মানুষের জীবন বড় অদ্ভুত। জন্মের সময় তার হাতে কিছুই থাকে না, অথচ বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে সে পৃথিবীর পথে হাঁটা শুরু করে। সেই স্বপ্নগুলো কখনো শিশিরভেজা সকালের মতো নির্মল, কখনো বা আকাশছোঁয়া মেঘের মতো দুর্লভ। প্রত্যেক মানুষই মনে করে, তার জীবনের কোথাও না কোথাও একখণ্ড নির্ভেজাল সুখ অপেক্ষা করে আছে। সেই সুখের সন্ধানেই শুরু হয় তার অন্তহীন যাত্রা।
নিভুর জীবনও ছিল তেমনই।
ছোট্ট একটি গ্রামের মাটির উঠোনে তার বেড়ে ওঠা। গ্রামের পূর্বদিকে একটি সরু নদী ছিল। বর্ষাকালে নদীটি উচ্ছ্বসিত কিশোরীর মতো ছুটে যেত দূর অজানার দিকে, আর শীতকালে শান্ত হয়ে পড়ে থাকত ধ্যানমগ্ন সাধুর মতো। সেই নদীর পাড়ে বসেই নিভু অসংখ্য স্বপ্ন বুনত। কখনো ভাবত, বড় হয়ে সে অনেক দূরে যাবে; কখনো ভাবত, জীবনের সব অভাব একদিন মুছে যাবে; আবার কখনো মনে হতো, শুধু একটু ভালোবাসা পেলেই তার পৃথিবী পূর্ণ হয়ে উঠবে।
নিভুর শখ ছিল খুব সাধারণ। ভোরের আলোয় বই পড়া, বর্ষার দিনে কাদামাটির গন্ধ নেওয়া, শিউলি ফুল কুড়িয়ে মায়ের আঁচলে রাখা, কিংবা সন্ধ্যায় নদীর ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখা। এই সামান্য বিষয়গুলোতেই সে অদ্ভুত এক আনন্দ খুঁজে পেত। কিন্তু মানুষ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেমন তার দেহ বদলে যায়, তেমনি বদলে যায় তার স্বপ্নের রংও।
সময়ের স্রোতে একদিন নিভু গ্রাম ছেড়ে শহরে এল।
শহর তাকে প্রথমে মুগ্ধ করেছিল। উঁচু উঁচু দালান, ব্যস্ত রাস্তা, অসংখ্য মানুষের ভিড়—সবকিছুই যেন নতুন এক পৃথিবীর দরজা খুলে দিয়েছিল। সে ভেবেছিল, এখানেই বুঝি তার সেই কাঙ্ক্ষিত সুখের বাস। এখানেই হয়তো জীবনের সব অপূর্ণতা পূর্ণ হবে।
কিন্তু শহরের মানুষদের মুখে হাসি থাকলেও হৃদয়ে ছিল অদৃশ্য দূরত্ব। এখানে কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করে না। প্রত্যেকে নিজের সাফল্যের পেছনে ছুটে চলে। নিভুও সেই দৌড়ে শামিল হয়ে গেল।
প্রথমে সে ভেবেছিল, একটি ভালো চাকরি পেলেই সুখ আসবে। চাকরি পেল। তারপর মনে হলো, আরও বড় পদ দরকার। সেটিও অর্জন করল। এরপর ভাবল, একটি সুন্দর বাড়ি হলে জীবন সম্পূর্ণ হবে। বাড়িও হলো। তারপর গাড়ি, অর্থ, পরিচিতি—একটির পর একটি সাফল্য তার জীবনে ধরা দিতে লাগল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, প্রতিটি অর্জনের পর সুখ যেন আরও একটু দূরে সরে যেত।
যেন মরুভূমির মরীচিকা।
দূর থেকে মনে হতো, আর মাত্র কয়েক পা গেলেই জলের দেখা মিলবে। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখা যেত, সেখানে শুধু উত্তপ্ত বালুকা ছাড়া কিছুই নেই।
এভাবেই বছরের পর বছর কেটে গেল।
একদিন হঠাৎ নিভু উপলব্ধি করল, সে অনেক দূর চলে এসেছে। এত দূর যে, ফিরে তাকালে নিজের শেকড়কেও আর স্পষ্ট দেখা যায় না। সে খেয়াল করল, বহুদিন ধরে ভোরের সূর্যোদয় দেখা হয়নি। নদীর কলকল ধ্বনি শোনা হয়নি। মায়ের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বসে গল্প করা হয়নি। বন্ধুদের সঙ্গে নির্বোধ হাসিতে মেতে ওঠাও ভুলে গেছে।
সে যেসব ছোট ছোট আনন্দ একসময় হৃদয়ে লালন করত, সেগুলোকে বিসর্জন দিয়েছে বৃহত্তর সুখের আশায়।
আর সেই বৃহত্তর সুখ?
