ঢাকা, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
সময়: ০৮:৩৩:২৮ PM

আসামি হয়েও বহাল তবিয়তে পান্না বিশ্বাস

স্টাফ রিপোটার।। দৈনিক সমবাংলা
14-09-2026 07:27:33 PM
আসামি হয়েও বহাল তবিয়তে পান্না বিশ্বাস

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে নিয়োগ পাওয়া এবং পরবর্তীতে দুর্নীতি, টেন্ডার বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তা পান্না বিশ্বাসের বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে একাধিক মামলা থাকার পরও তিনি বর্তমানে বিআইডব্লিউটিএতে কর্মরত রয়েছেন।

রাজনৈতিক পরিচয় ও চাকরিতে নিয়োগের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, ২০১২ সালে আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতার সুপারিশে বিশেষ রাজনৈতিক বিবেচনায় বিআইডব্লিউটিএর হিসাব বিভাগে সহকারী পদে চাকরি পান পান্না বিশ্বাস। পরবর্তী সময়ে তিনি বিআইডব্লিউটিএ শ্রমিক লীগের সহসভাপতি ও সিবিএ নেতা, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বিআইডব্লিউটিএ বঙ্গবন্ধু পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনের পদ-পদবি ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সংস্থার বিভিন্ন ঘাট ইজারা, টেন্ডার প্রক্রিয়া ও নিয়োগসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করেন। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মিলে তিনি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনা করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও চূড়ান্ত প্রমাণ আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ
বর্তমানে পান্না বিশ্বাস বিআইডব্লিউটিএর শিমুলিয়া ড্রেজার বেইজে কর্মরত বলে জানা গেছে। তাঁর গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলায়। তাঁর বাবা পঞ্চানন বিশ্বাস ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক।

অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ১৩ বছরের চাকরি জীবনে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাঁর সম্পদের পরিমাণ কোটি কোটি টাকা বলে দাবি করা হলেও এর সুনির্দিষ্ট পরিমাণ এবং বৈধ-অবৈধ উৎস সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্তের তথ্য প্রতিবেদকের হাতে নেই।

ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঘিরে একাধিক মামলা
ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পান্না বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ঢাকার বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে।

খিলগাঁও থানা: হত্যার উদ্দেশ্যে সহায়তা, গুরুতর রক্তাক্ত জখম, ষড়যন্ত্র, উসকানি ও সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

পল্টন থানা, সিআর মামলা নং ৬৪/২০২৪: দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় করা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে পান্না বিশ্বাসকে ১১১ নম্বর আসামি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

যাত্রাবাড়ী থানা, মামলা নং ৭০৪/২০২৪: সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, হাসানুল হক ইনু ও আনিসুল হকের সঙ্গে পান্না বিশ্বাসকে ১৫১ নম্বর আসামি করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

মুগদা থানা, সিআর মামলা নং ২১৬/২০২৪: সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে পান্না বিশ্বাসকে ১৭৯ নম্বর আসামি করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।

মামলাগুলোতে তাঁর বিরুদ্ধে করা অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা বিচারাধীন বিষয়।

পুরোনো ফৌজদারি মামলার অভিযোগ
২০১৭ সালে বিআইডব্লিউটিএর হিসাব বিভাগের কর্মচারী কৃপার সঞ্জীব কুমার দাসকে মারধরের অভিযোগে পান্না বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলা করা হয় বলে জানা গেছে। মামলাটির নম্বর ১৫৯/২০১৭। অভিযোগ অনুযায়ী, মামলাটিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) চার্জশিটও দাখিল করেছিল।

পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদের অভিযোগ
পান্না বিশ্বাসের স্ত্রী দীপিকা দাস, যিনি উন্নয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর শাশুড়ি, ভাই রাহুল দেব বিশ্বাস এবং ভাইয়ের স্ত্রী তাপসী বিশ্বাসের নামে ব্যাংক হিসাব, সম্পদ অর্জন এবং ভারতে অর্থ পাচারের অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহার করে পান্না বিশ্বাস বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন এবং ভারতে বাড়ি নির্মাণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য দলিল, ব্যাংক নথি বা সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে পান্না বিশ্বাসের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে বিআইডব্লিউটিএর অন্য এক কর্মকর্তার কাছে বিষয়টি এড়িয়ে যান বলে দাবি করা হয়েছে।

মামলার পরও গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একাধিক হত্যা ও সহিংসতার মামলায় আসামি হওয়ার পরও কীভাবে পান্না বিশ্বাস বিআইডব্লিউটিএতে স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তাঁদের দাবি, মামলাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ যাচাই না হওয়া পর্যন্ত তাঁর দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা উচিত। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও সম্পদ অর্জনের অভিযোগও তদন্তের দাবি