পর্ব ৬
মানুষের জীবনে কিছু কষ্ট থাকে, যা সময়ের সঙ্গে কমে না। বরং নিঃশব্দে হৃদয়ের গভীরে জমে থাকে। বাইরে থেকে মানুষ স্বাভাবিক দেখায়, হাসে, কথা বলে, কাজ করে; কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটি অদৃশ্য ক্ষত প্রতিদিন একটু একটু করে তাকে নিঃশেষ করে দেয়।
অর্ণবের জীবনও তেমনই হয়ে উঠেছিল।
বহু বছর ধরে সে নীলার স্মৃতি বয়ে বেড়িয়েছে। সেই স্মৃতি তার একমাত্র সঙ্গী, আবার সবচেয়ে বড় যন্ত্রণাও। জীবনের প্রতিটি দিন সে পার করেছে একটি হারিয়ে যাওয়া মুখের অপেক্ষায়।
কিন্তু একসময় শরীরও আর মনের এই দীর্ঘ যুদ্ধ সহ্য করতে পারল না।
শুরুটা ছিল খুব সাধারণ।
প্রায়ই ক্লান্ত লাগত।
মাথা ঘুরত।
শরীর দুর্বল হয়ে পড়ত।
অর্ণব প্রথমে গুরুত্ব দেয়নি।
ভাবত, কাজের চাপ। বয়স বাড়ছে। বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু ধীরে ধীরে অবস্থার অবনতি হতে লাগল।
একদিন অফিসে কাজ করার সময় হঠাৎ সে অজ্ঞান হয়ে পড়ল।
সহকর্মীরা দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেল।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তারদের মুখের গম্ভীর ভাব দেখে অর্ণব বুঝতে পারল, বিষয়টা সাধারণ নয়।
কয়েকদিন পর রিপোর্ট এল।
রোগটি জটিল।
চিকিৎসা সম্ভব, কিন্তু অবস্থাটা আশঙ্কাজনক।
ডাক্তাররা সরাসরি কিছু বলেননি, কিন্তু অর্ণব বুঝে গিয়েছিল—জীবন তাকে একটি কঠিন সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
অদ্ভুতভাবে, মৃত্যুর খবর শুনেও তার খুব বেশি ভয় লাগেনি।
কারণ সে অনেক আগেই জীবনের বড় একটি অংশ হারিয়ে ফেলেছিল।
তার একটাই কষ্ট হচ্ছিল—
মরে যাওয়ার আগে হয়তো আর কোনোদিন নীলাকে দেখতে পাবে না।
হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকত।
দিন বদলাত।
সকাল হতো।
সন্ধ্যা নামত।
রাত পেরিয়ে ভোর আসত।
কিন্তু তার ভেতরের সময় যেন বহু বছর আগের সেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই আটকে ছিল।
যেখানে নীলা প্রথম তাকে বলেছিল—
"এই বইটা কি আপনার?"
চোখ বন্ধ করলেই স্মৃতিগুলো একে একে ফিরে আসত।
প্রথম পরিচয়।
প্রথম বন্ধুত্ব।
প্রথম হাত ধরা।
বৃষ্টিভেজা বিকেল।
লেকের ধারে বসে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা।
সবকিছু যেন গতকালের ঘটনা।
একদিন রাতে নার্স ওষুধ দিয়ে চলে যাওয়ার পর অর্ণব একা জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল।
আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ।
ঠিক এমন একটি রাতে একসময় নীলা তাকে বলেছিল—
"যদি কোনোদিন আমরা হারিয়ে যাই?"
তখন সে হেসেছিল।
আজ বুঝতে পারছে, কিছু প্রশ্নের উত্তর অনেক বছর পরে পাওয়া যায়।
হাসপাতালের দিনগুলো ধীরে ধীরে দীর্ঘ হতে লাগল।
বন্ধুরা আসত।
খোঁজ নিত।
সান্ত্বনা দিত।
কিন্তু তাদের চলে যাওয়ার পর আবার সেই নিঃসঙ্গতা।
আবার সেই এক নাম।
নীলা।
একদিন পুরোনো এক বন্ধু দেখতে এসে বলল,
—"কাউকে খবর দেবি?"
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর আস্তে করে বলল,
—"না।"
বন্ধুটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—"নীলাকেও না?"