সে তো এখনও অধরাই।
নিভুর জীবনে একসময় ভালোবাসাও এসেছিল। সে বিশ্বাস করেছিল, এবার বুঝি তার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে। একজন মানুষকে কেন্দ্র করে সে নিজের সমস্ত স্বপ্ন, সমস্ত অনুভূতি গড়ে তুলেছিল। নিজের সময়, শ্রম, আবেগ—সবকিছু অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু পৃথিবীর সব গল্প পূর্ণতা পায় না।
কিছু গল্প অসমাপ্ত থাকার জন্যই জন্ম নেয়।
যাকে কেন্দ্র করে নিভু ভবিষ্যতের আকাশ এঁকেছিল, সে একদিন অন্য পথে চলে গেল। কোনো ঝড় হলো না, কোনো উচ্চস্বরে বিদায়ও নয়। শুধু নীরবে সম্পর্কের প্রদীপটি নিভে গেল।
সেদিন নিভু প্রথমবারের মতো অনুভব করল, মানুষের বুক ভাঙার শব্দ বাইরে শোনা যায় না। সেই শব্দ কেবল হৃদয়ের গভীর অন্ধকারেই প্রতিধ্বনিত হয়।
এরপর থেকে জীবন যেন এক দীর্ঘ যান্ত্রিক যাত্রায় পরিণত হলো।
সকাল আসে, সন্ধ্যা নামে, দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়—কিন্তু নিভুর ভেতরের শূন্যতা একই রকম থেকে যায়। বাইরে থেকে সবাই তাকে সফল মানুষ বলত। তার অর্জনের তালিকা দেখে মানুষ বিস্মিত হতো। কিন্তু কেউ জানত না, প্রতিদিন রাতে নিজের ঘরে ফিরে সে কতখানি নিঃসঙ্গতার মুখোমুখি হয়।
এক রাতে জানালার পাশে বসে নিভু পুরোনো ডায়েরির পাতা উল্টাচ্ছিল।
পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে। কোথাও কিশোর বয়সের স্বপ্ন লেখা, কোথাও জীবনের লক্ষ্য, কোথাও প্রিয় মানুষের নাম।
হঠাৎ তার চোখে জল এসে গেল।
সে বুঝতে পারল, যে মানুষটি এতদিন সুখের সন্ধানে পৃথিবী চষে বেড়িয়েছে, সে আসলে নিজের কাছ থেকেই সবচেয়ে দূরে সরে গেছে।
সেই রাতে নিভু অনেকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।
আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলছিল। প্রত্যেকটি তারার আলো বহু বছর আগের। হয়তো যে তারাটি সে দেখছে, সেটি অনেক আগেই নিভে গেছে। শুধু তার আলো এখনো পৃথিবীতে পৌঁছাচ্ছে।
মানুষের জীবনও কি তেমন নয়?
