ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬,
সময়: ১০:০২:১১ PM

এলজিইডির ক্যাশিয়ারের ভূমিকায় ড্রাইভার রফিক

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
30-07-2026 08:39:44 PM
এলজিইডির ক্যাশিয়ারের ভূমিকায়  ড্রাইভার রফিক

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলীর আউটসোর্সিংয়ে নিযুক্ত গাড়ি চালক রফিকুল ইসলাম। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তার মাসিক বেতন মাত্র ১৭ হাজার টাকা। চড়া মূল্যস্ফীতির এই সময়ে এই স্বল্প আয়ের টাকায় সাধারণ মানুষের সংসার চালানোই যেখানে দুষ্কর, সেখানে ড্রাইভার রফিকের জীবনযাপন অত্যন্ত বিলাসী। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানী ও তৎসংলগ্ন এলাকায় তার রয়েছে তিনটি বাড়ি এবং দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি। শুধু তাই নয়, নিজের কেনা সেই দুটি গাড়ি তিনি নিজের কর্মস্থল এলজিইডিতেই ভাড়া দিয়ে রেখেছেন।

নামমাত্র ড্রাইভারের চাকরি করলেও এলজিইডিতে তার প্রভাব অপরিসীম। তিনি যেন অধিদপ্তরের এক ‘অলিখিত ক্যাশিয়ার’ ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু।

দুর্নীতির উৎস ও ক্ষমতার অপব্যবহার
ড্রাইভার রফিকুল ইসলামের দুর্নীতির প্রধান উৎস হলো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্য। উপজেলা প্রকৌশলী, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী এবং উপসহকারী প্রকৌশলীদের বদলির তদবির পরিচালনা করেন তিনি। এছাড়া, বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) এবং জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীদের (এক্সেন) কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অন্যান্য স্ট্যান্ডবাই গাড়ি চালকদের ডিউটি বণ্টনও হয় তার নির্দেশে। তাকে ঘুষ না দিলে ডিউটি রোস্টারে নাম ওঠে না। এমনকি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বদলিতেও তার প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার এক প্রকৌশলীকে পোস্টিং দেওয়ার বিনিময়ে তিনি ৮ লাখ টাকা ঘুষ নেন বলে অভিযোগ উঠে। পরবর্তীতে এলজিআরডি মন্ত্রী ওই আদেশ বাতিলের নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও তা বহাল রাখা হয়।

প্রধান প্রকৌশলীর আশ্রয়-প্রশ্রয় ও সিন্ডিকেট
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের গাড়ি চালিয়ে আসছেন। বেলাল হোসেন যখন দু’বার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তখন থেকেই রফিক এই নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যে যুক্ত হন। পরবর্তীতে বেলাল হোসেন প্রধান প্রকৌশলী পদে উন্নীত হলে রফিকের প্রভাব আরও বেপরোয়া রূপ নেয়।

সম্প্রতি বিভিন্ন জেলায় প্রায় অর্ধশত নির্বাহী প্রকৌশলী পদায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে পরিচালক (পিডি) নিয়োগে ব্যাপক আর্থিক লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ডিও (Demand Note) লেটারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পেছনে চলে মোটা অঙ্কের লেনদেন। জেলাভেদে এই লেনদেনের পরিমাণ ২৩ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। আর এসব অবৈধ টাকার সিংহভাগই সংগ্রহ করেন ড্রাইভার রফিক।

তার সাথে আর্থিক সমঝোতা হলেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বদলির আদেশ জারি করা হয়। এছাড়া ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা কিংবা জন্মদিনসহ বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে জেলার এক্সেন, পিডি এবং উপজেলা প্রকৌশলীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের উপহারসামগ্রী ও অর্থ আদায় করেন তিনি। ফলে পুরো সংস্থায় রফিক এখন এক আতঙ্কের নাম।

অবৈধ উপার্জনে গড়ে তোলা বিপুল সম্পদ
রফিকুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর হলেও তিনি বর্তমানে গাজীপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি গাজীপুরেই গড়ে তুলেছেন বিশাল সাম্রাজ্য:

সাফারি পার্ক সংলগ্ন ৬ তলা ভবন: গাজীপুর সাফারি পার্কের কাছে ১০ কাঠা জমির ওপর তার একটি বিলাসবহুল ছয় তলা বাড়ি রয়েছে, যেখানে তার পরিবার বসবাস করে।

টিনশেড বাড়ি: গাজীপুর চৌরাস্তায় তার একটি টিনশেড বাড়ি রয়েছে, যেখান থেকে প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা ভাড়া আসে।

ব্যক্তিগত গাড়ি: রফিকের মালিকানায় দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে, যা তিনি এলজিইডি অফিসে ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। এই বাবদ প্রতি মাসে তার অতিরিক্ত আয় ৪০ হাজার টাকা।

সূত্র মতে, রফিক সপ্তাহে ঘুষ বাবদ যা উপার্জন করেন, প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে গাজীপুরে গিয়ে তা নিজের বাড়িতে রেখে আসেন।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
এসব গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি এবং বদলি বাণিজ্যের বিষয়ে মন্তব্য জানতে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনের সাথে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তবে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে ড্রাইভার রফিকুল ইসলাম দাবি করেন,

"আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা ছড়ানো হচ্ছে। আমি কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জন করি।"

তিনি অবৈধ আয় এবং ঘুষ গ্রহণের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তবে একজন নামমাত্র বেতনের আউটসোর্সিং কর্মচারীর এমন বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া এবং সংস্থায় একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করার বিষয়টি নিয়ে সর্বমহলে তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।