অর্ণব জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
অনেকক্ষণ পর বলল,
—"সে এখন তার নিজের জীবনে ভালো আছে। আমার জন্য তার জীবনকে আর অস্থির করতে চাই না।"
কথাগুলো বললেও তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল।
কারণ সত্যি কথা হলো—
সে খুব করে চেয়েছিল, নীলা একবার আসুক।
শুধু একবার।
কিন্তু সেই ইচ্ছেটা উচ্চারণ করার সাহস তার ছিল না।
রাতগুলো ছিল সবচেয়ে কঠিন।
চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেলে স্মৃতিগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠত।
এক রাতে অর্ণব মনে মনে একটি চিঠি লিখতে শুরু করল।
চিঠিটি কখনও কাগজে লেখা হয়নি।
কেউ পড়বেও না।
তবুও সে লিখল।
কারণ কিছু কথা মানুষ মৃত্যুর আগে হৃদয় থেকে বের করে দিতে চায়।
সে মনে মনে বলল—
"প্রিয় নীলা,
তুমি যখন এই পৃথিবীর কোথাও নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত, আমি তখন একটি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তোমার কথা ভাবছি। হয়তো এই খবর কোনোদিন তোমার কাছে পৌঁছাবে না। হয়তো পৌঁছালেও খুব দেরি হয়ে যাবে। তবুও কিছু কথা বলতে চাই।
জানো, আমি তোমাকে কখনও ভুলতে পারিনি। অনেক চেষ্টা করেছি। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি। নতুন জীবন শুরু করতে চেয়েছি। কিন্তু প্রতিবারই তোমার স্মৃতি আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে সেই পুরোনো দিনে।
আমি তোমার ওপর কোনো অভিমান রাখিনি। হয়তো সময় আমাদের বিরুদ্ধে ছিল। হয়তো ভাগ্য আমাদের গল্পটাকে শেষ হতে দেয়নি।
তোমাকে দোষ দিয়ে আমি কোনোদিন বাঁচতে পারিনি। কারণ ভালোবাসা দোষ খোঁজে না। ভালোবাসা শুধু মনে রাখে।
আমি শুধু একটা কথা বলতে চাই—তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায় ছিলে।
যদি আবার কোনো জন্ম থাকে, যদি আবার কোনোদিন দেখা হয়, তাহলে আমি চাই, প্রথম দিনের মতো আবার তোমার সঙ্গে পরিচয় হোক। আবার তোমার হাসি দেখে ভালোবাসতে শিখি।
আর যদি কোনোদিন আমার মৃত্যুর খবর তোমার কানে পৌঁছায়, তবে শুধু এটুকু জেনে রেখো—শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম।"
চোখের কোণে জমে থাকা জল ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ল।
অর্ণব জানত না কেন সে কাঁদছে।
মৃত্যুর জন্য?
নাকি অপূর্ণ ভালোবাসার জন্য?
হয়তো দুটোর জন্যই।
দিন যত এগোচ্ছিল, তার শরীর তত দুর্বল হয়ে পড়ছিল।
হাঁটতে কষ্ট হতো।
কথা বলতে কষ্ট হতো।
কখনও কখনও শ্বাস নিতেও কষ্ট হতো।
কিন্তু তার মনের ভেতর একটি দৃশ্য বারবার ফিরে আসত।
সে কল্পনা করত—
হাসপাতালের দরজা খুলে যাচ্ছে।
নীলা ভেতরে ঢুকছে।
চোখে জল।
মুখে সেই চেনা হাসি।
সে এসে বলছে—
"অর্ণব, আমি এসেছি।"
অর্ণব সেই দৃশ্য কল্পনা করে মৃদু হাসত।
তারপর বাস্তবতা মনে পড়তেই আবার চোখ বন্ধ করে ফেলত।
কারণ সে জানত—
কিছু অপেক্ষা পূরণ হওয়ার জন্য নয়।
কিছু অপেক্ষা শুধু মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকার জন্য।
এক সন্ধ্যায় জানালার বাইরে বৃষ্টি নামল।
অনেকদিন পর।
অর্ণব ধীরে ধীরে চোখ মেলল।
বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে তার মনে পড়ল সেই দিনটার কথা, যেদিন তারা একসঙ্গে ভিজেছিল।
কত হাসি ছিল।
কত স্বপ্ন ছিল।
কত বিশ্বাস ছিল।
আজ শুধু স্মৃতি আছে।
আর সেই স্মৃতির ভেতর দাঁড়িয়ে অর্ণব বুঝতে পারল—
তার জীবনের শেষ অধ্যায় শুরু হয়ে গেছে।
মৃত্যুকে সে ভয় পাচ্ছে না।
ভয় পাচ্ছে শুধু একটি বিষয়—
শেষবার চোখ বন্ধ করার আগে হয়তো আর কোনোদিন নীলার মুখ দেখা হবে না।
আর সেই অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষাটুকুই তার হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর ব্যথা হয়ে রইল। চলবে.........