ঢাকা, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৯:৪১:৩২ PM

স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে নিবেদিত মধ্যাহ্নভোজ: একটি সময়নিষ্ঠ প্রথা তৈরির অঙ্গীকার

আফসানা আরেফিন
12-09-2026 09:01:52 PM
স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে নিবেদিত মধ্যাহ্নভোজ: একটি সময়নিষ্ঠ প্রথা তৈরির অঙ্গীকার

বাংলাদেশের সরকারি অফিসগুলোতে কাজের পরিবেশ, সেবার মান এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রতিনিয়ত নানা আলোচনা হয়। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা কেবল তার ডিজিটাল অবকাঠামো বা প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না তা অনেকাংশে নির্ভর করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসূচকের ওপর। সরকারি দপ্তরের সময়সূচিতে দুপুর ১:০০ টা থেকে ১:৩০ টা পর্যন্ত নির্ধারিত ৩০ মিনিটের মধ্যাহ্নভোজ ও নামাজের বিরতি রয়েছে। যদিও দেশের বেশিরভাগ মসজিদে ১:৩০ মিনিটে জোহরের নামাজের  জামাআত শুরু করে। ফলে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে নামাজের জামাআত শুরুর বিষয়ে অথবা মধ্যাহ্নভোজের বিরতির বিষয়ে পরিবর্তিত সময়সূচী সময়ের দাবী। তবে এই বিরতি কেবল প্রশাসনিক রীতি নয় এটি মানবদেহের ক্রোনোবায়োলজি (Chronobiology) বা জৈবিক ঘড়ির (Circadian Rhythm) সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটি বৈজ্ঞানিক স্বাস্থ্য রক্ষাকবচ।দুর্ভাগ্যজনকভাবে একদিকে জনগণের অসচেতনতা এবং অন্যদিকে অফিসে বিরতি মেনে চলার সুনির্দিষ্ট চর্চার অভাবে এই নির্ধারিত সময়টির সঠিক প্রতিফলন ঘটছে না। ফলে একদিকে যেমন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মেটাবলিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে অন্যদিকে সেবাপ্রার্থীরাও নির্দিষ্ট সময়ের ধারণা না থাকায় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
​প্রশাসনিক দিক থেকে বিবেচনা করলে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ও প্রাসঙ্গিক শৃঙ্খলা বিধির অন্যতম মূল দর্শন হলো দায়িত্ব পালন ও কর্মচারীর কর্মক্ষমতা বজায় রাখা। চিকিৎসাবিজ্ঞান নির্দেশ করে সঠিক সময়সূচি মেনে আহার গ্রহণ এবং কাজের ফাঁকে স্বল্প বিশ্রামের মধ্য দিয়ে দেহের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা (Insulin Sensitivity) ও পরিপাক প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে। যখন খাবারের নির্দিষ্ট সময় বারবার বিঘ্নিত হয় তখন লিভার ও অগ্ন্যাশয়ের ওপর তীব্র চাপ পড়ে যা রক্তে গ্লুকোজের স্বাভাবিক মাত্রা ব্যাহত করে।  
​বিশ্বখ্যাত গবেষণা সাময়িকী জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রিনোলজি অ্যান্ড মেটাবলিজম এ প্রকাশিত নিবন্ধসহ আন্তর্জাতিক পাবলিক হেলথ স্টাডিতে দেখা গেছে অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ও নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে মধ্যাহ্নভোজ গ্রহণের ফলে শরীরে মেটাবলিক সিন্ড্রোম (Metabolic Syndrome) এর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এর মধ্যে রয়েছে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, স্থূলতা, ফ্যাটিলিভার, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বৃদ্ধি। টানা ৩-৪ ঘণ্টা মস্তিষ্ক ও শরীরকে উচ্চ মাত্রায় ব্যস্ত রেখে দুপুরের সঠিক সময়ে ক্যালরি না দিলে রক্তে কর্টিসল (Stress Hormone) বৃদ্ধি পায় যা স্থূলতা এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্ডিওভাসকুলার রোগ তৈরি করে। একজন শারীরিকভাবে অসুস্থ বা ক্রনিক রোগে ভোগা কর্মকর্তা বা কর্মচারী কখনো নাগরিককে পূর্ণ দক্ষতা ও সদয় মনোভাব নিয়ে সেবা দিতে পারেন না। ফলে সময়নিষ্ঠ খাদ্যাভ্যাস সরাসরি সরকারি সেবার উৎকর্ষের সাথে যুক্ত।  
