দূরত্ব যদি সত্যিই ভালোবাসার গভীরতা বাড়িয়ে দেয়, তবে কুদ্দুস দূরেই থাকতে চায়। অনেক অনেক দূরে। এমন দূরে, যেখানে তার দীর্ঘশ্বাসের শব্দও নীলিমার কানে পৌঁছাবে না। কারণ সে জানে, ভালোবাসার চেয়ে কখনো কখনো অভিমান বড় হয়ে ওঠে। আর সেই অভিমান যখন প্রিয় মানুষটির নীরবতা থেকে জন্ম নেয়, তখন তা পাহাড়ের চেয়েও ভারী হয়ে যায়।
কুদ্দুস একসময় বিশ্বাস করত, পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হলো একজন আপন মানুষ। যে মানুষটির কাছে নিজের সব দুর্বলতা, সব স্বপ্ন আর সব ব্যর্থতা নির্দ্বিধায় তুলে ধরা যায়। তার কাছে সেই মানুষটি ছিল নীলিমা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে তাদের পরিচয়। নীলিমা ছিল প্রাণবন্ত, মেধাবী এবং অদ্ভুত রকমের সংবেদনশীল। আর কুদ্দুস ছিল শান্ত, অন্তর্মুখী, নিজের জগতে ডুবে থাকা একজন মানুষ। তাদের বন্ধুত্ব শুরু হয়েছিল ক্লাসরুমে একটি টেবিল ভাগাভাগি করার মধ্য দিয়ে।
প্রথম দিনেই নীলিমা বলেছিল,
— আপনি সব সময় এত চুপচাপ থাকেন কেন?
কুদ্দুস মৃদু হেসে বলেছিল,
— সবাই কথা বললে শুনবে কে?
সেই উত্তর শুনে নীলিমা অনেকক্ষণ হেসেছিল। আর সেই হাসিই কুদ্দুসের হৃদয়ে অদ্ভুত এক আলো জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
দিন গড়াতে থাকে। বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে গভীর হয়। একসঙ্গে ক্লাস, ক্যাম্পাসের পথ, চায়ের দোকানে গল্প, বৃষ্টিভেজা দুপুর—সবকিছুতেই তারা একে অপরের সঙ্গী হয়ে ওঠে।
কুদ্দুস কখন যে নীলিমাকে ভালোবেসে ফেলেছিল, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
তবে সে কখনো ভালোবাসার কথা বলতে পারেনি। কারণ তার মনে হতো, কিছু অনুভূতি প্রকাশ না পেলেই সুন্দর থাকে।
কিন্তু নীলিমা বুঝত।
মানুষের চোখ অনেক কথা বলে। আর কুদ্দুসের চোখে যে নীলিমার জন্য অগাধ মমতা জমে ছিল, তা অদৃশ্য থাকার মতো ছিল না।
একদিন বিকেলে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকের ধারে বসেছিল। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে।
নীলিমা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
— কুদ্দুস, তুমি কি কখনো কাউকে খুব ভালোবেসেছ?
কুদ্দুস কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— হ্যাঁ।
— সে কি জানে?
— হয়তো জানে। হয়তো জানে না।
নীলিমা আর কিছু বলেনি। শুধু দূরে তাকিয়ে ছিল।
সেদিন কুদ্দুস মনে মনে ভেবেছিল, হয়তো নীলিমাও তাকে ভালোবাসে।
কিন্তু জীবন সব সময় মানুষের ভাবনার পথে হাঁটে না।
বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হওয়ার পর নীলিমা চাকরির জন্য অন্য শহরে চলে যায়। প্রথম দিকে নিয়মিত যোগাযোগ হতো। ফোন, বার্তা, ভিডিও কল—সবকিছুই ছিল।
তারপর ধীরে ধীরে সময়ের ব্যবধান বাড়তে থাকে।
বার্তার উত্তর আসতে দেরি হয়।
ফোন করলে ব্যস্ততা দেখায়।
অনেক কথার জায়গায় এক শব্দের উত্তর আসে।
কুদ্দুস বুঝতে পারে, কোথাও যেন কিছু বদলে যাচ্ছে।
তবুও সে অপেক্ষা করে।
কারণ ভালোবাসা অপেক্ষা করতে শেখায়।
এক রাতে সাহস করে সে নীলিমাকে লিখল,
“তুমি কি আমাকে আগের মতোই বন্ধু মনে করো?”
অনেকক্ষণ পর উত্তর এলো,
“অবশ্যই।”
কিন্তু সেই উত্তরে যে উষ্ণতা ছিল না, তা কুদ্দুস স্পষ্ট অনুভব করল।
তারপর একদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নীলিমার একটি ছবি দেখল। পাশে এক তরুণ।
ছবির নিচে লেখা—
“আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ।”
কুদ্দুসের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
অধিকার না থাকলে প্রশ্ন করাও অন্যায়।
তবে সেদিন প্রথমবারের মতো তার মনে হলো, সে হয়তো নীলিমার গল্পের কোনো গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিল না।
হয়তো শুধু একটি অধ্যায় ছিল।
তারপর থেকে কুদ্দুস নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করল।
সে আর ফোন করত না।
বার্তা পাঠাত না।
কোনো অভিযোগও করত না।
শুধু নীরবে দূরে সরে যেত।
একদিন নীলিমা লিখেছিল,
“তুমি কি রাগ করেছ?”
কুদ্দুস অনেকক্ষণ পর উত্তর দিয়েছিল,
“না। শুধু দূরে আছি।”
নীলিমা লিখেছিল,
“দূরে কেন?”