অনেক সম্পর্ক অনেক আগেই মরে যায়, অথচ তাদের স্মৃতি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের হৃদয়ে আলো জ্বালিয়ে রাখে।
সেদিন নিভু প্রথমবার উপলব্ধি করল, সুখ কোনো গন্তব্য নয়। সুখ কোনো অর্জনও নয়। সুখ আসলে পথের ধারে ফেলে আসা ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর সমষ্টি।
যে ভোরে মা ডেকে তুলতেন, সেটাই সুখ ছিল।
যে বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে নদীর ধারে বসে গল্প করত, সেটাই সুখ ছিল।
যে শিউলি ফুলের গন্ধে মন ভরে যেত, সেটাই সুখ ছিল।
কিন্তু সে সেসব তুচ্ছ ভেবে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল।
অথচ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোই ছিল সেগুলো।
এরপর নিভুর জীবনে আর কোনো অলৌকিক পরিবর্তন আসেনি। তার হারানো ভালোবাসা ফিরে আসেনি, অতীতও ফিরে আসেনি। সময় তার নিজস্ব গতিতেই বয়ে চলেছে।
তবে নিভুর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গিয়েছিল।
সে আবার বই পড়তে শুরু করল।
ভোরবেলা সূর্যোদয় দেখতে লাগল।
অবসর পেলেই গ্রামের বাড়িতে চলে যেত।
নদীর ধারে বসে বাতাসের শব্দ শুনত।
সে বুঝতে শিখল, জীবনের প্রকৃত প্রাপ্তি সংখ্যায় মাপা যায় না। ব্যাংকের হিসাব, পদমর্যাদা কিংবা বাহ্যিক সাফল্য মানুষের অস্তিত্বকে পূর্ণ করতে পারে না।
একদিন বৃদ্ধ বয়সে নিভু সেই পুরোনো নদীর তীরে বসেছিল।
সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে ডুবে যাচ্ছিল। নদীর জলে রক্তিম আলো ঝিলমিল করছিল। চারপাশে এক গভীর প্রশান্তি।
নিভু অনুভব করল, তার জীবনের দীর্ঘ যাত্রা প্রায় শেষের পথে।
সে চোখ বন্ধ করল।
তার সামনে ভেসে উঠল শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য, প্রেম, ব্যর্থতা, সংগ্রাম, একাকীত্ব—সবকিছু।
তারপর এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে।
কারণ সে অবশেষে বুঝতে পেরেছে, জীবনের সবচেয়ে বড় রসিকতা হলো—মানুষ সারাজীবন সুখের খোঁজে ছুটতে ছুটতে সেই সুখকেই হারিয়ে ফেলে, যা তার হাতের নাগালেই ছিল।
আমরা ভাবি, ভবিষ্যতের কোনো একদিন সুখ আমাদের দরজায় কড়া নাড়বে। অথচ সুখ নীরবে বর্তমানের ভেতরেই বাস করে। আমরা তাকে চিনতে পারি না বলেই সে অধরা মনে হয়।
নিভুর জীবন তাই শেষ পর্যন্ত দুঃখের গল্প নয়; বরং উপলব্ধির গল্প।
সে শিখেছিল, হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের জন্য অনন্তকাল শোক করা যায়, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সময় আর কখনো ফিরে আসে না।
জীবনের শেষ প্রহরে এসে তার মনে হলো, মানুষ আসলে দেউলিয়া হয় অর্থ হারিয়ে নয়, নিজের অনুভূতিগুলো হারিয়ে। আর সবচেয়ে ধনী সেই মানুষ, যে সামান্য আনন্দেও কৃতজ্ঞ হতে পারে।
নদীর ওপারে তখন সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে।
এক ঝাঁক পাখি নিজেদের নীড়ে ফিরছে।
নিভু ধীর দৃষ্টিতে তাদের উড়ে যাওয়া দেখল।
তার বুকের ভেতরে আর কোনো অভিযোগ নেই, কোনো অভিমান নেই, কোনো হিসাবও নেই।
শুধু এক গভীর শান্তি।
কারণ জীবনের সমস্ত প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির শেষে সে বুঝতে পেরেছে—মানুষ সুখকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে যায়, অথচ সুখ কখনো দূরে ছিল না; সে ছিল মানুষের নিজের হৃদয়ের ভেতরেই।
আর এই উপলব্ধিই ছিল নিভুর জীবনের শেষ এবং সবচেয়ে মূল্যবান অর্জন।
সমাপ্ত।।