ঢাকা, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬,
সময়: ১০:২৫:২১ PM

ভারত-চীন প্রশ্নে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক:কৌশলগত না ফাঁদ?

মান্নান মারুফ
15-06-2026 08:13:01 PM
ভারত-চীন প্রশ্নে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক:কৌশলগত না ফাঁদ?

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে ভারত ও চীনকে কেন্দ্র করে নতুন এক বিতর্কের জন্ম হয়েছে। একদিকে একটি পক্ষের দাবি, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও বাস্তবমুখী করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে আরেক পক্ষ মনে করছে, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির অতিরঞ্জিত ভারতবিরোধী অবস্থান এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করছে, যা শেষ পর্যন্ত ভারতের অভ্যন্তরীণ হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকেই শক্তিশালী করতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে জুলাই অভ্যুত্থানকে বিতর্কিত করার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা কেবল একটি রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; বরং ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্মকাণ্ডকে আংশিকভাবে বৈধতা দেওয়ার একটি সুসংগঠিত প্রচেষ্টাও হতে পারে। একই সঙ্গে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ‘ভারতপন্থী’ আখ্যা দিয়ে যে রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, তাতে ভারতের প্রভাব কমার পরিবর্তে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে পলাশবাড়ীতে মন্দির নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিতর্ক, ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে মন্দিরের পক্ষে ও বিপক্ষে মিছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হিন্দুত্ববাদ ও হিন্দুত্ববিরোধী প্রচারণা এবং জামায়াত-এনসিপির প্রকাশ্য ভারতবিরোধী বক্তব্য নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপি সরকারকে ‘ভারতপন্থী’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে বিএনপির প্রকৃত রাজনৈতিক অবস্থান কী, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারীর মতে, কৌশলগত বিচারে বিএনপি বর্তমানে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দেন, “আমার দেশের জনগণ যদি চায়, তাহলে সুসম্পর্ক থাকবে।” এই বক্তব্যের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিহিত রয়েছে। অর্থাৎ, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে, কোনো ধরনের নতজানু কূটনীতির মাধ্যমে নয়।

ড. বেপারীর মতে, তিস্তার পানিবণ্টন ইস্যুতে সরকারের অবস্থান এই নীতির বাস্তব প্রতিফলন। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান পূর্বেই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা কোনো করুণা নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনে বাংলাদেশের অধিকার। প্রয়োজনে জাতিসংঘেও যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। সরকারে আসার পরও সেই অবস্থান থেকে সরে না গিয়ে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে কারিগরি পর্যায়ে কাজ অব্যাহত রয়েছে। তাঁর মতে, এটি দুর্বলতার নয়, বরং দর-কষাকষিনির্ভর কূটনীতির উদাহরণ।

তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়া, আওয়ামী লীগের সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তিস্তা প্রকল্প অব্যাহত রাখা প্রমাণ করে যে বিএনপি সরকার ভারতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে না। যদি ভারতের সঙ্গে একতরফা সমঝোতার লক্ষ্য থাকত, তাহলে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার মতো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো না।

তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী দল ও সরকারের ভূমিকার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। বিরোধী অবস্থানে থেকে যে ধরনের বক্তব্য দেওয়া সম্ভব, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকলে তা সবসময় সম্ভব হয় না। সেই বিবেচনায় বিএনপি সরকার চীন ও ভারতের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের বিষয়টিও বিশ্লেষকদের নজরে এসেছে। জানা গেছে, বেইজিংয়ের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য চীন সফরের প্রস্তুতি চলছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক রীতি ভেঙে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফরের জন্য ভারত নয়, চীনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিকে অনেকেই একটি তাৎপর্যপূর্ণ কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখছেন।

অন্যদিকে, কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, জামায়াত ও এনসিপির তীব্র ভারতবিরোধী বক্তব্য অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ভারতের হিন্দুত্ববাদী শক্তির জন্য রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটি আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সম্পর্কিত বিভিন্ন অভিযোগ ও বিতর্ক ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে এই বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত নন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সরদার ফরিদ আহমদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের ভারতবিরোধী মনোভাবের কারণে ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে—এমন দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাঁর মতে, শেখ হাসিনা ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ক্ষমতায় ছিলেন, আর ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসে ২০১৪ সালে। ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থানকে বিজেপির উত্থানের প্রধান কারণ হিসেবে দেখার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

তিনি আরও বলেন, ভারতের আধিপত্যবাদী নীতি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের সমালোচনা করলেই বিজেপি শক্তিশালী হবে—এ ধরনের বক্তব্যের পেছনে অন্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তাঁর মতে, ভারতবিরোধী অবস্থানকে অযৌক্তিকভাবে দায়ী করার প্রবণতা বাস্তব সমস্যাগুলোকে আড়াল করে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, বিএনপির তুলনায় জামায়াত-এনসিপি অধিক মাত্রায় ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক বক্তব্য সামনে আনছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয়তাবাদী পরিচয়ে সংগঠিত বিএনপির ভোটব্যাংকের একটি অংশ ধীরে ধীরে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির দিকে আকৃষ্ট হতে পারে। এই পরিবর্তন বিএনপির জন্য দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক ড. রাশেদ আলম ভূঁইয়া বলেন, জনমনে একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে যে বিএনপির রাজনীতি ভারতের প্রভাবাধীন হয়ে পড়েছে। এই ধারণা সত্য হোক বা না হোক, তা দলের সমর্থকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের কিছু মন্ত্রীকে ঘিরে জনঅসন্তোষও দেখা যাচ্ছে। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে জামায়াত রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

ড. রাশেদের মতে, বর্তমানে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হচ্ছে, তা ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি ওই অভ্যুত্থান জনমানসে বিতর্কিত হয়ে ওঠে, তাহলে আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে পুনরায় রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা অর্জন করতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভারতবিরোধী ভোটব্যাংক জামায়াত-এনসিপির দিকে ঝুঁকতে পারে এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আওয়ামী লীগ বনাম জামায়াত-এনসিপি জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তখন বিএনপি রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, অতীতের বিতর্কিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কিছু অংশ পুনরায় ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করছে বলে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা বিএনপির জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। দলের ভেতরে এবং সরকারের বিভিন্ন স্তরে কাদের ওপর আস্থা রাখা হবে, সে বিষয়ে সতর্ক না হলে দল ভেতর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মো. ইমরান আহম্মেদের মতে, বিএনপি কিংবা জামায়াত-এনসিপি কোনো রাজনৈতিক ফাঁদে পড়ছে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময় এখনও আসেনি। তবে তিনি মনে করেন, জনগণ এখন রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে কার্যকর শাসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চায়।

তাঁর মতে, বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের আদর্শিক অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক বজায় রাখা। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের চেতনা, জাতীয় স্বার্থ এবং সুশাসনের প্রতিশ্রুতির মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হবে। অন্যথায় যে সংশয় ও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, তা আরও গভীর হবে এবং সেই সুযোগ কাজে লাগাবে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তিগুলো।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে ভারত-চীন প্রশ্ন, জাতীয়তাবাদ, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের উত্তরাধিকার—সবকিছু মিলিয়ে একটি জটিল সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এই সমীকরণে কে লাভবান হবে এবং কে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল, জনসম্পৃক্ততা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের বাস্তব সাফল্যের ওপর।