার লক্ষ্যে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, সাংগঠনিক পরামর্শ প্রদান এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির মাধ্যমে তিনি নতুন প্রজন্মের নেতাদেরও অনুপ্রাণিত করছেন।

রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় শামসুজ্জামান দুদু নিজেকে একজন সংগঠক, সংসদ সদস্য, নীতিনির্ধারক এবং জনসম্পৃক্ত রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিবর্তিত বাস্তবতার মধ্যেও তিনি দলীয় আদর্শ ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের প্রতি অবিচল রয়েছেন। তার ঘনিষ্ঠজনদের ভাষায়, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি বিএনপির পতাকার তলে থেকেই দেশের রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখতে চান।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসা রাজনীতিকদের মধ্যে শামসুজ্জামান দুদুর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং কর্মীদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তাকে বিএনপির রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে।