ঢাকা, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬,
সময়: ০১:৫৬:৪১ PM

গল্প” অসমাপ্ত”

মান্নান মারুফ
14-06-2026 12:34:40 PM
গল্প” অসমাপ্ত”

পৃথিবী দেখছে আমি চলছি, শুধু কেউ জানে না—ভেতরটা মৃত্যু। এই কথাগুলো লিখে ডায়েরির পাতায় কলম থামিয়ে দিল আরিয়ান। জানালার বাইরে গভীর রাত। শহরের আলো ঝলমল করছে, দূরে কোথাও গাড়ির হর্ন শোনা যাচ্ছে, অথচ তার কাছে সবকিছুই নিঃশব্দ মনে হচ্ছে।

এক সময় এই রাতগুলো ছিল তার সবচেয়ে প্রিয়। কারণ রাত মানেই ছিল নীলার সঙ্গে গল্প, স্বপ্ন দেখা, ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করা। অথচ আজ সেই রাতই তার সবচেয়ে বড় শত্রু। দিনের ব্যস্ততা মানুষকে ভুলিয়ে রাখে, কিন্তু রাত সব ভুলে যাওয়া স্মৃতিকে আবার ফিরিয়ে আনে।

নীলার সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল পাঁচ বছর আগে।

একটি বইমেলায়।

আরিয়ান তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বইয়ের স্টলে দাঁড়িয়ে একটি উপন্যাস দেখছিল। হঠাৎ পাশ থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এলো—

— "এই বইটা পড়েছেন?"

আরিয়ান তাকিয়ে দেখল, মেয়েটির চোখ দুটো অদ্ভুত সুন্দর। মুখে মিষ্টি হাসি।

— "না, পড়া হয়নি।"

— "তাহলে পড়ে দেখতে পারেন। শেষটা আপনাকে কাঁদাবে।"

মেয়েটি হেসে চলে গিয়েছিল।

কিন্তু আরিয়ানের মনে তার হাসিটা থেকে গিয়েছিল।

সেই ছিল শুরু।

কয়েক দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবার দেখা। তারপর ধীরে ধীরে কথাবার্তা, বন্ধুত্ব, আর একসময় ভালোবাসা।

নীলা ছিল আরিয়ানের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।

মেয়েটির মধ্যে এক অদ্ভুত সরলতা ছিল। ছোট ছোট বিষয়েও সে আনন্দ খুঁজে পেত। বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসত, নদীর ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখতে ভালোবাসত, আর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত আরিয়ানের সঙ্গে সময় কাটাতে।

একদিন বিকেলে নদীর পাড়ে বসে নীলা বলেছিল,

— "জানো, আমি যদি কোনো দিন তোমার জীবন থেকে হারিয়ে যাই?"

আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে বলেছিল,

— "অসম্ভব। তুমি কোথাও যাবে না।"

নীলা মুচকি হেসেছিল।

— "তবুও যদি যাই?"

— "তাহলে আমি তোমাকে খুঁজে নিয়ে আসব।"

মেয়েটি তার হাত শক্ত করে ধরেছিল।

— "প্রমিস?"

— "প্রমিস।"

সেদিন দুজনেই বিশ্বাস করেছিল, তাদের ভালোবাসা কোনো দিন হারাবে না।

কিন্তু জীবন সব প্রতিশ্রুতি পূরণ হতে দেয় না।

বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হওয়ার পর আরিয়ানের জীবনে কঠিন সময় শুরু হয়। পরিবারের দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে। বাবার অসুস্থতা, সংসারের খরচ, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা—সব মিলিয়ে সে হঠাৎ করেই বদলে যেতে বাধ্য হয়।

আগের মতো সময় দিতে পারত না নীলাকে।

সারাদিন কাজের চাপে ডুবে থাকত।

নীলা প্রথমে বুঝেছিল।

পরে ধীরে ধীরে অভিযোগ জমতে শুরু করল।

— "তুমি বদলে গেছ।"

— "না, আমি শুধু ব্যস্ত।"

— "ব্যস্ততা আর অবহেলার মধ্যে পার্থক্য আছে।"

আরিয়ান বোঝাতে চাইত, কিন্তু সব কথা কি ভাষায় বোঝানো যায়?

কিছু দূরত্ব শব্দ দিয়ে মুছে ফেলা যায় না।

একদিন রাতে তাদের মধ্যে বড় ঝগড়া হলো।

নীলা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল,

— "তোমার জীবনে এখন আমার কোনো গুরুত্ব নেই।"

আরিয়ান দীর্ঘক্ষণ চুপ ছিল।

তারপর বলেছিল,

— "আমার পুরো পৃথিবী তুমি।"

কিন্তু নীলা সেদিন বিশ্বাস করেনি।

সেদিনের পর থেকে সবকিছু বদলাতে শুরু করল।

ফোন কমে গেল।

মেসেজের উত্তর দেরিতে আসতে লাগল।

দেখা হওয়াও কমে গেল।

ভালোবাসা তখনও ছিল, কিন্তু সম্পর্কের ভিত দুর্বল হয়ে গিয়েছিল।

একদিন বিকেলে নীলা দেখা করতে ডাকল।

তাদের প্রিয় সেই পার্কে।

আকাশটা ছিল মেঘলা।

হালকা বাতাস বইছিল।

আরিয়ান পৌঁছে দেখল, নীলা বেঞ্চে বসে আছে। মুখটা অস্বাভাবিক শান্ত।

সে বসতেই নীলা ধীরে বলল,

— "আমাদের সম্পর্কটা আর টিকছে না।"

আরিয়ানের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।

— "মানে?"

— "আমরা দুজন দুই দিকে চলে যাচ্ছি।"

— "তুমি কি আমাকে আর ভালোবাসো না?"

নীলা চোখ নামিয়ে বলল,

— "ভালোবাসি। কিন্তু শুধু ভালোবাসা দিয়ে সব হয় না।"

এই কথাটাই আরিয়ানের হৃদয়ে ছুরির মতো বিঁধেছিল।

কারণ সে জানত, ভালোবাসা এখনো শেষ হয়নি।

শেষ হয়ে গেছে বিশ্বাস, ধৈর্য আর অপেক্ষা।

সেদিন অনেক চেষ্টা করেছিল সে।

অনেক বোঝানোর চেষ্টা।

অনেক অনুরোধ।

কিন্তু কিছু সম্পর্ক এক সময় এমন জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না।

বিদায়ের সময় নীলা শুধু বলেছিল,

— "ভালো থেকো।"

দুটি সাধারণ শব্দ।

কিন্তু সেই দুটি শব্দই আরিয়ানের জীবনের সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

এরপর কেটে গেছে তিন বছর।

বাইরে থেকে আরিয়ানকে দেখলে কেউ বুঝতে পারে না তার ভেতরে কতটা ধ্বংসস্তূপ জমে আছে।

সে চাকরি করে।

হাসে।

মানুষের সঙ্গে কথা বলে।

পারিবারিক দায়িত্ব পালন করে।

সবকিছু ঠিকঠাক চলে।

শুধু তার হৃদয়টা আর আগের মতো নেই।

রাতে ঘুমাতে গেলে এখনও নীলার কথা মনে পড়ে।

কিছু গান শুনলে মনে হয়, এই গানটা তো নীলা শুনত।

কোনো বইয়ের দোকানে গেলে মনে পড়ে, প্রথম দেখা হয়েছিল বইমেলায়।

বৃষ্টি নামলে মনে পড়ে, নীলা ভিজতে ভালোবাসত।

মানুষ বলে সময় সবকিছু ঠিক করে দেয়।

কিন্তু আরিয়ান জানে, সময় সবকিছু ঠিক করে না।

সময় শুধু মানুষকে ব্যথা নিয়ে বাঁচতে শিখিয়ে দেয়।

একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ নীলাকে দেখল সে।

একটি শপিং মলের সামনে।

নীলার পাশে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।

সম্ভবত তার স্বামী।

তাদের সঙ্গে ছোট্ট একটি মেয়েও ছিল।

নীলা হাসছিল।

অনেক দিন পর সেই হাসি দেখল আরিয়ান।

এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে গেল।

তার মনে হলো, এই তো সেই মেয়ে, যাকে নিয়ে একসময় সে সারাজীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখত।

আজ সে অন্য কারও জীবনের অংশ।

আরিয়ান দূর থেকে তাকিয়ে রইল।

নীলা তাকে দেখেনি।

হয়তো দেখলেও চিনতে পারত।

হয়তো না।

সে আর কাছে যায়নি।

শুধু নিঃশব্দে চলে এসেছিল।

সেদিন রাতে ডায়েরি খুলে অনেকক্ষণ বসে ছিল।

চোখের কোণে জল জমেছিল।

কিন্তু কান্না আসেনি।

কিছু কিছু কষ্ট এত পুরোনো হয়ে যায় যে, তারা চোখের জল হিসেবেও বের হতে পারে না।

শুধু বুকের ভেতর নীরব ব্যথা হয়ে জমে থাকে।

ডায়েরির শেষ পাতায় সে লিখল—

"তুমি চলে যাওয়ার পর বুঝেছি, মানুষ সব হারিয়ে ফেলেও বেঁচে থাকতে পারে। হাসতে পারে, কাজ করতে পারে, দায়িত্ব পালন করতে পারে। কিন্তু কিছু ভালোবাসা থাকে, যা হারিয়ে গেলেও হৃদয়ের ভেতর থেকে যায়।

আমি আজও তোমাকে দোষ দিই না। কারণ তুমি আমাকে ছেড়ে যাওনি, তুমি শুধু তোমার সুখের পথে চলে গেছ।

দোষ যদি কারও থাকে, তবে সেটা সময়ের। সময় আমাদের কাছাকাছি এনেছিল, আবার সময়ই দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

তবু একটা কথা সত্যি—আমি ভালো নেই। শুধু বেঁচে আছি। পৃথিবী দেখছে আমি চলছি, কিন্তু কেউ জানে না, আমার ভেতরে এখনো তোমার স্মৃতির কবরের পাশে বসে আছে এক মৃত মানুষ।"

ডায়েরি বন্ধ করে জানালার বাইরে তাকাল আরিয়ান।

ভোর হতে আর বেশি দেরি নেই।

আকাশের অন্ধকার ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে।

নতুন একটা দিন শুরু হবে।

মানুষ তাকে আবার হাসতে দেখবে।

আবার ব্যস্ত হতে দেখবে।

আবার জীবন চলবে।

শুধু কেউ জানবে না, তার বুকের গভীরে আজও একটি অসমাপ্ত প্রেম নিঃশব্দে কাঁদে।

আর কিছু ভালোবাসা, শেষ হয়ে যাওয়ার পরও শেষ হয় না—তারা স্মৃতি হয়ে সারাজীবন হৃদয়ের ভেতর বেঁচে থাকে, সবচেয়ে গভীর কষ্টের মতো, সবচেয়ে সুন্দর হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের মতো। সমাপ্ত।।