ঢাকা, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬,
সময়: ০৩:২০:২৩ PM

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্টিল সাইলো ,তদন্তে মিলেছে অনিয়ম

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
14-06-2026 12:57:13 PM
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্টিল সাইলো ,তদন্তে মিলেছে অনিয়ম

বিশ্বব্যাংকের ঋণের অর্থে বাস্তবায়নাধীন ‘মডার্ন ফুড স্টোরেজ ফ্যাসিলিটিজ প্রজেক্ট’-এর আওতায় সাতটি আধুনিক স্টিল সাইলো নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, বিলম্ব ও আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। ২০১৪ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৯১৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ছয় বছর মেয়াদি প্রকল্পটি ২০২০ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এক দশকের বেশি সময় পার হওয়ার পরও নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ হয়নি। এদিকে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৬০ কোটি ৮৯ লাখ টাকায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে ব্যর্থ হলেও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং দফায় দফায় প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

তদন্তে উঠে এসেছে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের অভিযোগ

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. মনির হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি সম্প্রতি চট্টগ্রাম ও আশুগঞ্জ স্টিল সাইলো প্রকল্পের নির্মাণ বিলম্বের কারণ অনুসন্ধান করে। গত ৮ এপ্রিল জমা দেওয়া প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম সাইলো প্রকল্পে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে আসে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রাম সাইলোর কাজের বিপরীতে ঠিকাদারকে চুক্তিমূল্যের তুলনায় প্রায় ৪৩ লাখ ৪৮ হাজার মার্কিন ডলার অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫২ কোটি ১৮ লাখ ৬৫ হাজার টাকার সমপরিমাণ। তদন্ত কমিটি এ ঘটনাকে “গুরুতর আর্থিক অনিয়ম” হিসেবে উল্লেখ করে এবং বর্তমান প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে।

একই সঙ্গে কমিটি সুপারিশ করেছে যে, প্রকল্পে আরও কোনো আর্থিক অসঙ্গতি রয়েছে কি না তা যাচাইয়ের জন্য পৃথক একটি বিস্তারিত তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।

আশুগঞ্জ সাইলোর কাজ অর্ধেকও শেষ হয়নি

তদন্ত প্রতিবেদনে আশুগঞ্জ সাইলোর চিত্রও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রকল্পের কাজ অর্ধেকেরও কম সম্পন্ন হয়েছে। অথচ ঠিকাদারকে চুক্তিমূল্যের প্রায় ৭৮ শতাংশ অর্থ ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে।

প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অসমাপ্ত এই স্থাপনাটি সরকারের জন্য নতুন সমস্যার সৃষ্টি করেছে। তদন্তে আরও জানা যায়, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কাজ সম্পন্নে অপারগতার কথাও জানিয়েছে।

মহেশ্বরপাশা সাইলোতে ভেরিয়েশন নিয়ে প্রশ্ন

এর আগে খুলনার মহেশ্বরপাশা সাইলোর ভেরিয়েশন সংক্রান্ত অনিয়ম খতিয়ে দেখতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. ইয়াসীনের নেতৃত্বে একটি চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর জমা দেওয়া প্রতিবেদনে কমিটি একাধিক প্রশ্ন ও অসঙ্গতির বিষয় তুলে ধরে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, টেন্ডারবহির্ভূত কাজগুলো প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয়ের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ থাকলেও তা না করে ভেরিয়েশনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যা যৌক্তিক বলে প্রতীয়মান হয়নি। এছাড়া অনুমোদনের আগে ঠিকাদার কীভাবে কাজ সম্পন্ন করল, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার সুপারিশ করা হয়।

কমিটি আরও উল্লেখ করে যে, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ভেরিয়েশন প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হয়েছিল, যার বিধিগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

প্রকল্পের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একটি অংশের অভিযোগ, আধুনিক স্টিল সাইলো নির্মাণে আন্তর্জাতিক মানের যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কথা থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে নিম্নমানের বা স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে প্রকল্পের মাধ্যমে যে আধুনিক খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা ছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

বর্তমানে সাতটি সাইলোর মধ্যে কেবল ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের সাইলো সীমিত আকারে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে খাদ্য সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থার পরিবর্তে সেখানে বস্তাবন্দি খাদ্যশস্য এনে পুনরায় সাইলোতে ঢোকানোর পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, যা অতিরিক্ত শ্রম ও অর্থ ব্যয়ের কারণ হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

একাধিক কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী একাধিক প্রকল্প পরিচালক ও কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বর্তমান প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এছাড়া অতীতের বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত, অগ্রিম অর্থ পরিশোধ, ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভেরিয়েশন অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রকল্পের শুরু থেকেই আর্থিক অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল।

নতুন সরকারের আমলেও অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, তদন্ত কমিটিগুলোর সুপারিশ অনুযায়ী এখন পর্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বরং অতীতের অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। বর্তমান খাদ্য প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও এ বিষয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব প্রাথমিকভাবে তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি

দুটি পৃথক তদন্ত কমিটির কার্যপরিধি সীমিত হলেও উভয় কমিটিই প্রকল্পে আরও বিস্তৃত তদন্তের প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশেষ করে আর্থিক অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয়, নির্মাণমান এবং চুক্তি বাস্তবায়নের সামগ্রিক বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে উচ্চ পর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে।

এদিকে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংকও প্রকল্পের মেয়াদ আর না বাড়ানোর অবস্থান জানিয়েছে। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও প্রকল্প কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা বহাল রয়েছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

খাদ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নেওয়া এই প্রকল্প এখন ব্যয় বৃদ্ধি, নির্মাণ বিলম্ব এবং অনিয়মের অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ তদন্তই কেবল প্রকৃত পরিস্থিতি উন্মোচন করতে পারে।