ঢাকা, শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬,
সময়: ১১:৩২:০২ PM

লক্ষীপুরের চার হত্যার,উপন্যাস”শেষ আলো”

মান্নান মারুফ
26-06-2026 09:25:21 PM
লক্ষীপুরের চার হত্যার,উপন্যাস”শেষ আলো”

পর্ব-৫

শীত শেষ হয়ে বসন্তের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। চারদিকে নতুন পাতার সবুজ, গাছে গাছে ফুল, পাখির ডাক—প্রকৃতি যেন নতুন জীবনের বার্তা দিচ্ছে। কিন্তু শাহানা বেগমের মনে অদ্ভুত এক অস্বস্তি দিন দিন গাঢ় হতে লাগল।

কোনো কারণ ছিল না।

আবার যেন অনেক কারণও ছিল।

মাঝে মাঝেই তার মনে হতো, কেউ যেন তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।

যখন তিনি সেলাই মেশিন চালান, তখনও।

যখন সন্ধ্যায় কলসি নিয়ে পানি আনতে যান, তখনও।

যখন সন্তানদের নিয়ে বারান্দায় বসে গল্প করেন, তখনও।

প্রথম প্রথম তিনি নিজের মনকেই দোষ দিয়েছিলেন।

হয়তো এত কষ্টের জীবনে মানুষ একটু বেশিই ভয় পায়।

কিন্তু ধীরে ধীরে ঘটনাগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা মিলতে শুরু করল।

এক বিকেলে রিফাত দোকান থেকে ফিরছিল।

গলির মুখে সে একজন অচেনা লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল।

লোকটি তাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে।

রিফাত পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় লোকটি চোখ ফিরিয়ে নিল।

বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দিল না সে।

ছোট শহরে নতুন মানুষ আসতেই পারে।

কিন্তু বাড়িতে ঢুকে সে অবাক হলো।

মা নিজেই বললেন,

— "আজ আবার সেই লোকটাকে দেখলাম।"

রিফাত থেমে গেল।

— "কোন লোক?"

— "যে কয়েকদিন আগে রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়েছিল।"

— "কোথায়?"

— "বাজার থেকে ফিরছিলাম। আমাদের বাড়ির দিকেই তাকিয়ে ছিল।"

রিফাত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— "হয়তো কাকতালীয়।"

শাহানা মাথা নাড়লেন।

— "হতে পারে।"

কিন্তু তার চোখের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তি লুকিয়ে রইল না।

রিমি বিষয়টা শুনে বলল,

— "মা, তুমি একা কোথাও যেও না।"

নীলা হেসে বলল,

— "আরে আপু, মানুষ তাকালেই কি সন্দেহ করতে হবে?"

মুনা তো কিছুই বুঝল না।

সে শুধু বলল,

— "মা, আজ গল্প বলবে?"

মুহূর্তেই ঘরের পরিবেশ বদলে গেল।

শাহানা বুঝলেন, ছোটদের সামনে ভয়ের কথা বলা ঠিক নয়।

তিনি হাসিমুখে গল্প শুরু করলেন।

কিন্তু নিজের ভেতরের অস্বস্তিটা আর কাটল না।

পরদিন সকালে সেলাইয়ের কাজ পৌঁছে দিতে গিয়ে তিনি আবার সেই মানুষটিকে দেখলেন।

এবার আরও কাছে।

লোকটির বয়স ত্রিশের কাছাকাছি।

মুখে দাড়ি।

চোখদুটি অস্বাভাবিক স্থির।

তিনি পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলে লোকটি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,

— "আপনি কি এই এলাকায় থাকেন?"

শাহানা সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন,

— "জি।"

— "অনেকদিন?"

— "হ্যাঁ।"

তারপর আর কোনো কথা না বলে তিনি দ্রুত হাঁটতে লাগলেন।

পেছনে তাকানোর সাহস হলো না।

বাড়ি ফিরে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলেন।

নিজেকে বোঝালেন—

"অযথা ভয় পাচ্ছি।"

কয়েকদিন শান্ত কাটল।

সবকিছু যেন আবার স্বাভাবিক।

রিফাত দোকানে যায়।

রিমি টিউশনি করে।

নীলা কলেজে।

মুনা স্কুলে।

শাহানা সেলাই করেন।

কিন্তু শান্তির ভেতরেও অদৃশ্য একটা চাপা উদ্বেগ রয়ে গেল।

এক বিকেলে পাশের বাড়ির রবিন ভাই এলেন।

চা খেতে খেতে শাহানা বিষয়টা বললেন।

রবিন হেসে বললেন,

— "আপা, এগুলো নিয়ে এত ভাববেন না।"

— "কিন্তু লোকটাকে বারবার দেখছি।"

— "হতে পারে কারও আত্মীয়।"

— "আমার ভালো লাগছে না।"

রবিন আশ্বস্ত করলেন,

— "এলাকায় সবাই আছে। কোনো সমস্যা হবে না।"

শাহানা আর কিছু বললেন না।

কিন্তু মনের ভয় কথায় কমল না।

এরপর শুরু হলো ছোট ছোট অস্বাভাবিক ঘটনা।

একদিন সকালে দেখা গেল উঠোনের দরজা আধখোলা।

শাহানা নিশ্চিত ছিলেন, রাতে দরজা বন্ধ করেছিলেন।

রিফাত বলল,

— "হয়তো ঠিকমতো লাগেনি।"

আরেকদিন জানালার পাশে রাখা ফুলের টবটা মাটিতে পড়ে আছে।

বাতাসে পড়েছে?

