ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬,
সময়: ১০:৩৫:৪৩ PM

তৃণমূল আরো চাঙ্গা করতে বিএনপির মহা পরিকল্পনা

মান্নান মারুফ
28-04-2026 09:00:13 PM
তৃণমূল আরো চাঙ্গা করতে বিএনপির মহা পরিকল্পনা

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সাম্প্রতিক সময়ে সাংগঠনিকভাবে নিজেদের আরও শক্তিশালী করার প্রয়াসে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করছেন। তবে সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটে দলটির ভেতরে এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে অনেক নেতা-কর্মীর মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে মাঠে সক্রিয় থাকা বহু নেতা-কর্মী নতুন সরকারে প্রত্যাশিত পদ-পদবি বা দায়িত্ব না পাওয়ায় হতাশায় ভুগছেন। গত ১৭ বছর ধরে যারা বিভিন্ন প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে দলকে সংগঠিত রেখেছেন, তাদের অনেকেই এখনো সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আসতে পারেননি। ফলে তৃণমূল পর্যায়ে অসন্তোষ ও মনোবলহীনতা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সাধারণত দেখা যায়—যখন কোনো দল ক্ষমতায় আসে, তখন দলের বিভিন্ন স্তরের নেতারা সরকারি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পান। এতে তারা যেমন ব্যক্তিগতভাবে উপকৃত হন, তেমনি উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানও সুদৃঢ় করেন। কিন্তু বিএনপির বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক তৃণমূল নেতা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ বা বিভিন্ন সাংগঠনিক কারণে যেসব নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, তাদের অনেকের বহিষ্কারাদেশ এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। ফলে তারা দীর্ঘদিন ধরে দল থেকে দূরে থেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে কোনো নেতাকে দল থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হলে তা সংগঠনের জন্য ইতিবাচক নয়। বরং এতে করে অভ্যন্তরীণ বিভাজন বাড়তে পারে।

এছাড়া এমন অনেক নেতা রয়েছেন যারা দীর্ঘদিন নির্যাতন, মামলা-মোকদ্দমা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের প্রতি অনুগত থেকেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় তারা নীরবে হতাশা বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের এই নীরব ক্ষোভ সংগঠনের জন্য একটি ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইতোমধ্যে কিছু নেতা হতাশাগ্রস্ত হয়ে অন্য রাজনৈতিক দলে যোগ দিচ্ছেন বলেও জানা গেছে। এই প্রবণতা বিএনপির জন্য একটি ‘অশনি সংকেত’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে, যা দলীয় ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর হবে।

এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ও পরীক্ষিত নেতাদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। তাদেরকে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অন্তর্ভুক্ত করা হলে একদিকে যেমন তাদের দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া হবে, অন্যদিকে তৃণমূল কর্মীদের মধ্যেও ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে।

একই সঙ্গে দলটির জোর দিতে হবে সাংগঠনিক যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর। দলকে শক্তিশাল ও কর্মী বৃদ্ধি করতে হলে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তৃণমূলের নিয়মিত যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। মাঠের কর্মীদের সাথে কেন্দ্র যত বেশি যোগাযোগ বৃদ্ধি করবে ততই কর্মীদের মধ্যে আস্থা ও মনোবল বৃদ্ধি পাবে। এ ক্ষেত্রে জেলা, উপজেলা ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, দলের চেয়ারম্যান যদি নিজ উদ্যোগে পর্যায়ক্রমে এসব বৈঠক করেন, তাহলে তা কর্মীদের জন্য বড় ধরনের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে। এতে করে তারা নিজেদের মূল্যায়িত মনে করবেন এবং সংগঠনের প্রতি আরও বেশি আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করবেন। ফলস্বরূপ দলীয় কাঠামো আরও সুসংগঠিত ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির এক স্থায়ী কমিটির সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নির্বাচনে আমাদের কর্মীরা অত্যন্ত পরিশ্রম করেছে। তারা দলের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে। সবকিছু ঠিকঠাক আছে, তবে দলকে আরও শক্তিশালী করতে এবং কর্মীদের মনোবল বাড়াতে আমরা পর্যায়ক্রমে বৈঠক করব।”

তিনি আরও জানান, এসব বৈঠকের মাধ্যমে তৃণমূলের বাস্তব সমস্যা সরাসরি জানা যাবে এবং সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে। এতে করে দলের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বৃদ্ধি পাবে এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে।

এদিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন বলে জানা গেছে। তিনি বিভিন্ন সময়ে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সমস্যা, চাহিদা এবং বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন। তার এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।

বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, “রিজভী সাহেব নিয়মিতভাবে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং তাদের ভালো-মন্দের খোঁজ খবর নিচ্ছেন। এতে করে কর্মীরা নিজেদের অনেকটা স্বস্তিতে অনুভব করছেন।”

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সুসংহত করা উচিত। এতে করে দীর্ঘমেয়াদে সংগঠন আরও কার্যকর ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

তারা আরও বলেন, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও অবদানের ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন নিশ্চিত করা হলে কর্মীদের মধ্যে ন্যায্যতার অনুভূতি তৈরি হবে। একই সঙ্গে বহিষ্কৃত বা উপেক্ষিত নেতাদের বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দলীয় ঐক্য বজায় রাখা এবং তৃণমূলের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। যদি এই দুই বিষয় সফলভাবে মোকাবিলা করা যায়, তবে দলটি ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সাংগঠনিক পুনর্গঠন, কার্যকর নেতৃত্ব, তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এবং পরীক্ষিত নেতাদের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে বিএনপি তাদের বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে। এতে করে শুধু দলের অভ্যন্তরীণ শক্তিই বাড়বে না, বরং জাতীয় রাজনীতিতেও তারা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।