ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬,
সময়: ০২:০৯:৫২ AM

উপন্যাস:তোমার মুখ”

মান্নান মারুফ
01-06-2026 08:30:48 PM
উপন্যাস:তোমার মুখ”

পর্ব ৫

সময়কে মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চিকিৎসক বলে। সবাই বলে, সময় নাকি সব ক্ষত একদিন না একদিন ভরিয়ে দেয়। সব কষ্ট মুছে দেয়। সব হারানোর ব্যথা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনে।

কিন্তু অর্ণবের কাছে কথাগুলো কখনও সত্যি মনে হয়নি।

কারণ সময় এগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার হৃদয় যেন সেই পুরোনো দিনগুলোতেই আটকে রয়ে গেছে।

নীলা চলে যাওয়ার পর প্রথম কয়েক মাস সে অপেক্ষা করেছিল।

তারপর সেই অপেক্ষা এক বছরে গড়িয়েছে।

এক বছর থেকে দুই বছর।

দুই বছর থেকে আরও অনেকগুলো বছর।

কিন্তু প্রতিটি বছর শেষে অর্ণব উপলব্ধি করেছে—সে এখনও নীলাকে ভুলতে পারেনি।

বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার স্মৃতিগুলো আরও গভীর হয়ে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ হয়েছে।

বন্ধুরা সবাই নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

কেউ চাকরি পেয়েছে।

কেউ ব্যবসা শুরু করেছে।

কেউ বিয়ে করে সংসারী হয়েছে।

অর্ণবও চাকরি পেয়েছে।

একটি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাজ করছে।

প্রতিদিন সকালে অফিসে যায়।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে।

বাইরের চোখে তাকে স্বাভাবিকই মনে হয়।

কিন্তু তার ভেতরের মানুষটা অনেক আগেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।

কারণ দিনের শেষে যখন সে নিজের ঘরে ফিরে আসে, তখন তাকে অপেক্ষা করে থাকে এক অদৃশ্য শূন্যতা।

যে শূন্যতার নাম—নীলা।

অর্ণবের ঘরের একটি কাঠের আলমারি ছিল।

আলমারির একেবারে ভেতরের তাকে একটি ছোট বাক্স।

সেই বাক্সের ভেতরে লুকিয়ে ছিল তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

কিছু পুরোনো চিঠি।

কিছু শুকিয়ে যাওয়া ফুল।

কিছু ছবি।

আর অসংখ্য স্মৃতি।

প্রায় প্রতি সপ্তাহেই একদিন সে বাক্সটি খুলে বসত।

ধীরে ধীরে চিঠিগুলো বের করত।

কাগজগুলো হলুদ হয়ে গেছে।

কিছু অক্ষর মুছে যেতে শুরু করেছে।

তবুও প্রতিটি শব্দ তার মুখস্থ।

একটি চিঠিতে নীলা লিখেছিল—

"তুমি জানো, পৃথিবীতে যদি কাউকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করি, সে তুমি।"

চিঠির সেই লাইন পড়লেই অর্ণবের বুকের ভেতর অদ্ভুত কষ্ট জমে উঠত।

কারণ সেই মানুষটিই একদিন তার প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল।

এক সন্ধ্যায় পুরোনো অ্যালবাম দেখতে দেখতে একটি ছবি হাতে নিল সে।

ছবিটি বৃষ্টির দিনের।

নীলা ভেজা চুল সরিয়ে হাসছে।

চোখে সেই চিরচেনা উজ্জ্বলতা।

অর্ণব দীর্ঘক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো, ছবির মানুষটি যেন এখনও কোথাও আছে।

শুধু তার নাগালের বাইরে।

হয়তো খুব দূরে।

হয়তো খুব কাছে।

কিন্তু আর কখনও ছোঁয়া যাবে না।

বছরের পর বছর কেটে গেলেও অর্ণব কোনো নতুন সম্পর্কের কথা ভাবতে পারেনি।

বন্ধুরা অনেকবার বলেছে—

—"জীবন থেমে থাকে না।"

—"সবাইকে একদিন এগিয়ে যেতে হয়।"

—"পুরোনো স্মৃতি নিয়ে কতদিন বাঁচবে?"

অর্ণব শুধু হাসত।

কেউ জানত না, সে এগিয়ে যেতে চাইলেও পারছে না।

কারণ কিছু মানুষ শুধু জীবনের অংশ হয় না।

তারা জীবনের ভেতর মিশে যায়।

তাদের সরিয়ে ফেলতে গেলে নিজেরই একটা অংশ হারিয়ে যায়।

একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো।

কথা বলতে বলতে হঠাৎ নীলার প্রসঙ্গ উঠে এল।

অর্ণব বহুদিন পর সেই নাম শুনে থমকে গেল।

বন্ধুটি বলল,

—"শুনেছি নীলা ভালো আছে।"

অর্ণব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,

—"কোথায় আছে?"