​জনগণের দিক থেকেও সচেতনতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। অধিকাংশ সেবাপ্রার্থী না জেনে বা দূরের যাতায়াতের কথা ভেবে ঠিক ১:০০ টা থেকে ১:৩০ টার মধ্যবর্তী সময়ে সরকারি টেবিলে উপস্থিত হন। যখন কোনো কর্মকর্তা খাবার গ্রহণ করতে যান তখন নাগরিক মনে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। অথচ এটি কোনো ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতা নয় এটি রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কর্মসূচিরই অংশ। তাই সিটিজেনস চার্টারে (Citizens' Charter) এই ৩০ মিনিটের বিরতির বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা এবং ডিজিটাল কাউন্টার বা দৃশ্যমান বোর্ডে এটি প্রদর্শন করা নাগরিক ভোগান্তি কমানোর কার্যকর উপায় হতে পারে।  আবার কর্মকর্তা-কর্মচারিদের এসিআরে এ বিষয়ে মূল্যায়নের ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে।
​তবে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব হলো নাগরিক সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখা। জরুরি সেবা প্রদানকারী দপ্তরগুলোতে যেমন: হাসপাতাল, থানা, জরুরি তথ্য বা নির্দিষ্ট কাউন্টার সেবায় অভ্যন্তরীণ রোস্টার সিস্টেম চালুর মাধ্যমে একদিকে যেমন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুষ্টি ও দুপুরের খাবারের সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব তেমনি সেবাগ্রহীতাদের প্রাপ্য সেবা কাউন্টারও কোনো সময় খালি থাকবে না। এটি নাগরিক স্বার্থ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাস্থ্য অধিকার উভয়ের মধ্যে একটি চমৎকার ভারসাম্য তৈরি করবে।
​পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন ইনস্টিটিউট , স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর এবং নীতি-নির্ধারণী সংস্থাগুলো এ বিষয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশিকা (Workplace Dietary Guidelines) প্রণয়ন করতে পারে। আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রগুলোতে কর্মচারীদের সুষম ডায়েট চার্ট বজায় রাখা ও নির্ধারিত বিরতিতে আহার গ্রহণকে উৎপাদনশীলতার মূল অনুষঙ্গ হিসেবে ধরা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর বিভিন্ন প্রতিবেদনেও উল্লেখ রয়েছে কাজের স্থানে স্বাস্থ্যকর ফুড টাইমলাইন নিশ্চিত করলে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থায় কর্মচারীদের সিক লিভ (Sick Leave) বা অসুস্থতাজনিত অনুপস্থিতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
​সুস্থ বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রক্রিয়ায় সরকারি দপ্তরগুলোকে কেবল ডিজিটালাইজড করলেই চলবে না কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুস্বাস্থ্য ও প্রাণবন্ত রাখতে হবে। দুপুরের এই ৩০ মিনিটের সময়নিষ্ঠ আহারের চর্চাকে কোনো বিলাসিতা না ভেবে একটি সুশৃঙ্খল, সুস্থ ও সভ্য জাতি গঠনের অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে। সরকারি বিধিবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও জনগণের সচেতনতার মধ্য দিয়েই তৈরি হতে পারে একটি বৈজ্ঞানিক ও সময়ানুগ সিভিল সার্ভিস যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের উন্নয়ন গতিকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করবে এবং রোগীর সংখ্যা কমিয়ে স্বাস্থ্য সেবাখাতের উত্তরোত্তর উন্নতি সাধনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

লেখক: কবি,সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও এমফিল গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।