কুদ্দুস উত্তর দেয়নি।
কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর শব্দে দেওয়া যায় না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেল।
কুদ্দুস চাকরির সূত্রে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে শুরু করল। নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ, নতুন ব্যস্ততা—সবকিছু তার জীবনে এল।
তবুও কোনো এক নির্জন সন্ধ্যায়, কোনো এক বৃষ্টিভেজা জানালার পাশে দাঁড়ালেই, তার মনে পড়ে যেত নীলিমার কথা।
মনে পড়ত সেই লেকের ধারের বিকেল।
মনে পড়ত সেই হাসি।
মনে পড়ত অসমাপ্ত কথাগুলো।
তখন তার মনে হতো, যদি আপনজনেরা কাউকে আপন ভাবতে সংকোচ বোধ করে, তবে গোটা পৃথিবীকেই আপন বানিয়ে ফেলাই ভালো।
পৃথিবীর কোথাও না কোথাও তো কেউ একজন মনে রাখবে।
সে না হয় নীলিমা নয়।
এক শীতের সকালে কুদ্দুস একটি পাহাড়ি শহরে কাজে গিয়েছিল। কুয়াশায় ঢাকা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে সে একটি ছোট্ট বইয়ের দোকানে ঢুকল।
সেখানে পুরোনো বইয়ের পাতার গন্ধে ভরা এক শান্ত পরিবেশ।
হঠাৎ একটি বইয়ের ভেতর থেকে একটি কাগজ পড়ে গেল।
কাগজে লেখা ছিল—
“কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে থাকার জন্য নয়, মনে থাকার জন্য।”
বাক্যটি পড়ে কুদ্দুস দীর্ঘক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো, যেন কথাটি তাকে উদ্দেশ্য করেই লেখা।
সেদিন রাতে হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকাল।
তারাদের মৃদু আলোয় নীলিমার মুখ ভেসে উঠল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই মুখ দেখে আর কষ্ট লাগল না।
বরং এক ধরনের শান্তি অনুভব করল।
হয়তো ভালোবাসা মানেই পাওয়া নয়।
হয়তো ভালোবাসা মানে কাউকে সুখী দেখতে পারা, এমনকি সে সুখে নিজের কোনো স্থান না থাকলেও।
কয়েক মাস পর হঠাৎ একদিন কুদ্দুসের ফোনে একটি বার্তা এলো।
প্রেরক—নীলিমা।
বার্তাটি সংক্ষিপ্ত।
“কেমন আছ?”
অনেক দিন পর এই দুটি শব্দ দেখে কুদ্দুসের বুকের ভেতর অদ্ভুত অনুভূতি জেগে উঠল।
সে উত্তর দিল,
“ভালো আছি। তুমি?”
নীলিমা লিখল,
“ভালো থাকার চেষ্টা করছি।”
তারপর আরেকটি বার্তা এলো।
“তোমাকে মাঝে মাঝে খুব মনে পড়ে।”
কুদ্দুস অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
যে কথাটি শোনার জন্য সে একসময় কত রাত জেগেছে, কত অপেক্ষা করেছে, আজ সেই কথাটি শুনেও তার ভেতরে ঝড় উঠল না।
বরং নিঃশব্দ এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
সে লিখল,
“স্মৃতি মানুষকে ছাড়ে না।”
নীলিমা উত্তর দিল,
“হয়তো তোমাকে যথেষ্ট মূল্য দিতে পারিনি।”
কুদ্দুস মৃদু হেসে ফোনটি নামিয়ে রাখল।
অভিমান তখনো ছিল।
তবে সেই অভিমান আর অভিযোগের নয়।
সেটি ছিল হারিয়ে যাওয়া সময়ের প্রতি অভিমান।
যে সময় ফিরে আসে না।
যে অনুভূতি একবার ভেঙে গেলে আগের মতো জোড়া লাগে না।
রাত গভীর হলো।
আকাশে চাঁদ উঠেছে।
কুদ্দুস জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দূরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক নদীর মতো।
তারা একসময় পাশাপাশি বয়ে চলে।
তারপর কোনো এক মোড়ে আলাদা হয়ে যায়।
কিন্তু তাদের উৎসের স্মৃতি কখনো মুছে যায় না।
নীলিমা হয়তো তার জীবনে ফিরে আসবে না।
হয়তো তাদের গল্প আর কখনো নতুন করে শুরু হবে না।
তবুও সে জানে, তার হৃদয়ের একটি নির্জন কোণে নীলিমা চিরকাল থেকে যাবে।
অভিমান হয়ে।
ভালোবাসা হয়ে।
অসমাপ্ত একটি কবিতা হয়ে।
আর কুদ্দুস?
সে দূরেই থাকবে।
অনেক অনেক দূরে।
তবে পালিয়ে নয়।
বরং এই বিশ্বাস নিয়ে যে, সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না।
তা রূপ বদলায়, স্মৃতিতে আশ্রয় নেয়, নীরবতায় বাসা বাঁধে।
কোনো এক নিঃসঙ্গ রাতে, কোনো এক অচেনা আকাশের নিচে, হয়তো নীলিমাও এক মুহূর্তের জন্য তাকে স্মরণ করবে।
আর সেই একটি স্মৃতিই কুদ্দুসের কাছে যথেষ্ট।
কারণ সব ভালোবাসার পরিণতি মিলন নয়।
কিছু ভালোবাসা দূরত্বের মাঝেই সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে সত্য এবং সবচেয়ে সুন্দর হয়ে বেঁচে থাকে।
সমাপ্ত।।