—"অন্য শহরে। চাকরি করছে।"

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

—"ভালো আছে তো?"

—"হ্যাঁ।"

শুধু একটি শব্দ।

"হ্যাঁ।"

কিন্তু সেই শব্দ শুনে অর্ণবের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি জন্ম নিল।

একদিকে স্বস্তি।

কারণ নীলা ভালো আছে।

অন্যদিকে কষ্ট।

কারণ সেই ভালো থাকার গল্পে তার কোনো স্থান নেই।

সেদিন রাতে অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারেনি সে।

জানালার পাশে বসে ছিল।

মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর কোথাও নীলা এখন হয়তো হাসছে।

কাজ করছে।

বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে।

নতুন জীবন নিয়ে ব্যস্ত।

আর সে?

সে এখনও অতীতের একটি নাম আঁকড়ে ধরে বসে আছে।

এরপর আরও কয়েকবার নীলার খবর তার কানে এসেছে।

কেউ বলেছে, সে অনেক সফল হয়েছে।

কেউ বলেছে, পরিবার নিয়ে ভালো আছে।

কেউ বলেছে, তার জীবনে নতুন মানুষ এসেছে।

অর্ণব কখনও সত্যতা যাচাই করার চেষ্টা করেনি।

সে শুধু শুনেছে।

চুপচাপ।

তারপর নিজের ভেতরে সবকিছু গোপন করে রেখেছে।

কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর জানার চেয়ে না জানাই সহজ।

যত বছর যাচ্ছে, অর্ণবের ভেতরের নিঃসঙ্গতা তত গভীর হচ্ছে।

আগে অন্তত অপেক্ষা ছিল।

মনে হতো, হয়তো কোনোদিন ফিরে আসবে।

এখন সেই আশাটুকুও ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

তার জায়গায় জন্ম নিচ্ছে এক ধরনের নীরব শূন্যতা।

যেখানে কান্নাও নেই।

অভিমানও নেই।

শুধু এক গভীর ক্লান্তি।

একদিন অফিস থেকে ফেরার সময় রাস্তায় হঠাৎ একটি মেয়েকে দেখল।

দূর থেকে দেখতে অনেকটা নীলার মতো।

অর্ণব অজান্তেই থেমে গেল।

হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল।

মেয়েটি কাছে আসতেই বুঝল—না, সে নীলা নয়।

একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ।

অর্ণব মৃদু হেসে মাথা নিচু করল।

তারপর আবার হাঁটতে শুরু করল।

নিজের ওপরই হাসি পেল।

এত বছর পরও সে এখনও মানুষের ভিড়ে নীলাকে খোঁজে।

বৃষ্টিতে।

সূর্যাস্তে।

ট্রেনের জানালায়।

ব্যস্ত শহরের রাস্তায়।

প্রতিটি পরিচিত মুখে।

যেন কোথাও না কোথাও হঠাৎ করে আবার দেখা হয়ে যাবে।

কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম।

সে কাউকে ফিরিয়ে আনে না।

এক রাতে ঘুমানোর আগে অর্ণব আবার সেই পুরোনো বাক্সটি খুলল।

একটি চিঠি হাতে নিল।

ধীরে ধীরে পড়তে লাগল।

চিঠির শেষ লাইনে লেখা ছিল—

"যদি কোনোদিন আমরা হারিয়ে যাই, তবুও আমাকে মনে রেখো।"

অর্ণবের চোখ ভিজে উঠল।

সে ফিসফিস করে বলল,

—"আমি তো এখনও তোমাকেই মনে রেখেছি, নীলা।"

ঘরের ভেতর কোনো উত্তর এল না।

শুধু নীরবতা।

অনেক বছরের পুরোনো সেই নীরবতা।

যা ধীরে ধীরে তার জীবনের স্থায়ী সঙ্গী হয়ে উঠেছে।

আর সেই নীরবতার মধ্যেই অর্ণব বুঝতে পারল—

মানুষ কখনও কখনও কাউকে হারিয়ে ফেলে না।

বরং সেই মানুষটিকে নিজের ভেতরে বয়ে নিয়ে বাঁচে।

প্রতিদিন।

প্রতিক্ষণ।

নিঃশব্দে।

কিন্তু সেই বহন করার ভার একসময় হৃদয়কে ক্লান্ত করে দেয়।

আর অর্ণবের হৃদয়ও ধীরে ধীরে সেই ক্লান্তির কাছে হার মানতে শুরু করেছে।

তবুও সে বেঁচে আছে।

একটি মুখের স্মৃতি নিয়ে।

একটি নামের অপেক্ষা নিয়ে।

আর একটি অসমাপ্ত ভালোবাসার দীর্ঘ প্রতীক্ষা নিয়ে।

চলবে........