ঢাকা, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬,
সময়: ০২:৪৪:৫৫ PM

মিতব্যয়িতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন প্রধানমন্ত্রীর

মান্নান মারুফ
22-06-2026 11:44:27 AM
মিতব্যয়িতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন প্রধানমন্ত্রীর

রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও ব্যয়সংকোচনের প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরেই জনমনে নানা আলোচনা চলছিল। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় সফরগুলোতে অতিরিক্ত জনবল, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এবং সরকারি অর্থের অপচয় নিয়ে সমালোচনার শেষ ছিল না। সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে ঘিরে সেই পুরোনো চিত্রের বিপরীতে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের আলোচনা সামনে এসেছে।

জানা গেছে, দুই দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন মাত্র ২৮ জন। রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন, সফরের এজেন্ডা এবং কূটনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরই সফরসঙ্গী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সফরের ব্যয় সীমিত রাখা এবং প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে প্রতিনিধি দল নির্ধারণ করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল।

অতীতে রাষ্ট্রীয় সফরগুলোতে বড় আকারের প্রতিনিধিদল নিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছিল। সমালোচকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং অন্যান্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হতো। এর ফলে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বৃদ্ধি পেত এবং সফরের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, অতীতের কিছু সফরে শতাধিক ব্যক্তির অংশগ্রহণ জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছিল। বিশেষ করে সরকারি অর্থে বিদেশ সফরকে ঘিরে বিলাসিতা ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের অভিযোগ দীর্ঘদিন আলোচনার বিষয় ছিল। চার্টার্ড বিমানের ব্যবহার, বৃহৎ প্রতিনিধিদল এবং সফরকে কেন্দ্র করে নানা আয়োজনকে অনেকেই রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হিসেবে দেখেছেন।

গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যেও এ বিষয়ে নানা আলোচনা ছিল। অভিযোগ রয়েছে, পূর্ববর্তী সময়ের কিছু সফরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাংবাদিক সফরসঙ্গী হওয়ার সুযোগ পেতেন। তবে সফরের অর্জন, কূটনৈতিক সাফল্য কিংবা জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করার পরিবর্তে অনেক সময় ব্যক্তিপূজা বা প্রশংসামূলক পরিবেশ তৈরি হতো। এতে পেশাদার সাংবাদিকতার মান এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সমালোচকরা মনে করেন।

অন্যদিকে বর্তমান সফরে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের প্রয়োজনীয় সদস্য ছাড়া অতিরিক্ত কোনো সাংবাদিককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে জানা গেছে। একইভাবে সফরের আলোচ্যসূচির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই—এমন কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা কর্মকর্তাকেও প্রতিনিধি দলে রাখা হয়নি। ফলে সফরের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওচিত্রেও সফরের একটি ভিন্নধর্মী চিত্র দেখা গেছে। সেখানে সফরসঙ্গীদের নিজেদের লাগেজ ও ব্যক্তিগত সামগ্রী নিজেরাই বহন করতে দেখা যায়। সাধারণত উন্নত বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রনায়ক ও সরকারি প্রতিনিধি দলের সদস্যদের ক্ষেত্রেও এমন চিত্র দেখা যায়, যেখানে অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা ও বিলাসিতা পরিহার করা হয়।

পর্যবেক্ষকদের মতে, রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতীকী পদক্ষেপেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। জনগণ যখন দেখে যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা ব্যয়সংকোচন ও দায়িত্বশীলতার উদাহরণ স্থাপন করছেন, তখন প্রশাসনের অন্যান্য স্তরেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ ধরনের উদ্যোগ সরকারি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনগণের আস্থা বৃদ্ধিতেও সহায়ক হতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের রাষ্ট্রনায়কদের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা রাষ্ট্রীয় সফরে প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে প্রতিনিধি দল নির্ধারণ করেন এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও সীমিত সম্পদের দেশের ক্ষেত্রেও এমন দৃষ্টিভঙ্গি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বার্তা দিয়েছেন, তা কেবল একটি বিদেশ সফরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি রাষ্ট্র পরিচালনায় মিতব্যয়িতা, জবাবদিহিতা এবং প্রয়োজনভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি প্রতীকী উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দীর্ঘদিনের সমালোচিত কিছু চর্চা থেকে বেরিয়ে এসে যদি রাষ্ট্রীয় সফরগুলোকে আরও কার্যকর, ফলপ্রসূ এবং ব্যয়-সাশ্রয়ী করা যায়, তবে তা দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসনিক সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

সর্বোপরি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা একটি সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। ভবিষ্যতেও যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে রাষ্ট্রীয় ব্যয় ব্যবস্থাপনায় নতুন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।