নাকি কেউ স্পর্শ করেছে?

কেউ জানে না।

মুনা বলল,

— "বিড়াল ফেলেছে।"

সবাই সেই ব্যাখ্যাই মেনে নিল।

রিমি এক সন্ধ্যায় টিউশনি থেকে ফিরছিল।

তার মনে হলো, কেউ যেন পেছন থেকে হাঁটছে।

সে একবার ফিরে তাকাল।

কেউ নেই।

আরও কয়েক কদম এগিয়ে আবার একই অনুভূতি।

সে দ্রুত হাঁটতে লাগল।

বাড়ি ফিরে কাউকে কিছু বলল না।

মা দুশ্চিন্তা করবেন।

তাই চুপ থাকাই ভালো।

রাতে খাওয়ার সময় রিফাত লক্ষ্য করল, মা আগের মতো হাসছেন না।

সে জিজ্ঞেস করল,

— "কী হয়েছে?"

শাহানা মৃদু হাসলেন।

— "কিছু না।"

— "তুমি কয়েকদিন ধরে চুপচাপ।"

— "ক্লান্তি।"

রিফাত বিশ্বাস করল না।

তবু আর জোর করল না।

সেদিন রাতে বিদ্যুৎ চলে গেল।

চারদিকে অন্ধকার।

মোমবাতির আলোয় চার ভাইবোন বসে গল্প করছিল।

মুনা ভূতের গল্প শুনতে চাইছিল।

রিফাত হেসে বলল,

— "ভূত বলে কিছু নেই।"

মা দূর থেকে শুনে বললেন,

— "মানুষই কখনও কখনও মানুষের সবচেয়ে বড় ভয়।"

কথাটা শুনে সবাই চুপ করে গেল।

শাহানা নিজেও বুঝতে পারলেন না, কেন এমন কথা বলে ফেললেন।

পরদিন বিকেলে বাজারে কাদের মিয়ার দোকানে গিয়ে তিনি আবার সেই মানুষটিকে দেখলেন।

লোকটি কিছু কিনছে না।

শুধু দূর থেকে তাকিয়ে আছে।

শাহানা দ্রুত বাজার সেরে বাড়ি ফিরলেন।

সেদিন রাতে তিনি প্রথমবার রিফাতকে বললেন,

— "বাবা, দরজাটা দুবার দেখে বন্ধ করিস।"

রিফাত অবাক হয়ে বলল,

— "কেন?"

— "এমনিই।"

— "ভয় পাচ্ছ?"

শাহানা একটু থেমে বললেন,

— "মায়েদের মাঝে মাঝে কারণ ছাড়াই ভয় লাগে।"

রিফাত মায়ের হাত চেপে ধরল।

— "আমি আছি।"

শাহানা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

কিন্তু তার ভেতরের আশঙ্কা যেন আরও ঘনীভূত হচ্ছিল।

দিন গড়িয়ে সপ্তাহ।

প্রতিবেশীরা এখনও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিল না।

কারও কাছে এটা কেবল কাকতালীয়।

কারও কাছে বাড়াবাড়ি।

কারও কাছে "মনের ভুল"।

শাহানা ধীরে ধীরে কথাও বলা বন্ধ করে দিলেন।

তিনি ভাবলেন, হয়তো সত্যিই তিনি অকারণে ভয় পাচ্ছেন।

কিন্তু প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই বুকের ভেতর চাপা কাঁপুনি শুরু হতো।

সেই রাতে আকাশে চাঁদ ছিল না।

গলিটা অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ।

দূরে কুকুরের ডাক ভেসে আসছিল।

ঘড়িতে তখন প্রায় রাত বারোটা।

সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।

শুধু শাহানার ঘুম আসছিল না।

তিনি উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।

বাইরে কালো অন্ধকার।

হঠাৎ—

খুব মৃদু একটা শব্দ।

মনে হলো, যেন উঠোনে কেউ পা ফেলল।

তিনি স্থির হয়ে গেলেন।

নিজেকে বোঝালেন—হয়তো বিড়াল।

কয়েক সেকেন্ড পর আবার শব্দ।

এবার যেন আরও কাছে।

ধীরে ধীরে তিনি রিফাতের ঘরের দিকে তাকালেন।

ডাকবেন?

না কি চুপ থাকবেন?

ঠিক তখনই—

দরজায় খুব আস্তে তিনটি টোকা পড়ল।

টক...

টক...

টক...

শাহানার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন যেন থেমে গেল।

এই গভীর রাতে কে?

তিনি নিঃশ্বাস বন্ধ করে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

আর দরজার ওপাশে—নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল কেউ একজন।

চলবে.............